হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ সবসময় নাটকীয়ভাবে বা তীব্র বুকে ব্যথা দিয়ে শুরু হয় না; বরং এটি অত্যন্ত নীরবে বুকে সামান্য চাপ কিংবা পেটে গ্যাসের সমস্যার মতো সাধারণ লক্ষণ নিয়ে শুরু হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে হৃদপিণ্ডের পেশিগুলো দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন নির্দেশিকা ও পরামর্শে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ এবং এর পরবর্তী জরুরি পদক্ষেপগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সাধারণত বুকের মাঝখানে চাপ, আঁটসাঁট ভাব, চেপে ধরা বা ভারী কোনো কিছু চেপে থাকার মতো অনুভূতি হতে পারে। এই ব্যথা বা অস্বস্তি ধীরে ধীরে বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডা ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, মাথা ঘোরানো বা প্রচণ্ড ক্লান্তি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানান, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবসময় চিরাচরিত নিয়মে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় তাদের বুকে কোনো ব্যথা থাকে না; কেবল শ্বাসকষ্ট, চরম ক্লান্তি, চোয়াল, পিঠ বা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দেয়। অনেকেই এটিকে সাধারণ গ্যাস বা অ্যাসিডিটি ভেবে ভুল করেন এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করে ফেলেন। তাই সন্দেহ হলে এটিকে হার্ট অ্যাটাক হিসেবেই ধরে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ৫ মিনিটে করণীয়
তৎক্ষণাৎ থামুন: যা করছেন তা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন। হাঁটাচলা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা বা কোনো অসমাপ্ত কাজ শেষ করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকুন।
সহায়তা চান ও বিশ্রাম নিন: অবিলম্বে আশপাশের মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা চান। শান্ত হয়ে পিঠের পেছনে সাপোর্ট রেখে কিছুটা সোজা হয়ে বসুন এবং হাঁটু ভাঁজ করে রাখুন। শরীরের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন। একা থাকলে বাইরের দরজার লক খুলে রাখুন।
অ্যাসপিরিন গ্রহণ: রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা বা অ্যালার্জি না থাকলে এবং চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে, এনএইচএস (NHS) ও ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের পরামর্শ অনুযায়ী ৩০০ মিলিগ্রামের (বা ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম) একটি অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট চিবিয়ে খেয়ে নিতে পারেন। তবে এটি জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
কখনোই নিজে গাড়ি চালাবেন না: সমস্যা নিজে থেকে ঠিক হয়ে যাবে- এই আশায় বসে থাকা কিংবা নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার মারাত্মক ভুল করবেন না। অ্যাম্বুলেন্সে থাকা প্যারামেডিকরা পথেই চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।
কখনোই যা করবেন না
ব্যথা নিজে থেকে কমে যাবে- এই আশায় অপেক্ষা করবেন না, নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না, শুয়ে পড়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করবেন না, অ্যাসপিরিনের সঙ্গে সামান্য পানি ছাড়া অন্য কিছু খাবেন বা পান করবেন না। গ্যাসের সমস্যা দূর করার ঘরোয়া উপায়, গরম পানীয়, মালিশ বা তথাকথিত ‘কাফ সিপিআর’-এর ওপর নির্ভর করবেন না। ১৬ বছরের কম বয়সী কাউকে কখনোই অ্যাসপিরিন দেবেন না এবং অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধ নিজে ব্যবহার করবেন না।
ব্যক্তি যদি কোনো সাড়া না দেন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেন (কষ্ট করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা বা গ্যাসপিংকে স্বাভাবিক গণ্য করা যাবে না), তবে বুঝতে হবে এটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। এ ক্ষেত্রে দ্রুত সাহায্যের জন্য ডেকে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করতে হবে। বুকের ঠিক মাঝখানে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ থেকে ১০২ বার জোরে ও দ্রুত চাপ দিতে হবে। কাছাকাছি অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর বা এইডি থাকলে তা এনে নির্দেশাবলী অনুসরণ করতে হবে এবং সাহায্য না পৌঁছানো পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।
রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে বাধা সৃষ্টি করলে সেই রক্তনালীর পরবর্তী অংশের হৃদপেশিগুলো মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই নষ্ট হতে শুরু করে। হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছানোর পর ইসিজি ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা যেমন, রক্ত জমাট বাঁধা রোধকারী ওষুধ বা স্টেন্ট বসিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা গেলে হার্ট ফেইলিওর এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।