ছারপোকার উপদ্রবে ইংল্যান্ডে বাতিল হলো কয়েকটি ট্রেন যাত্রা

ছারপোকার উপদ্রবের কারণে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি ট্রেন যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কেন্ট, পূর্ব সাসেক্স ও গ্রেটার লন্ডনে ট্রেন পরিচালনা করে সাউথইস্টার্ন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা ট্রেনের ভেতরে ছারপোকার উপস্থিতি দেখতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলোকে নিয়মিত সূচি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

ট্রেন চালকরা তাদের ড্রাইভিং ক্যাবে এবং ব্যাগের ওপর ছাড়পোকা হেঁটে বেড়াতে দেখেছেন। চালকেরা আক্রান্ত ট্রেনে উঠতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন।

পূর্ব সাসেক্সের হেস্টিংসের কাছে অবস্থিত ‘ওয়েস্ট মেরিনা ট্রেইন কেয়ার ডিপো’ থেকে এই উপদ্রব ছড়িয়ে পড়েছে, যা লন্ডন ও কেন্টের মধ্যবর্তী রুটে ট্রেন সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া সাউথইস্টার্ন-এর ‘হাই স্পিড ১’ লাইনের ট্রেনগুলোতেও ছাড়পোকা দেখা পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২২ সেপ্টেম্বর। এদিন প্রথম ছারপোকা দেখার পর থেকে একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়। এরপর গত শুক্রবারও অন্তত তিনটি যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে।

রেলকর্মীদের কাছে ‘বেডবাগ এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত ট্রেনটি মঙ্গলবার লন্ডন ও কেন্টের বিভিন্ন স্টেশনের মধ্যে চলাচল করেছে। তবে ছারপোকা পাওয়ার পর ট্রেনটির দুটি বগি বন্ধ করে রাখা হয়। ট্রেনের এক প্রান্তে ছারপোকা দেখতে পেয়ে চালক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। এরপর সংক্রমণ ঠেকাতে বগি দুটি যাত্রীদের ব্যবহারের বাইরে রাখা হয়।

এর কয়েক দিন পর শুক্রবার সকালে ক্লিপটনভিল রোডে কর্মীদের প্রবেশপথের সামনে একটি কীটপতঙ্গ দমনকারী প্রতিষ্ঠানের গাড়ি দেখা যায়। ছারপোকার উপদ্রব মোকাবিলায় পশ্চিম মেরিনা ডিপোতে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয়েছিল।

কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের এক গাড়িচালক জানান, সাউথইস্টার্ন রেলের কয়েকটি ডিপোর সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের চুক্তি রয়েছে। এদিকে ছারপোকা নিয়ে উদ্বিগ্ন রেলকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সাউথইস্টার্নের ‘সার্ভিস কন্ট্রোল লগ’ বিশ্লেষণ করে ‘বেডবাগ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কীভাবে চলাচলের অনুমতি পেয়েছিল, তার বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ।

সপ্তাহের শুরুতে সাউথইস্টার্নের একটি ইনসিডেন্ট লগে বলা হয়, ছারপোকা আক্রান্ত একটি ট্রেনের চালক ছারপোকা থাকা একটি ট্রেনের ক্যাবে উঠে তা ডিপোর ভেতরে সরাতেও অস্বীকৃতি জানান। নিজের শরীরে যাতে ছারপোকা ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সাদা রঙের পোশাক বা পিপিই না পাওয়া পর্যন্ত ট্রেনে উঠবেন না বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

পোশাকগুলো না থাকায় বাধ্য হয়ে দুটি ট্রেন যাত্রা বাতিল করতে হয়, যার একটি ছাড়পোকা আক্রান্ত ট্রেনটির পেছনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সাউথইস্টার্ন-এর রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীরা বেডবাগ এক্সপ্রেস-কে রুট থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, সার্ভিস কন্ট্রোলারদের এই সমস্যার বিষয়ে কোনো তথ্যই জানানো হয়নি। ফলে পুরো মঙ্গলবার জুড়েই ট্রেনটি চলেছে - তবে ছারপোকা পাওয়া বগি এবং তার পাশের বগিটি তালাবদ্ধ থাকায় যাত্রীরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারেননি।

তিন বছর আগে ট্রেনে ছারপোকার উপস্থিতি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভ্রমণকারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে ওই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ছোট বাদামি রঙের এই পোকাগুলো বিছানা ও অন্যান্য আসবাবপত্রের উষ্ণ কোণ এবং ফাটলে লুকিয়ে থাকে। এরপর রাতের আঁধারে বের হয়ে মানুষকে কামড়ায়, যার ফলে শরীরে লালচে দাগ ও র‍্যাশ দেখা দেয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত বড় আসবাবপত্র ফেলে দিতে হয়।

কিংস ক্রসের কাছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার কার্যালয়ে ছারপোকার উপদ্রব দেখা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরটি উঠে আসে। সে সময় ভবনটিকে জীবাণুমুক্ত করতে কীটনাশক বিশেষজ্ঞদের ডেকে পাঠাতে হয়েছিল।

ওয়েস্ট মেরিনা ডিপোর ঠিক উল্টো পাশে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দারা - যাদের বাড়ি ঘরগুলো ডিপো থেকে কেবল একটি তারের জালের বেড়া দিয়ে পৃথক করা - ছাড়পোকার এই উপদ্রবের খবর শুনেও বেশ ধৈর্যশীল মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

ডিপোর একটি ভবনের বাইরে রাখা পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের স্তূপের দিকে ইঙ্গিত করে লোরেন নামের এক শিক্ষিকা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই শিক্ষিকা ভবনের গায়ে ‘ট্রেন ক্রু মেসরুম’ লেখা চিহ্নের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওগুলো কিন্তু পরশু দিনও এখানে ছিল না।”

তিনি বলেন, “খবরটা শুনে আমি খুব একটা অবাক হচ্ছি না। ওরা ট্রেনের সব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ এখানেই করে, আর ওই পাশেই ট্রেনগুলো ধোয়ামোছা করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার জানা মতে, এগুলোকে মাছির মতো বয়ে নিয়ে আসতে হয়। তবে পার্সেল বা ডেলিভারির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সব সময়ই থাকে।মাঝে মাঝে ডেলিভারিম্যানরা তার দরজায় পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার আগে ডিপোর সীমানা প্রাচীরের উল্টো দিকের নিচু দেওয়ালে এসে বসেন।”

এদিকে রেল, মেরিটাইম অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট' (আরএমটি) ইউনিয়নের এক মুখপাত্র জানান, তারা খুবই জটিল এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছেন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের উদ্বেগের সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছেন।

মোট চারটি ট্রেনে ছারপোকা থাকার খবর পাওয়া গিয়েছিল। যার মধ্যে দুটিতে নিশ্চিতভাবে পোকা মেলার পর সেগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে পুনরায় চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাউথইস্টার্ন-এর এক মুখপাত্র।  

রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির হেড অব ড্রাইভার্স অলি টার্নার বলেন, “আমাদের চালকদের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা মোকাবিলায় তারা আমাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন। এ ধরনের কোনো খবর পাওয়া মাত্রই আমরা ট্রেনগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি এবং কোনো ঝুঁকি না থাকলেই কেবল তা আবার চালুর অনুমতি দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “মাত্র দুটি ট্রেনের শুধু ড্রাইভারদের ক্যাবে ছাড়পোকা ধরা পড়েছে, যাত্রীদের বগিতে বা সাধারণ আসনে কোনো পোকা পাওয়া যায়নি। গ্রাহক ও কর্মচারীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে ট্রেন এবং স্টেশনগুলোতে নিয়মিত ও জোরদার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”