মোশন সিকনেস কেন হয়, এই সমস্যা কি নারীদের বেশি?

ভ্রমণের সময় অনেকেরই মাথা ঘোরে, গা গুলিয়ে ওঠে, এমনকি বমিও হয়। বাস, গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজে চলার সময় এমনটা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যার নাম মোশন সিকনেস। কিন্তু চলন্ত যানবাহনে উঠলেই কেন এমন হয়? আর ভ্রমণের সময় বমি বমি ভাব এড়ানোর উপায় কী?

মোশন সিকনেস কী ও কেন হয়? 

মোশন সিকনেস হলো এমন এক অবস্থা যখন কোনো ব্যক্তি গাড়িতে ভ্রমণ করার সময়ে মাথাঘোরা, মাথাব্যাথা বা অস্থিরতায় ভোগেন ও বমি করেন।

এই সমস্যা প্রায়ই দেখা দেয় কার, বাস, ট্রেন, জাহাজ বা উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময়ে। কিছু মানুষ এই সমস্যায় আরো বেশি ভোগেন পাহাড়ি রাস্তায়। সাগর কিংবা আকাশে ভ্রমণের সময়ে যে ধরনের সমস্যা হয়, সেটির সাথে যানবাহনে সৃষ্ট সমস্যার মিল রয়েছে।মোশন সিকনেসের প্রধান কারণ হলো চোখ ও কানের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষাকারী ব্যবস্থার কাছ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছানো সংকেতের মধ্যে অসামঞ্জস্য।

ভারতের দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মহসিন ওয়ালী বলেন, “আমরা যখন ভ্রমণ করি, তখন চোখ ও কান থেকে ভিন্ন সংকেত পায় মস্তিষ্ক। আপনি যদি গাড়ি বা বাসে বসে থাকেন, নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিংবা কোনো বই পড়তে থাকেন তাহলে আপনার চোখ মস্তিষ্ককে বোঝাবে যে আপনি নড়ছেন না। কিন্তু আপনার কানের ব্যালেন্স সিস্টেম মস্তিষ্ককে ঠিকই জানাবে যে শরীরটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরছে।”

তার মতে, এ ধরনের সংকেতগুলো শরীরকে বোঝায় যে বিষাক্ত কিছু শরীরে প্রবেশ করেছে। আর শরীর জানে যে বিষাক্ত কিছু বের করার একমাত্র উপায় হলো বমি করা

২০১৫ সালে প্রকাশিত বিবিসির সংবাদদাতা কাটিয়া মস্কভিচের করা প্রতিবেদন অনুসারে, মোশন সিকনেস একটি ব্যাধি। এতে ভোগেন প্রতি তিনজনে একজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে মোশন সিকনেসে কে, কখন প্রভাবিত হবেন সেটির ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয় এবং এর কোনো নিরাময় নেই।

অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (এআইআইএমএস) নিউরোলজি ডিপার্টমেন্টের ডা. মানজারি ত্রিপাঠি বলেন, “মোশন সিকনেসের কারণ হলো আমাদের শরীরের ব্যালেন্স সিস্টেম সঠিকভাবে সমন্বয় বা তাল মেলাতে পারে না। মূলত কানের অভ্যন্তরে থাকা ব্যালেন্স অরগানের (ভেস্টিবুলার সিস্টেম) সাথে শরীরের এই ব্যালেন্স সিস্টেম সংযুক্ত।”

বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

ভ্রমণের সময়ে বমি হয় কেন?

ভ্রমণে বমি বমি ভাবের যে সমস্যা তা কিন্তু সবার জন্য এক না। কেউ কেউ যাত্রা শুরুর পরপরই অস্বস্তি অনুভব করে, অবার কেউ কেউ দীর্ঘ যাত্রার পর বমি বমি ভাবে ভোগেন। উঁচু-নিচু সড়ক, পাহাড়ি পথ, যানবাহনে ক্রমাগত ঝাঁকুনি এবং যানবাহনের ভেতরে থাকা বাজে গন্ধ এই সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ডা. মহসিন ওয়ালির মতে, আমাদের মস্তিষ্কে ফ্লুইড রয়েছে। ভ্রমণের সময়ে এই ফ্লুইড যখন নাড়া খায় তখন এটিতে কম্পন তৈরি হয় যা গলায় পৌঁছায়। গলা নড়াচড়ার ফলে সেই কম্পনগুলো চলে যায় মাথার খুলিতে।

এই প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের ব্যালেন্স বাধাগ্রস্ত করে এবং এর ফলে বমি বমি ভাব, মাথাঘোরা ও অস্বস্তির মতো সমস্যা তৈরি করে। যখন তা সহ্য করার মতো থাকে না, তখন বমি হয়।

ভ্রমণের সময়ে বমি করা এড়ানোর জন্য যা করবেন

ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন: ডা. মহসিন ওয়ালি ভ্রমণের ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

খালি পেটে যাত্রা করবেন না: ভ্রমণের আগে হালকা খাবার বা নাশতা খেয়ে নিন।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ নিন: মোশন সিকনেস প্রতিরোধে বমি কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

চলন্ত গাড়িতে বই পড়া বা মুঠোফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: এসবের দিকে মনোযোগ দিলে চোখ ও শরীরের নড়াচড়া সম্পর্কে মস্তিষ্কে পাওয়া সংকেতের মধ্যে অমিল তৈরি হতে পারে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও চলন্ত যানবাহনে বই পড়ার সঙ্গে মোশন সিকনেসের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

শরীরের নড়াচড়া কমিয়ে রাখুন: মাথা সিটে ঠেকিয়ে রাখুন। মাথা ও শরীরের অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।

সামনের রাস্তা দেখা যায়, এমন আসনে বসুন: সম্ভব হলে সামনের দিকে বসুন, যাতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন।

নিকোটিন এড়িয়ে চলুন: ধূমপান ও নিকোটিন গ্রহণে অস্বস্তি বাড়তে পারে। ভ্রমণের সময় এগুলো এড়িয়ে চলুন।

অস্বস্তি হলে বিরতি নিন: বমি বমি ভাব শুরু হলে নিরাপদ স্থানে যানবাহন থামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। এরপর স্বস্তি বোধ করলে আবার যাত্রা শুরু করুন।

আনন্দদায়ক গান শুনুন: ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, হালকা ও আনন্দদায়ক গান শোনা ভ্রমণের সময় বমি বমি ভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।

বারবার বমি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: ক্রমাগত বমি হলে বা পানি পান করেও তা ধরে রাখতে না পারলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

নারীদের কি মোশন সিকনেস বেশি হয়?

এআইআইএমএসের স্নায়ুরোগ বিভাগের চিকিৎসক মানজারি ত্রিপাঠির মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এর পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও হরমোনজনিত কারণ থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নারী ও পুরুষের জীবনযাত্রার পার্থক্যও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠিক কোন কারণে নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

এর ব্যাখ্যায় ডা. মহসিন ওয়ালি জানান, এর সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হলো রক্তচাপের পার্থক্য। সাধারণভাবে নারীদের তুলনায় পুরুষদের গড় রক্তচাপ বেশি। তাঁর মতে, নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে মোশন সিকনেসের উপসর্গ দ্রুত দেখা দিতে পারে। 

আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো পোশ্চারাল হাইপোটেনশন। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে যায়। ডা. মহসিন ওয়ালির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনেক নারী গৃহস্থালির কাজে, বিশেষ করে রান্নাঘরে, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কারও কারও রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাবসহ মোশন সিকনেসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

নারীদের শরীরে নিয়মিত হরমোনের পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ডা. মহসিন ওয়ালি। বিশেষ করে মাসিকের সময় শরীরে পানি, লবণ ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে কারও কারও রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ বাড়তে পারে। ডা. ওয়ালির ব্যাখ্যায়, এ ধরনের শারীরিক পরিবর্তন মোশন সিকনেসের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

ডা. মহসিন ওয়ালির মতে, নারীদের মস্তিষ্কের গড় আয়তন পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১৫০ মিলিলিটার কম। তার ধারণা, মস্তিষ্কের আকারের এই পার্থক্য বাইরের উদ্দীপনার প্রতি নারীদের সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, ডা. মহসিন ওয়ালির মতে, রক্তচাপের পার্থক্য, পোশ্চারাল হাইপোটেনশন, হরমোনের পরিবর্তন এবং শারীরিক গঠনের মতো বিষয় নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এসব কারণের প্রতিটির ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

ভ্রমণের সময় সাময়িক বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরা হতে পারে। তবে বারবার বমি হলে, পানি পান করেও তা ধরে রাখতে না পারলে কিংবা মাথা ঘোরার সমস্যা তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

যানবাহনে ভ্রমণ না করলেও যদি বারবার বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। মোশন সিকনেস ছাড়াও অন্য শারীরিক সমস্যা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।