দিল্লিতে আন্দোলন ঠেকাতে বিজেপি সরকারের নতুন কৌশল

ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজন বন্ধ করে দিয়ে নির্ধারিত তিনটি স্থানে সমাবেশের ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার। তবে এসব স্থানে বিক্ষোভ, ধরনা বা অবস্থান কর্মসূচি আয়োজন করতে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি, নির্ধারিত স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের জন্য দিল্লি পুলিশের অনুমতিও নিতে হবে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) হিন্দুস্তান টাইমস এর একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলো। এ নিয়ে মামলাও করা হচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন বিধিনিষেধের ফলে রাজধানীতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও আন্দোলন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়বে।

নতুন ব্যবস্থায় বিক্ষোভকারীরা ইচ্ছামতো নির্ধারিত স্থানগুলোতে অবস্থান নিতে পারবেন না। আগে থেকে জায়গা খালি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে কর্মসূচির সময় নির্ধারণ করতে হবে। ফলে পছন্দের দিনে বিক্ষোভ আয়োজনের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে।

এর উদাহরণ হিসেবে দিল্লির রামলীলা ময়দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ ছাড়া অন্য কোনো দিন পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ, বাকি দিনগুলোতে ময়দানটিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে।

রামলীলা ময়দানে এক দিনের জন্য বিক্ষোভ আয়োজন করতে ভাড়া দিতে হবে ১ লাখ ২১ হাজার ৮০ রুপি। এর সঙ্গে ৫৫ হাজার রুপি নিরাপত্তা জামানতও জমা দিতে হবে। প্রায় ১২ একর আয়তনের এই ময়দান যন্তর মন্তর থেকে অন্তত চার কিলোমিটার দূরে।

একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের মাঠেও। রামলীলা ময়দানের সমান আয়তনের এই মাঠটি যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। সেখানে এক দিনের জন্য ৩ হাজার বর্গমিটার জায়গা ভাড়া নিতে খরচ হবে ১ লাখ ৮৭ হাজার রুপি। এ ছাড়া নিরাপত্তা জামানত হিসেবে দিতে হবে ৯৫ হাজার রুপি। মাঠটির মালিক দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ)।

উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দানও বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোর একটি। যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৫৭ একর আয়তনের এই মাঠটির মালিকও ডিডিএ। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে মাঠটির ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে মাঠটি আংশিকভাবেও ভাড়া নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে অর্থ ব্যয় করলেই যে বিক্ষোভ আয়োজন করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্ধারিত স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের জন্য দিল্লি পুলিশের অনুমতি নিতে হবে। বিয়েশাদি, সম্মেলন, মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক জনসভা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি বিক্ষোভের জন্য জায়গা পাওয়া গেলেও পুলিশের অনুমতি না মিললে কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব হবে না।

সমালোচকদের মতে, এ ব্যবস্থার ফলে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোর জন্য আন্দোলন আয়োজনের সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে। কারণ, রাজনৈতিক দাবি জানাতে বা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে মাঠ ভাড়া নেওয়ার সংস্কৃতি ভারতে প্রচলিত নয়।

ভারতে বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণ নিয়ে বিধিনিষেধের ইতিহাসও রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন নরসিংহ রাও সরকার বোট ক্লাবে জনবিক্ষোভ ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করে। এরপর যন্তর মন্তর হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

নির্ভয়া ধর্ষণ মামলায় সুবিচারের দাবিতে আন্দোলন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধী বিক্ষোভ এবং বিজেপির এক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নারী কুস্তিগিরদের যৌন হয়রানির অভিযোগে প্রতিবাদসহ বিভিন্ন আন্দোলনের সাক্ষী এই যন্তর মন্তর।

২০১১ সালে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করলেও পরবর্তী আন্দোলনের জন্য প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে রামলীলা ময়দান বেছে নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। এর ধারাবাহিকতায় আম আদমি পার্টির (আপ) জন্ম হয়।

নতুন বিধিনিষেধের ফলে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজনের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে রাজধানীতে প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।