ইতিহাস থেকে জানা যায় ইতালির ফ্যাসিবাদী দৈত্যাকার সত্তার কেন্দ্রে ছিল সংস্কৃতি। মনে রাখা প্রয়োজন শিল্প সাহিত্য, চিত্রকলার নানান মাধ্যমসহ মঞ্চ ও অভিনয়কে সেই ফ্যাসিবাদ রাষ্টের আদর্শের কেন্দ্রে স্হাপন করেছিল। তারা সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে এমনভাবে একীভূত করেছিল যে একটিকে অন্যটির থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। গত ১৫ বছর কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে, দেশের গণত্রান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ যে অপরাধ করেছে তা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের মনে রাখা উচিত—এর পেছনেও আংশিকভাবে দায়ী রাষ্ট্রের সংস্কৃতি, এর চর্চার ধরন এবং এর সাথে রাজনীতির সম্পর্কের অমীমাংসিত প্রশ্ন।
জুলাই ২০২৪-এ ছাত্রদের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ পতনের পরও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ এখনো রয়ে গেছে —যার চেহারা হয়তো সবার কাছে দৃশ্যমান নয় কিন্তু এর একটা সূক্ষ্ম রূপ অনেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। নানান সুযোগে, আয়োজনে এখনো সাংস্কৃতিক অভিজাতদের একটা বড় অংশ স্বৈরশাসনের পক্ষে বক্তব্য সাজিয়ে চলেছেন। রাষ্ট্র-সমর্থিত সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের মধ্যে থেকে কাজ করতে করতে তারাও হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাসিবাদী শক্তির যোগানদাতা।
সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রীয় বৈধতার রাজনৈতিক হাতিয়ার। আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারের একমাত্র অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সংস্কৃতি জগতের একটি অংশকে নিজেদের পক্ষ্যে বয়ান তৈরিতে কাজে লাগাতে থাকে। সঙ্গীতশিল্পী, নাট্যকর্মী, কবি ও বুদ্ধিজীবীর একটি বড় অংশ , যারা দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন, তাদের নানান নামে ডেকে, নানান উপাধি দিয়ে তাদের মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা—পুরস্কার, প্রতিষ্ঠান, মঞ্চ ও টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের প্রচার—শুধু তাঁদের জন্যই বরাদ্দ ছিল, যারা শাসক দলের বয়ানের সঙ্গে একমত। ফলে শিল্প আর স্বাধীন থাকতে পারে নি। আনুগত্য পুরস্কৃত হতে থাকলো, ভিন্নমত দমন করা শুরু হলো। এমন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতিতেই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের জন্ম হলো —শিল্প, সাহিত্য ও নাট্যচর্চাকে ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার যন্ত্রে পরিণত করা হলো ।
ভারতীয় বয়ান ও “সাংস্কৃতিক বিনিময়”
গোড়া থেকেই ভারত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চেয়েছেন। সাংস্কৃতিক বিনিময়-এর নামে ভারতীয় বয়ান—চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, নাটক, টেলিভিশন—বিশেষ সুবিধাজনক প্ল্যাটফর্ম পায়, যার ফলে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা ও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা অনুৎসাহিত হতে থাকলো, শিল্পীদের একটা অংশ ভুল পথে হাটতে শুরু করলেন। এমন প্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে যখনই আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসেছে। প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন যে —সরকার নির্দেশ দেবে আর সংস্কৃতি জি হুজুর বলবে, স্যালুট জানাবে। ফ্যাসিস্ট শাসন পুরো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে গভীরভাবে পুনর্গঠন করেছিল—তার প্রতিষ্ঠান, তার ক্ষেত্র, তার অর্থনীতি, তার মূল্যবোধ সবকিছুকে। অন্যকথায়, ফ্যাসিবাদ কেবল নতুন ফ্যাসিস্ট শিল্পরীতি সৃষ্টি করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং সংস্কৃতিকে একেবারে নতুনভাবে একটি ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছিল। রাষ্ট্রীয় বড় বড় অনুষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনী ব্যাবসা, খেলাধুলাসহ নানান ব্যাবসা আওয়ামী ঘরানার শিল্পী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকলো। বাংলাদেশ ভারতীয় চ্যানেলের উন্মুক্ত বাজার হয়ে উঠলো আর পক্ষান্তরে বাংলাদেশী চ্যানেলগুলো ভারতে বাজারের অনুমতি পেলো না। ভারতীয় গায়ক, অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্বদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো শুরু হলো। অনেক দেশীয় শিল্পীদের উপেক্ষা করে এই সব আয়োজন চলতে থাকলো। স্যাটেলাইট চ্যানেল ও যৌথ সাংস্কৃতিক আয়োজন বারবার এই ধারণাকে জোরদার করে চলেছিল যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ভারতের প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অভিজাতরা—যারা সরাসরি ভারতীয় আমন্ত্রণ, সফর ও যৌথ প্রযোজনার সুবিধাভোগী—এই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবকে জোরদার করার মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকেও শক্তিশালী করে চলেছিলেন। এরা সফলভাবে নিজেদের দিল্লির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে “সাংস্কৃতিক বিনিময়” হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণের আরেকটি বড় হাতিয়ার। আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বরকে দমন করতে, আর ভারতীয় বয়ানকে সাংস্কৃতিক পরিশীলনের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এই হাতিয়ারকে সুকৌশলে ব্যবহার করে চলেছিল বিগত ফ্যাসিস্ট শক্তি। যারা এমন পরনির্ভরতাকে অস্বীকার করলেন, তাদের “ভারতবিরোধী” বা এমনকি “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী” তকমা দেওয়া হলো।
