সুস্থ থাকতে বেশি পানি পান করে কোনো বিপদ ডেকে আনছেন না তো?

শরীর সুস্থ রাখতে পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্ত সঞ্চালন, হজম, পুষ্টি পরিবহন এবং কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রমে পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পান করাও সমানভাবে বিপদের কারণ হতে পারে।

অনেকেরই ধারণা, প্রতিদিন নির্দিষ্ট আট গ্লাস পানি পান করলেই শরীরের পানির চাহিদা পূরণ হয়। বাস্তবে কিন্তু সবার পানির প্রয়োজন এক রকম নয়। বয়স, ওজন, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পানির চাহিদা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে।

বয়স ও ওজনভেদে পানির পরিমাণ

শরীরের পানির চাহিদা মূলত বয়স এবং ওজনের ওপর নির্ভর করে:

শিশু: শিশুদের শরীরে পানির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে এবং তাদের দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুদের পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

কিশোর-কিশোরী: এই বয়সে শারীরিক বৃদ্ধি দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড বেশি থাকায় তাদের পানির চাহিদাও বাড়ে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ওজনভিত্তিক হিসাব: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ওজনভিত্তিক একটি জনপ্রিয় নিয়ম হলো - প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৩০ থেকে ৩৫ মিলিলিটার পানি পান করা প্রয়োজন। যেমন -  ৬০ কেজি ওজনের একজন মানুষের প্রতিদিন ১.৮ থেকে ২.১ লিটার পানি পান করা উচিত।

বয়স্ক ব্যক্তি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই তৃষ্ণা অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাঁরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন, যা পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষ অবস্থায় পানির চাহিদা

শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বদলে যায়:

গর্ভাবস্থায়: গর্ভবতী নারীদের প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩০০ মিলিলিটার পানি প্রয়োজন।

দুগ্ধদানকালে: মায়েদের প্রতিদিন অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ১০০০ মিলিলিটার পানি পান করতে হয়।

জ্বর হলে: শরীরের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পানির চাহিদা ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেড়ে যায়।

ডায়রিয়া বা বমি হলে: শরীর থেকে প্রচুর তরল বের হয়ে যায়। এ সময় অতিরিক্ত তরল ও ওরস্যালাইন গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কিডনিজনিত রোগ: কিডনি বা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কতটুকু পানি পান করা উচিত, তা অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

অতিরিক্ত পানি পান করলে কী ক্ষতি হতে পারে?

প্রয়োজনের তুলনায় অল্প সময়ে অনেক বেশি পানি পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে হাইপোন্যাট্রিমিয়া (Hyponatremia) বলা হয়। অতিরিক্ত পানি গ্রহণের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তাকে ওয়াটার ইনটক্সিকেশন (Water Intoxication) বলে।

সোডিয়াম শরীরের কোষের ভেতরে ও বাইরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে গেলে পানি কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং কোষ ফুলে ওঠে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষ ফুলে গেলে তা গুরুতর জটিলতা তৈরি করে।

শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে গেলে প্রথম দিকে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন -

বমি বমি ভাব ও মাথাব্যথা, পেট ফাঁপা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিভ্রান্তি বা মানসিক অস্বস্তি, বমি ও পেশিতে খিঁচুনি, কথা বলতে অসুবিধা হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

স্ট্যাটপার্লসের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা বা হাইপোন্যাট্রিমিয়ার সমস্যায় ভুগে থাকেন। যদিও অতিরিক্ত পানি পানের কারণে জীবনহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বিরল, তবুও এমন গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

কিডনি শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়। একটি সুস্থ কিডনি সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১ লিটার তরল পদার্থ নিষ্কাশন করতে পারে। এর চেয়ে বেশি পানি খুব অল্প সময়ে পান করলে কিডনি সেই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় এবং শরীরে পানি জমে হাইপোন্যাট্রিমিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার কারণে ওজনও সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।

শেষ কথা

পানি পানের ক্ষেত্রে ‘কম নয়, আবার অতিরিক্তও নয়’  - এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো সুস্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি। প্রতিদিন আট গ্লাসের গতানুগতিক ধারণায় আটকে না থেকে নিজের বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থা বুঝে পরিমিত পানি পান করুন এবং সুস্থ থাকুন।