বেশি গরম চা খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছেন না তো?

সকালে এক কাপ চা দিয়ে দিন শুরু করার অভ্যাস অনেকেরই। ক্লান্তি দূর করে সতেজতা আনতে চায়ের জুড়ি নেই। তবে চা পানের সঙ্গে হৃদরোগ ও রক্তনালির বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে গবেষণায়। কিন্তু চায়ের উপকারিতা পেতে শুধু নিয়মিত পান করাই যথেষ্ট নয়। চা কতটা কড়া করে তৈরি করছেন এবং কতটা গরম অবস্থায় পান করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চা পানের অভ্যাস ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত গবেষণাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনে বিস্তারিত লিখেছেন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. লিয়ানা ওয়েন।

গবেষণায় চীনের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৪ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা সপ্তাহে কত দিন চা পান করেন, কোন ধরনের চা পছন্দ করেন, কতটা কড়া করে চা তৈরি করেন এবং কী তাপমাত্রায় পান করেন।

প্রায় নয় বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা। এ সময়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত ১৪,৮০০টির বেশি রোগ শনাক্ত হয়। এসব রোগের মধ্যে ছিল হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ। শেষের রোগটিতে হাত ও পায়ে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিগুলো সরু হয়ে যায়।

নিয়মিত চা পানে কতটা কমে হৃদরোগের ঝুঁকি 

ডা. লিয়ানা ওয়েনের মতে, গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ১১% কম। বয়স, ধূমপানের অভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের ওজন এবং আগে থেকে থাকা অন্যান্য রোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই পার্থক্য দেখা গেছে।

তবে শুধু চা পান করলেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমবে, এমন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ধূমপান করেন না, নিয়মিত চা পান করেন এবং শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয়, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম।

চায়ের ঘনত্বের সঙ্গেও হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাঝারি মাত্রায় কড়া চা পানকারীদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি কম দেখা গেছে। গ্রিন টির তুলনায় লিকার চা বা ব্ল্যাক টি পানকারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্কও বেশি পাওয়া গেছে।

তবে গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গেছে চায়ের তাপমাত্রার ক্ষেত্রে। যারা জিভ পুড়ে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত গরম চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় ১৬% বেশি দেখা গেছে।

অন্যদিকে, স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা সহনীয় গরম চা পানকারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ডা. ওয়েন জানান, গবেষকরা সরাসরি চায়ের তাপমাত্রা পরিমাপ করেননি। এক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে একজনের কাছে যে চা অতিরিক্ত গরম মনে হয়, অন্যজনের কাছে সেটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে। এছাড়া যারা অতিরিক্ত গরম চা পান করেন, তাদের খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাপনের অন্য কোনো বিষয়ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

চা কীভাবে হৃদযন্ত্রের উপকার করে

চায়ের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারের পেছনে রয়েছে এর কিছু প্রাকৃতিক উপাদান। ডা. ওয়েন জানান, চায়ে পলিফেনল নামের যৌগ থাকে, যার মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েডও রয়েছে। এসব উপাদানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহরোধী গুণ রয়েছে।

এগুলো রক্তনালির ভেতরের কোষকে সুরক্ষা দিতে এবং ধমনির প্রসারণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ কমে।

বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত চা পানের সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রার কিছুটা উন্নতির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এ কারণে নিয়মিত চা পানকারীদের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের হার তুলনামূলক কম দেখা যায়।

চিনি ছাড়া চা পান করলে বাড়তি কিছু সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে। ফলের জুস, সোডা বা কোমল পানীয়ের পরিবর্তে চা পান করলে শরীরে অতিরিক্ত চিনি প্রবেশের পরিমাণ কমে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুবিধা হয়। পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্ল্যাক টি নাকি গ্রিন টি, কোনটি বেশি উপকারী

ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি - দুই ধরনের চা একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থেকে তৈরি হয়। তবে চা-পাতা প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এ দুই ধরনের চায়ের পলিফেনলের গঠনেও পার্থক্য থাকে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বিভিন্ন গবেষণায় ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি - দুই ধরনের চায়েরই স্বাস্থ্যগত উপকারিতা পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণাতেও গ্রিন টির উপকারিতা দেখা গেছে। তবে ব্ল্যাক টির ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক তুলনামূলক ধারাবাহিকভাবে পাওয়া গেছে।

তবে এ কারণে এক ধরনের চা বাদ দিয়ে অন্যটি পান করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ডা. ওয়েন। তার মতে, চিনি ছাড়া পান করলে ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি - দুটিই হৃদযন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

দিনে কত কাপ চা পান করা উচিত

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা সপ্তাহে অন্তত একবার চা পান করেন, তাদের দৈনিক চা পানের পরিমাণের সঙ্গে রোগের ঝুঁকির সম্পর্কও বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, যারা দিনে প্রায় ছয় থেকে আট কাপ চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম। তবে এর চেয়ে বেশি চা পান করলে ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকেরই দিনে ছয় থেকে আট কাপ চা পান করা উচিত। ডা. ওয়েন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, গবেষণায় চায়ের কাপের কোনো নির্দিষ্ট মাপ নির্ধারণ করা হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতে চা পানের পরিমাণ বিবেচনা করা হয়েছে। তাই দিনে ছয় থেকে আট কাপ চাকে আদর্শ পরিমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

চা পানের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। আট আউন্স বা প্রায় ২৪০ মিলিলিটার ব্ল্যাক টিতে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। গ্রিন টিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ কিছুটা কম।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে গর্ভবতী নারীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশুদের ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা উচিত নয়।

চা পানের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

চা পানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এর তাপমাত্রাকে। ডা. ওয়েনের পরামর্শ, মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার মতো গরম চা পান করা উচিত নয়। কারণ, বারবার অতিরিক্ত গরম পানীয় পানের সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যান্সার বা ইসোফেজিয়াল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই চা তৈরির পর কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা ভালো। এমন তাপমাত্রায় চা পান করা উচিত, যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চুমুক দেওয়া যায় এবং মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে।

চিনি ছাড়া ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের চা বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে যাদের ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ বা বুক ধড়ফড় করার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আর যারা একেবারেই চা পান করেন না, তাদের নতুন করে চা পানের অভ্যাস শুরু করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ডা. ওয়েন। তার মতে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।