২০০৯ সালের পর এ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ভারতীয় প্রভাব এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে যায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু পরিচিত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে সরকারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করলেন। অনেকেই ভারতীয় প্ল্যাটফর্ম ও স্বীকৃতির সুবিধা ভোগ করলেন, যা তাদের দ্বৈত আনুগত্যকে আরও দৃঢ় করলো। কনসার্ট, নাট্যোৎসব ও যৌথ প্রযোজনাগুলো এমন রূপ নিলো যেখানে আওয়ামীলীগ ও ভারতের প্রতি আনুগত্যকেই দেশপ্রেম হিসেবে প্রচার করা হতো। অন্যদিকে ভিন্নমতাবলম্বী শিল্পীরা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হতে থাকলেন, ভিন্নমতের, ভিন্নপথের কাজের সুযোগ ক্রমশই কমে যেতে শুরু হল। সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বিষয়টা এতটাই একচেটিয়া হয়ে পড়লো যে সৃজনশীলতা আনুগত্যের সমার্থক হয়ে উঠলো।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান
সকল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আনুগত্যকে ছুড়ে ফেলে ছাত্রনেতৃত্বাধীন জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান স্বৈরতন্ত্রের রাজনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিলো।ফ্যাসিবাদী শক্তির পরাজয়ে এইসব সাংস্কৃতিক অভিজাতদেরও পতন ঘটলো। যখন শাসকচক্র পতিত তখন এদের নৈতিক পতনও মানুষের কাছে স্পষ্ট হলো। নায়ক হয়ে উঠলেন খলনায়ক। তবে এদের কেউ কেউ নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্তের নতুন মুখোশ পরে—আবার পুরনো বয়ান প্রচার করতে শুরু করেছেন, দেশে বিদেশে। এর মধ্য দিয়ে তারা দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বাধীন সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাকে নস্যাৎ করতে চাইছে। এদের একটি বড় লক্ষ্য হলো জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ছিনিয়ে নেয়া, সেইসব তরুণদের কাছ থেকে যারা জুলাইতে মাতৃভূমিকে নিয়ে এক নতুন আকাঙক্ষায় এক নতুন স্বপ্ন দেখেছিল। যারা এক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যে জীবন বাজি রেখে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। যারা জীবন দিয়ে মাতৃভূমিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছিল।
সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ কি করে?
সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক দমনপুড়নের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটি স্মৃতিকে বিকৃত করে। এটি মানুষকে বোঝাতে চায়—জুলাইয়ে যারা রাস্তায় ছিল ও প্রাণ দিয়েছে তারা বীর নয়, দেশপ্রেমী নয়, বরং তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। তারা বলতে চায় ভারত থেকে আমদানি করা বয়ানই আসল সত্য; আর আওয়ামীলীগ ও ভারতের প্রতি আনুগত্যই দেশপ্রেমের বড়ো কাজ। এই সমস্যার শেকড় অনেক গভীরে প্রসারিত। যদি জুলাই অভ্যুত্থান তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চায়, তবে এর মূলোৎপাটন করতে হবে, এই চক্র ভাঙতে হবে। শিল্প ও সংস্কৃতি জনগণের, কোন দেশীয় বা বিদেশি ক্ষমতার বা শক্তির নয়।
জুলাই ২০২৪-এর তরুণরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করা সম্ভব। কিন্তু আরও কঠিন লড়াই রয়ে গেছে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে—যে দুষ্ট শক্তি শিল্প, সঙ্গীত, নাটক ও আমদানি করা বয়ানের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্র আর ফ্যাসিস্ট শক্তিকে বৈধতা দেয়। কেবল তখনই বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারবে, যখন সংস্কৃতির কেন্ত্র থেকে সুযোগসন্ধানীদের দূরে রাখা যাবে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে নির্ভরতামুক্ত করা যাবে। আমরা জানি কর্তৃত্ববাদ সবসমই নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে সাংস্কৃতিক প্রদর্শনের ভেতর দিয়ে। ইতিহাসের প্রদর্শনরীতি পুনর্বিবেচনা না করলে আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই সেই একই গোষ্ঠীর সহযাত্রী হয়ে উঠবো যারা বিগত সময়ে সহিংস শাসনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ফ্যাসিস্ট ইতালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আমাদের শেখায়—কোনো প্রদর্শনী কেবল শিল্প নয়, বরং রাজনৈতিকও। আমরা যখন দেখাই, তখন আসলে আমরা বেছে নিচ্ছি—কি দেখা যাবে, আর কি অদৃশ্য থাকবে। এই নির্বাচনই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখবে।