কোনো আড্ডা বা অনুষ্ঠানে বেশ ভালো সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু বাসায় ফেরার পরই মনে হতে শুরু করলো, একটু আগে বলা কথাটি কি ঠিক ছিল? কেউ কি আপনার কোনো কথায় বিরক্ত হয়েছেন? আপনার আচরণ কি কারও কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে? এরপর পুরো কথোপকথনটি বারবার মনে করতে থাকলেন। ভাবতে লাগলেন, কথাগুলো আরেকটু অন্যভাবে বললে হয়তো ভালো হতো।
এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কথোপকথন শেষ হওয়ার পর নিজের বলা কথা ও আচরণ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘পোস্ট-ইভেন্ট রিউমিনেশন’। বিশেষ করে যাদের মধ্যে সামাজিক উদ্বেগ বা সোশ্যাল অ্যাংজাইটি রয়েছে, তাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যেতে পারে।
কথোপকথনের পর অন্যরা কী ভাবলেন, কোথায় ভুল হলো কিংবা নিজের আচরণ কেমন ছিল - এসব নিয়ে বারবার চিন্তা করলে মানসিক অস্বস্তি বাড়তে পারে। এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আটটি কৌশলের পরামর্শ দিয়েছেন ভারতীয় মনোরোগবিদ ডা. সুমনা কোল (এমবিবিএস)।
নিজের চিন্তাকেই সত্য বলে ধরে নেবেন না
আপনার মনে হতে পারে, অন্যরা আপনাকে নেতিবাচকভাবে বিচার করেছেন। কিন্তু আপনার এমন মনে হওয়া আর বাস্তবে অন্যরা আপনাকে সেভাবে বিচার করা এক বিষয় নয়।
ধরুন, কারও সঙ্গে কথা বলার সময় একটি মন্তব্য করার পর তিনি চুপ হয়ে গেলেন। আপনার মনে হলো, তিনি নিশ্চয়ই কথাটিতে বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু তার চুপ থাকার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। হয়তো তিনি অন্য কিছু ভাবছিলেন, কিংবা কী বলবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
তাই কোনো ঘটনা নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন। ওই ব্যক্তি কি সত্যিই নেতিবাচক কিছু বলেছেন? নাকি তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে আপনি নিজেই একটি অর্থ তৈরি করেছেন? ঘটনাটির অন্য কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে কি?
একই কথোপকথন বারবার বিশ্লেষণ করা বন্ধ করুন
একই ঘটনা বারবার মনে করলেও সাধারণত নতুন কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। বরং কোন কথাটি ভুল হয়েছে, অন্যরা কী ভেবেছেন - এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে পারে।
ডা. সুমনা কোলের পরামর্শ, যখন বুঝতে পারবেন আবারও সেই কথোপকথন নিয়ে ভাবছেন, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দিন, বিষয়টি নিয়ে আগেও অনেকবার ভেবেছেন। আবার ভাবলেই যে সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
নিজেকে বলতে পারেন, ‘আমি এই বিষয়টি নিয়ে অনেকবার ভেবেছি। আবার ভাবলেই যে উত্তর পাবো, তার নিশ্চয়তা নেই।’
এরপর মনোযোগ বর্তমান কাজে ফেরানোর চেষ্টা করুন। প্রথম দিকে চিন্তা আবার ফিরে আসতে পারে। এতে হতাশ না হয়ে প্রতিবার মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানোর অনুশীলন করুন।
নিজের প্রতি সদয় হোন
অন্য কেউ কথা বলতে গিয়ে সামান্য ভুল করলে আপনি কি তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবেন? সম্ভবত না। অথচ নিজের ক্ষেত্রে ছোটখাটো ভুলকেও অনেক বড় করে দেখেন।
ডা. কোলের পরামর্শ, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, কথা বলতে গিয়ে প্রত্যেকেরই সামান্য ভুল হতে পারে। সব কথোপকথন নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝলেও তা আপনার ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। নিজের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলুন, যেভাবে কোনো প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতেন। ছোটখাটো ভুলের জন্য নিজেকে অতিরিক্ত দোষারোপ করার প্রয়োজন নেই।
অন্যের মনের কথা অনুমান করা বন্ধ করুন
সামাজিক উদ্বেগের ক্ষেত্রে অনেক সময় মনে হতে পারে, অন্যরা নিশ্চয়ই আমাদের দুর্বলতা, ভুল কিংবা অস্বস্তি লক্ষ করছেন। এমনকি তাদের সাধারণ আচরণের মধ্যেও নিজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব খুঁজে পাওয়া যায়।
মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের চিন্তাকে বলা হয় ‘মাইন্ড রিডিং’। অর্থাৎ, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই অন্যের মনে কী চলছে, তা জানেন বলে ধরে নেওয়া। যেমন - কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আপনার মনে হলো, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে নিয়ে হাসছেন। কিন্তু তিনি কেন হাসলেন, তা আপনি জানেন না। শুধু এই ঘটনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট তথ্য আপনার কাছে নেই।
এ ধরনের চিন্তা এলে নিজেকে মনে করিয়ে দিন, অন্যের মনের কথা আপনি জানেন না। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই।
নিজের দিকে নয়, কথোপকথনে মনোযোগ দিন
কথা বলার সময় কি বারবার ভাবেন, আপনার মুখের অভিব্যক্তি কেমন, কণ্ঠস্বর কাঁপছে কিনা কিংবা অন্যরা আপনাকে কীভাবে দেখছেন? এমন হলে কথোপকথনের চেয়ে নিজের আচরণ পর্যবেক্ষণেই বেশি মনোযোগ চলে যায়।
নিজেকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। তাই অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে সামনের ব্যক্তি কী বলছেন, তা মন দিয়ে শুনুন। তার কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন এবং আলোচনায় অংশ নিন।
লক্ষ্য নিখুঁতভাবে কথা বলা নয়; বরং কথোপকথনে স্বাভাবিকভাবে অংশ নেওয়া।
অস্বস্তি এড়িয়ে না গিয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন
ভয়ের কারণে সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চললে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ভয় কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই ধীরে ধীরে ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. সুমনা কোল। যেমন -
পরিচিত কারও সঙ্গে নিজে থেকে কথা শুরু করুন।
দোকানে বা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশ্নটি নিজে করুন।
ছোট কোনো আলোচনায় নিজের মতামত প্রকাশ করুন।
কথা বলার পর প্রতিটি বাক্যে ভুল খোঁজার বদলে অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখলেন, তা ভাবুন।
নিজেকে জোর করে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলবেন না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে এগোনোর চেষ্টা করুন।
কথোপকথনের পর বারবার আশ্বাস চাওয়ার অভ্যাস কমান
কথা বলার পর কখনো কখনো অন্যকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হতে পারে, ‘আমি কি কোনো ভুল বলেছি?’ কিংবা ‘তুমি কি আমার কথায় কিছু মনে করেছ?’
মাঝেমধ্যে অন্যের মতামত জানতে চাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একই বিষয়ে বারবার আশ্বাস চাইলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও সন্দেহ আবার ফিরে আসতে পারে। তাই প্রতিবার আশ্বাস চাওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই কোনো সমস্যা হয়েছে, নাকি শুধু নিজের অনিশ্চয়তা দূর করতে চাইছেন?
চিন্তা করার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন
কোনো কথোপকথন নিয়ে চিন্তা বারবার ফিরে এলে সারাদিন সেটি নিয়ে ভাবার বদলে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কয়েক মিনিট সময় রাখতে পারেন।
সেই সময়ে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন -
কী ঘটেছিল?
আমি কী অনুমান করছি?
বাস্তব তথ্য কী?
ভবিষ্যতে কিছু পরিবর্তন করার আছে কি?
যদি কোনো বাস্তব ভুল হয়ে থাকে, তা থেকে শিক্ষা নিন। আর যদি নতুন করে কিছু করার না থাকে, তাহলে ঘটনাটির সব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাস করুন।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
কথোপকথনের পর নিজের বলা কথা বা আচরণ নিয়ে কিছুটা ভাবা অস্বাভাবিক নয়। তবে এই চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে বাধ্য করে কিংবা কাজ, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সামাজিক উদ্বেগ মোকাবিলায় কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।
সব কথোপকথন নিখুঁত হবে, এমন প্রত্যাশা নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি কী বলেছেন বা অন্যরা কী ভেবেছেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। বরং নিজের ভুল মেনে নেওয়া, অন্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অযথা অনুমান না করা এবং অস্বস্তি সত্ত্বেও ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মিশতে শেখাই গুরুত্বপূর্ণ।