উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো তার কথিত পছন্দের খাবার শার্ক ফিন স্যুপ। একসময় পূর্ব এশিয়ার কিছু সংস্কৃতিতে বিলাসিতা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই খাবার বর্তমানে প্রাণী নির্যাতন ও সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত।
শার্ক ফিন স্যুপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে চীনের রাজকীয় খাবারের তালিকায়। সেখানে এটি সম্পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। হাঙরের পাখনা দিয়ে তৈরি এ স্যুপে মূলত স্বাদের চেয়ে পাখনার বিশেষ ধরনের টেক্সচারকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই মর্যাদার প্রতীক খাবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হাঙর শিকারের নিষ্ঠুর ‘ফিনিং’ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ পদ্ধতিতে জীবন্ত হাঙর ধরে তার পাখনা কেটে নেওয়া হয়। এরপর পাখনা কাটা অবস্থায় অনেক হাঙরকেই আবার সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কিছু প্রজাতির হাঙরের সংখ্যা ৯০%-এর বেশি কমে গেছে। সংরক্ষণবিদরা সতর্ক করে আসছেন, সমুদ্রের শীর্ষ শিকারি হিসেবে হাঙরকে ব্যাপকভাবে সরিয়ে ফেললে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এরপরও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদার কারণে শার্ক ফিন স্যুপের চাহিদা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও খাবারটি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রাণী কল্যাণ ও সমুদ্র সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের দীর্ঘদিনের চাপের পর ২০২২ সালে দেশটির কংগ্রেস ‘শার্ক ফিন সেলস এলিমিনেশন অ্যাক্ট অব ২০২১’ পাস করে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে হাঙরের পাখনা রাখা বা বিক্রি করা অবৈধ করা হয়। এর পেছনে হাঙরের পাখনা সংগ্রহের নিষ্ঠুর পদ্ধতি এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়।
কিম জং উনের শার্ক ফিন স্যুপের প্রতি কথিত আগ্রহকে উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর বিলাসী জীবনযাপনের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দেশটির বড় একটি অংশ খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগে থাকলেও দেশটির অভিজাত শ্রেণির কাছে কোবে স্টেক, ক্যাভিয়ার ও শ্যাম্পেনের মতো দামি খাবার পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ভোজ বা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে শার্ক ফিন স্যুপ পরিবেশন শুধু খাবারের পছন্দের বিষয় নয়, বরং কিমের ক্ষমতা ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থানেরও প্রকাশ বলে মনে করা হয়।
কিম পরিবারের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় কাজ করা জাপানি সুশি শেফ কেনজি ফুজিমোতো ২০০১ সালে জাপানে পালিয়ে যাওয়ার পর কিম পরিবারের খাবারের অভ্যাস নিয়ে বিভিন্ন তথ্য দেন। জাপানি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "They both like shark fin soup three times a week."
ফুজিমোটোর বর্ণনা অনুযায়ী, কিম পরিবারের জন্য ক্যাভিয়ার সংগ্রহ করতে ইরান, বিয়ার আনতে ডেনমার্ক এবং মাছের জন্য জাপানে যাতায়াত করা হতো।
এদিকে শার্ক ফিন স্যুপের নিষ্ঠুরতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শেফ ও রেস্তোরাঁ স্বেচ্ছায় নিজেদের মেনু থেকে খাবারটি বাদ দিয়েছে। শেফ গর্ডন রামসেও এ খাবার এড়িয়ে চলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাঙরের পাখনা সংগ্রহের নিষ্ঠুর পদ্ধতি নিয়ে নির্মিত একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়ার পর তিনি এ অবস্থান নেন।
উত্তর কোরিয়ার মতো একটি দেশে, যেখানে খাদ্যসংকট ও চরম দারিদ্র্যের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কিম জং উনের মতো শাসকের সঙ্গে বিতর্কিত ও বিলাসী খাবারের যোগসূত্র তার জীবনযাপন, ক্ষমতা এবং বিশেষ সুবিধার বিষয়টি সামনে আনে।