অবশেষে চন্দ্রাভিযানে সফলতার পথে ভারত। গত ১৪ জুলাই এলভিএম-৩/এম৪ রকেটের সাহায্যে চাঁদের উদ্দেশে “চন্দ্রযান-৩” পাঠায় দেশটি। আগামী ২৩ বা ২৪ আগস্ট চন্দ্রযানটি চাঁদের মাটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০৮ সালে ভারত মহাকাশে প্রথমবারের মতো “চন্দ্রযান-১” পাঠায়। এটি চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেছিল। দুই বছর ছিল সেই অভিযানের মেয়াদ। কিন্তু ১০ মাস পর যানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে “চন্দ্রযান-২” পাঠায় ভারত। সেটিও অবতরণের শেষ পর্যায়ে এসে বিফল হয়। মাত্র ২.১ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকার সময় যানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তবে প্রদক্ষিণকারী যানটি এখনো চাঁদের কক্ষে ঘুরপাক খাচ্ছে। তথ্য পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে।
সফলতার দেখা তেমনভাবে না পেয়ে এবার আরও সাবধানে অভিযান চালায় ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। “চন্দ্রযান ৩” এর পরিকল্পনা করে নিখুঁতভাবে।
কলকাতার এমপি বিড়লা তারামণ্ডলের সাবেক কর্মকর্তা ড. দেবীপ্রসাদ দুয়ারী বলেন, “চণ্দ্রযান-৩ এ অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র রাখা হয়েছে। চাঁদের মাটি থেকে যানের দূরত্ব, অবতরণের জায়গার মাটি এবড়োখেবড়ো কি-না, তা আগে থেকে বোঝা যাবে। ভেলোসিমিটার দিয়ে যানের গতিবেগ মাপা হবে। অবতরণের সময় প্রতি সেকেন্ড গতিবেগ হবে মাত্র দুই মিটার।”
মহাকাশবিজ্ঞানী সন্দীপ সেনগুপ্ত বলেন, “গতবার অবতরণের সময় ভুল সিগন্যালের জেরে বেশি গতিতে চাঁদের বুকে ল্যান্ডার নেমে এসেছিল। তার ফলে বিপর্যয় ঘটে। এবার গতিবেগ বেড়ে গেলেও যেন যানটি অটুট থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। চন্দ্রযান ২-এর থেকে বেশি মজবুত করা হয়েছে এবারের ল্যান্ডারের পায়াগুলোকে।”
মহাকাশযানের সঙ্গে যেন সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেজন্য একাধিক সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ড. দুয়ারীর ভাষায়, “হেলিকপ্টার ও টাওয়ার ক্রেন থেকে নিচে ফেলা হয়েছে ল্যান্ডারকে। চাঁদের মাটির কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি করে সেখানে নামানো হয়েছে যানকে, যেন কোনো সমস্যা না হয়।”
চন্দ্রযানটি ১৪ দিন চাঁদে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করবে। এই প্রথম কোনো দেশের মহাকাশযান চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছাবে। একেবারে অজানা জগতের দরজা খুলে যেতে পারে এই অভিযানে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোমক রায়চৌধুরীর মতে, “চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে যে জায়গায় সূর্যের আলো পড়ে না, সেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ২০০ ডিগ্রি নিচে। এই অংশে বরফের আকারে জল থাকতে পারে। উত্তর গোলার্ধের মাটি ও পাথর পৃথিবীতে এনে গবেষণা করেছে তিনটি দেশ। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধ অনেকটাই অচেনা। সেখানকার মাটিতে কী খনিজ পদার্থ আছে, বাতাস কী দিয়ে তৈরি, মাটির তলায় কত তাপমাত্রা ইত্যাদি নানা তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”
চন্দ্রযান ৩-এর ক্যামেরার নকশা তৈরি করেছেন বাঙালি বিজ্ঞানী অনুজ নন্দী। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরের বাসিন্দা। তিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোতে আট বছর ধরে কর্মরত আছেন।
শীতল যুদ্ধের সময় মহাকাশে অভিযানের দৌড়ে শামিল হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই দুই পরাশক্তি ছাড়া চীনও চাঁদে সফল অভিযান চালিয়েছে। ২০২০ সালে বেজিংয়ের ল্যান্ডার চাঁদ স্পর্শ করে। এবার আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প গ্রহণ করলো ভারত। এই প্রকল্পের জন্য ভারত ব্যয় করেছে ৬১৫ কোটি টাকা।