যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ছুরি হামলার শিকার হওয়াকে এখনও ব্যাখ্যা করতে পারেন না প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদি। আর ওই ঘটনার পর বেঁচে থাকা একটি অলৌকিক ঘটনা বলেও মনে করেন তিনি। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের অভাব থাকলেও তিনি এমনটি মনে করেন এই লেখক।
সম্প্রতি রুশদি একটি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেন।
৭৬ বছর বয়সী লেখক তার ওপর হামলাকারীকে “একটি স্কোয়াট মিসাইল” হিসেবে বর্ণনা করেন। তার কথায়, আকাশ থেকে কেউ এসে আমাকে রক্ষা করেছে এমনটি মনে করেন না তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও দ্বন্দ্ব রয়েছে তার মধ্যে।
হারিয়ে ফেলা ডান চোখে শেষবার ওই হামলাকারীকে দেখেছিলেন জানান তিনি।
রুশদি বলেন, “একটি কঠিন বা ভয়াবহ কিছু ছুটে আসছে। ডান চোখে এটাই ছিল শেষ দেখা কিছু।”
২০২২ সালের ১২ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে উঠে রুশদির ওপরে হামলা চালান হাদি মাটার নামের এক যুবক। ছুরি দিয়ে রুশদিকে ১০ বারেরও বেশি আঘাত করে সে।
আহত অবস্থায় ছয় সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলেন রুশদি। হামলায় এক চোখে দৃষ্টিহীনতা ও স্নায়ুতে ভীষণ চোট পাওয়ার কারণে একটি হাতও প্রায় অকেজো তার।
৩০ বছরেরও বেশি আগে ইরানের ধর্মগুরুর জারি করা ফতোয়া কার্যকর করতে ওই যুবক রুশদির ওপর হামলা চালায় বলে জানায়।
আদালতে মাটার জানিয়েছে, সে নিজেকে “নট গিল্টি” অর্থাৎ “নিরপরাধ” বলেই মনে করে। ফলে তার অপরাধ নির্ধারণ করে সাজা ঘোষণার আগে কিছুদিন ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলবে। তখন আদালতে হাজিরা দিতে হবে রুশদিকে। আততায়ীর মুখোমুখি হলে তার “ট্রমা” আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা লেখকের।
হামলার সময় মঞ্চে রুশদির পাশে বসেছিলেন নির্বাসিত লেখকদের দাবির পক্ষে কাজ করা সিটি অব অ্যাসাইলামের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হেনরি রিস। ওই সময় সঞ্চালনা করছিলেন তিনি। হামলায় আহত হন এই উপস্থাপকও। সেদিন নিজের চোখে দেখা ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজেছেন তিনি।
হেনরি রিস বলেন, “যখন এমন কিছু হয়, তখন লেখার গুরুত্বের প্রশ্নটি খুব বাস্তব হয়ে ওঠে। সেদিনের সহিংসতা সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, লেখার কারণে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের কতটা সচেতন থাকা দরকার।”
তিনি বলেন, “এমন কিছু সম্পর্কে লিখতে পারার জন্য প্রস্তুতির দরকার আছে। আমি লিখতে চাই। কিন্তু ভাষা পাই না। তবে সালমান কি লেখেন তা আমি দেখতে চাই।”
২০২২ সালে ওই হামলার পর দায়ী হাদি মাতার (২৪) নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এতবার আঘাতের পরও রুশদি বেঁচে আছেন শুনেই তিনি আশ্চর্য হয়েছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, হাদি মাতারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি রুশদির কোনো বই পড়েছেন কিনা; এর উত্তরে হাদি বলেছেন, “আমি কয়েকটা পাতা পড়েছি। আমি তাকে একদম পছন্দ করি না। আমার মতে, তিনি ভালো মানুষ নন। তিনি ইসলামকে আক্রমণ করেছেন, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে আঘাত করেছেন।”
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত রুশদির চতুর্থ উপন্যাস “স্যাটানিক ভার্সেস” বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই লেখকের মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া ঘোষণা করেন। সেসময় রুশদির মাথার দাম ঘোষণা করা হয় ৩০ লাখ ডলার। ইরানের সেই ঘোষণা এখনো বহাল আছে।
তবে সন্দেহভাজন এই আততায়ী রুশদির ওপর হামলা করতে ১৯৮৯ সালের সেই আদেশ বা ফতোয়া দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সাক্ষাৎকারে হাদি বলেন, “আমি এ বিষয়ে যা বলতে পারি তা হলো- আমি আয়াতুল্লাহকে সম্মান করি। আমি মনে করি তিনি একজন মহান ব্যক্তি। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। চলতি বছরের শুরুতে একটি টুইটের মাধ্যমে জানতে পারি, শাটাকোয়া ইনস্টিটিউশনের সাহিত্য সিরিজে বক্তৃতা করবেন রুশদি।”
সালমান রুশদির জন্ম ১৯৪৭ সালে মুম্বাইয়ে এক কাশ্মিরি মুসলিম পরিবারে, ভারত ভাগের ঠিক আগে আগে। ১৯৮১ সালে তার দ্বিতীয় উপন্যাস “মিডনাইটস চিলড্রেন” প্রকাশিত হলে লেখক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। শুধু যুক্তরাজ্যেই বইটির ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়।