ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিদায়

এক দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকে সামরিক মিশন শেষ করছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। এই জোটের উপস্থিতি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণ ছিল। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ওই অঞ্চল থেকে চূড়ান্তভাবে জোটের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি ঘোষণা করেছেন, জোটের সেনা প্রত্যাহারের পরদিন ১ অক্টোবর ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে।

সরকার মনে করে, জোটের সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরানের সমর্থনপুষ্ট শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে অস্ত্র রাখার যে অজুহাত ছিল, তা আর থাকবে না।

দেশটির নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের প্রধানরা এক যৌথ বিবৃতিতে সোমবার বলেন, এটি এমন একটি ‘জাতীয় দিবস’, যা ইরাকের সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথচলা সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে। এছাড়া রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অস্ত্রের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে যথাসময়ে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চলতি বছর ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী জায়েদি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের অস্ত্র সরকারের কাছে সমর্পণে বাধ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার সরকার প্রথমে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ত্যাগের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তবে অস্ত্রের বিষয়টি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকায় পরে সেই সময়সীমা প্রত্যাহার করা হয়। এর সমাধানে আরও অনেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর দেশটির রাজনীতিকরা আলোচনা করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেসব শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে শুধু বিদেশি সেনা প্রত্যাহারই নয়; যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও রয়েছে।

ইরাকের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতায়েব হিজবুল্লাহ সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দখলদার বাহিনী’ প্রত্যাহার করা পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে একটি সূচনা।

এছাড়া জায়েদির সরকারকে হুমকিও দিয়ে তারা বলেছে, যে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করবে না, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে।

ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। কিন্তু আইএস পরাজিত হওয়ার পর ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনাদের উপস্থিতি বাগদাদ সরকার এবং এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

গোষ্ঠীগুলো ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। একইসঙ্গে তারা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালায়। কয়েক বছর ধরে এসব হামলায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। এসব হামলায় কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনারাও লক্ষ্যবস্তু হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনারা ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েন হয়। সে সময় আইএস দুই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছিল। সে সময় আইএস ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা চালায়।

২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আইএসকে পরাজিত করা হয়। তবে গোষ্ঠীটির পালিয়ে যাওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে জোটের সেনারা ইরাকে অবস্থান করতে থাকে।

২০২৪ সালে বাগদাদ ও ওয়াশিংটন জোটের মিশন ধীরে ধীরে শেষ করার বিষয়ে সম্মত হয়। এরপর ইরাকের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে জোটের সেনারা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হয়। শেষপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়ে দেশটির স্বায়ত্তশাসিত উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান অঞ্চলে।