একবারে বেশি করে রান্না করে ফ্রিজে রেখে কয়েক দিন ধরে খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য এটি সময় বাঁচানোর সহজ উপায়। তবে রান্না করা খাবার ফ্রিজে রাখার পর বারবার গরম করে খাওয়া কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একই খাবার বারবার গরম করলেই কি তা বিষাক্ত হয়ে যায়? নাকি খাবার কতক্ষণ ফ্রিজের বাইরে থাকছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এ বিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন কিছু পরামর্শ।
জীবনধারাবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এসব পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা ‘স্টপ ফুডবর্ন ইলনেস’-এর পরিচালক ও খাদ্যবিজ্ঞানী ডা. ভ্যানেসা কফম্যান বলেন, “বাসি খাবার বারবার গরম করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষাক্ত বা অনিরাপদ হয়ে যায় না। তবে এতে খাবারের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ কমতে পারে। মূল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় খাবারটি কতক্ষণ ফ্রিজের বাইরে রাখা হচ্ছে, তার ওপর।”
ঘরের তাপমাত্রায় কতক্ষণ রাখা নিরাপদ?
খাদ্যবিজ্ঞানীদের মতে, রান্না করা খাবার ফ্রিজ থেকে বের করার পর ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখলে তাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি বাড়ে।
ডা. ভ্যানেসা কফম্যানের পরামর্শ অনুযায়ী, পচনশীল খাবার ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় মোট দুই ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। তবে ঘরের তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার বেশি হলে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা।
বিষয়টি বোঝাতে তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন, আলুভর্তা বা তরকারি রান্নার পর টেবিলে এক ঘণ্টা রাখা হলো। এরপর বাকি খাবার ফ্রিজে রেখে পরদিন আবার বের করে আরও এক ঘণ্টা বাইরে রাখা হলো। এভাবে খাবারটি ঘরের তাপমাত্রায় থাকছে মোট দুই ঘণ্টা। এতে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন খাবার ফেলে দেওয়া উচিত।
বারবার পুরো পাত্র ফ্রিজ থেকে বের করলে খাবারটি মোট কতক্ষণ বাইরে থাকছে, তার হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ঝুঁকি এড়াতে বিশেষজ্ঞরা যতটুকু খাবার প্রয়োজন, ততটুকু আলাদা পাত্রে নিয়ে গরম করার পরামর্শ দিয়েছেন। বাকি খাবার দ্রুত ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।
ফ্রিজে রাখা খাবার কত দিন খাওয়া যায়?
ফ্রিজে রাখলেই রান্না করা খাবার অনির্দিষ্টকাল ভালো থাকে না। খাবারের ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণের সময়সীমাও আলাদা। বেশিরভাগ রান্না করা খাবার ফ্রিজে সর্বোচ্চ তিন দিন রাখা নিরাপদ। এরপর খাবার ফেলে দিতে হবে অথবা ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়িতে তৈরি হুইপড ক্রিম এবং মাংসের ঝোল বা গ্রেভি ফ্রিজে রাখার পর এক দিনের মধ্যে খেয়ে শেষ করা উচিত।
খাবার নিরাপদ রাখতে যা করবেন
খাদ্যবাহিত রোগ বা ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি কমাতে ডা. ভ্যানেসা কফম্যান কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন -
ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখুন: রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার নিচে রাখতে হবে। ডিপ ফ্রিজের তাপমাত্রা হওয়া উচিত শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ১৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার নিচে। এতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর হয়।
১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় গরম করুন: বাসি খাবার পুনরায় গরম করার সময় এর তাপমাত্রা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত নিতে হবে। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করার সময় কয়েকবার চামচ দিয়ে নেড়ে দিতে হবে। কারণ এতে সব জায়গায় সমানভাবে তাপ পৌঁছায় না।
কাঁচা খাবার থেকে আলাদা রাখুন: ফ্রিজে রান্না করা খাবারের পাত্র ঢেকে রাখতে হবে। পাশাপাশি কাঁচা মাংস, মাছ ও মুরগি থেকে আলাদা জায়গায় রাখতে হবে। এতে কাঁচা খাবার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
ডা. ভ্যানেসা কফম্যান সতর্ক করে বলেন, “খাবার বেশি গরম করলেই সব জীবাণু ও বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট হয়ে যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। কিছু ব্যাকটেরিয়া খাবারে এমন বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন তৈরি করতে পারে, যা ফুটন্ত তাপমাত্রায় গরম করলেও নষ্ট হয় না। এসব খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে।”
তাই শুধু খাবার গরম করলেই হবে না, রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করা, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গরম করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।