ফের আকস্মিক বন্যা, একাধিক সেতু বিধ্বস্ত, নিখোঁজ ৫

নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোর্খা জেলায় আকস্মিক বন্যায় অন্তত দুটি গ্রাম ও একাধিক সেতু পুরোপুরি ভেসে গেছে। দেশটির সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ ধর্মীয় উৎসব দসাই শুরুর দিনে এ দুর্যোগে অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে ৯ জন বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ৯৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

রবিবার (১১ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে সেনাবাহিনী চারটি হেলিকপ্টার এবং ৭০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে।

বন্যাদুর্গত চুমুনুব্রি পল্লী পৌরসভার চেয়ারম্যান নিমা লামা জানান, নিখোঁজ পাঁচজনই রাখাল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পাশাপাশি প্রায় ১০০টি গরুও নিখোঁজ রয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় ২০৪টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাড়ে ছয় শতাধিক মানুষ সরাসরি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।

সেতু ও প্রধান সড়কগুলো ধসে পড়ায় পুরো এলাকা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো ও চলাচলের একমাত্র মাধ্যম আকাশপথ।

আকস্মিক এ বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপাল সেনাবাহিনী আকাশপথে পর্যবেক্ষণের পর জানিয়েছে, বুড়ি গণ্ডকী নদীর উজানে তুমচে এলাকায় ভূমিধসের কারণে পানির প্রবাহ আটকে একটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সেই জলাধার ভেঙে গিয়ে নিম্নাঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়।

অনেকে হিমবাহ ধসের আশঙ্কা করলেও ঘন মেঘের কারণে স্যাটেলাইট চিত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়দের দ্রুত সতর্কতার কারণে আকস্মিক এ বন্যায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

রবিবার (১১ অক্টোবর) ভোর পৌনে ৫টার দিকে নদীতীরবর্তী জগৎবগর গ্রামের বাসিন্দা শুন গুরুং উজান থেকে ফোন পেয়ে সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। পরে তাদের উঁচু পাহাড়ি বনে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন বলে জানিয়েছে নেপালি সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট।

ভোর ৪টা ৫২ মিনিটে নিজের বাড়ি ভেসে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা বিশাল ঘালে ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করে নিম্নাঞ্চলের আরুঘাটের বাসিন্দাদের সতর্ক করেন।

অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সরকারি সতর্কতামূলক গণবার্তা বা এসএমএস উচ্চাঞ্চলে পৌঁছায় সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে। নিম্নাঞ্চলে তা পৌঁছাতে সকাল ৯টা বেজে যায়। ততক্ষণে স্থানীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিলেন।

বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের মুখপাত্র রাজন ভট্টরাই সতর্কবার্তা পৌঁছাতে বিলম্বের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে আরুঘাট বাজারে ছিল নিকটতম সেন্সর। ফলে দ্রুত তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি সতর্কবার্তার ওপর নির্ভর করতে হলে শত শত মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায়ই বন্যার পানিতে ভেসে যেতেন।

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের সীমান্তঘেঁষা দেশ নেপাল। দেশটির পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই পর্বতমালা। তবে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত। ভূমিধস ও তুষারধসের কারণে নিম্নাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রায়ই আকস্মিক ঢল ও বন্যার সৃষ্টি হয়।

এ ছাড়া নেপাল অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূকম্পনের প্রভাবে পাহাড়ের বরফ ও তুষারস্তর অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

২০১৫ সালে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। ওই ভূমিকম্পের কারণে মাউন্ট এভারেস্টে প্রাণঘাতী তুষারধসও হয়েছিল।

সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে শত শত মানুষের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে হিমালয়ের লাংতাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে শিলা ও বরফধসকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।