জীবন বদলে গেছে, কিন্তু বেতন কাঠামো আটকে আছেঃ কেন নবম পে স্কেল বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

কোনো এক ভ্যাপসা সকালে সরকারি হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুণী মা—কোলের শিশুটি জ্বরে পুড়ছে। মাথার ওপরের পাখাটা কাঁপছে, যেন চেষ্টা করেই ক্লান্ত। লাইনের নড়াচড়া নেই। পাশ দিয়ে হেঁটে গেল এক ওয়ার্ড বয়—চোখে ঘুম, পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল। ভেতরে কোথাও একজন নার্স একাই সামলাচ্ছে অনেক বেশি রোগী, অনেক কম সময়। বাইরে শহর ছুটে চলে—রিকশা, বাস, স্বপ্ন। ভেতরে সবকিছু যেন থমকে আছে। আমরা একে “জনসেবা” বলি খুব সহজে। কিন্তু কোটি মানুষের কাছে এটা প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা: ওষুধ মিলবে তো? ফাইল নড়বে তো? শিক্ষক আসবে তো? পুলিশ সাহায্য করবে তো?  কখনো কি আমরা চিন্তা করেছি প্রায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন কেন হয়? যখন এসবের উত্তর নির্ভর করে পরিচিতি কিংবা গোপনে গুঁজে দেওয়া টাকার ওপর—তখন সমাজ শুধু অর্থ হারায় না, হারায় মর্যাদা।  একটি রাষ্ট্রের কাজ তার নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুখ-শান্তি সাধ্যমতো নিশ্চিত করা। সে কারণেই সরকার গঠন করা হয়। সে কারণেই নাগরিকদের বিভিন্ন সেবাদানের ব্যবস্থা করা হয়।

এই যুগে সততার জীবিকাতে একটু কমই পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। কিন্তু, যারা সৎভাবে থাকতে চায় তারা কমেই খুশি থাকে। কারণ সৎ থাকা ও সেবা দেয়ার নিজস্ব একটা আনন্দ আছে। যেটা টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।  আর অসততার জন্য প্রয়োজন অনেক টাকা। কারণ সেখানে টাকা ছাড়া আর কোন আনন্দ থাকে না। তারপরও জীবিকার বিনিময়ে বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান নিয়ে জীবনের নূন্যতম প্রয়োজনটুকু পূরণ করতে পারলেই একজন কর্মজীবী সর্বোচ্চ আনন্দ পায়।  সরকারি চাকরি করা মানুষগুলো আমদের বাইরের কেউ নয়, তারা আমাদেরই আত্মীয়, বন্ধু, বা প্রতিবেশী। তাদেরও জীবন আছে, আশা আকাঙ্ক্ষা আছে; আছে পরিবার ও তাদেরকে ভালো রাখার প্রয়াস।

একটি সমাজে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন পেশা থাকে তার মেধা, যোগ্যতা, ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায়। সবাই যেমন একই রকম মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পন্ন হয় না, তেমন সবার সামগ্রিক পরিস্থিতিও এক হয় না। এ কারণেই বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে শিক্ষিত হয় ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়। এর অর্থ অবশ্য এটা নয় যে, মানুষ হিসেবে কেউ কারও চেয়ে কম বা বেশি সম্মানিত হবেন।  মানুষ সাধারণত, পেশা হিসেবে পছন্দ করে যেসব পেশায় সুযোগ, সুবিধা বেশি সেগুলোকে। আর সকল প্রতিষ্ঠান চায় তার প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী থাকুক। তাহলে , সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। একইভাবে, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যাচ্ছে কিনা তার উপরে।

একটি মুক্ত-অর্থনীতি ভিত্তিক সমাজে সবাই স্বাধীন তার পেশা ও অন্যান্য পছন্দের ব্যাপারে। তাই, অধিক মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জরুরী কাজগুলোতে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এ কারণেই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের অন্যান্য পেশার তুলনায় বেশি সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। কারণ, তারাই রাষ্ট্রকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু,  কোন পেশার সাথে অন্য পেশার তুলনা হয় না। একজন অভিজ্ঞ কৃষক যেমন একটি জাতির জন্য জরুরী, তেমনি একজন শিক্ষকও জাতি গঠনের জন্য জরুরী। আমি অর্থনীতিবিদ নই, তবে বাস্তবতা দেখি এবং বুঝার চেষ্টা করি। সেই দেখা ও বুঝার আলোকে কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই।

পাশের দেশগুলো দেখলেই বোঝা যায় বাংলাদেশের জাতীয় পে স্কেল অনেক পুরোনো। বাংলাদেশে সর্বশেষ আপডেট হয়েছিল ২০১৫ সালে, যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা (প্রায় ৬৭.৫ ডলার)। অথচ ভারতে ২০১৬ সালে ন্যূনতম বেতন দাঁড়ায় ১৮,০০০ রুপি (১৯৯.৪ ডলার), পাকিস্তানে ২০২২ সালে ১৩,৫৫০ রুপি (৪৮.১ ডলার), শ্রীলঙ্কায় ২০২৫ সালে ৪০,০০০ রুপি (১২৯.৩ ডলার), ফিলিপাইনে ২০২৬ সালে ১৪,৬৩৪ পেসো (২৪৬.৯ ডলার) এবং ভিয়েতনামে ২০২৪ সালে ২,৩৪০,০০০ ডং (৮৯ ডলার)। 

বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরা—এমপি, সচিব, পুলিশ সুপার, সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী—যাঁরা আইন বানান, রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার সিদ্ধান্তে সই করেন, জননিরাপত্তা সামলান, মানুষের জীবন বাঁচান, অবকাঠামো দাঁড় করান, আর জ্ঞান তৈরি করেন—তাঁদের বৈধ আয়ে যদি একটি “মর্যাদাপূর্ণ, মানসম্মত” জীবনযাপন সম্ভব না হয়, তাহলে দেশ নীরবে নীরবে প্রলোভনের বাজার তৈরি করে। এটা “খারাপ মানুষ” বনাম “ভালো মানুষ”—এমন কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটা বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুর চাপ: বাড়িভাড়া বাড়ে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ থামে না, অসুস্থতা হঠাৎ এসে সঞ্চয় গিলে খায়, আর সামাজিক মর্যাদার জায়গায় এসে মানুষকে বারবার ছোট করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা যায়, যখন দুর্নীতির প্রত্যাশিত লাভ বেতনের চেয়ে বেশি হয়, তখন ঝুঁকি বাড়ে। সত্যিটা বলি: অধিকাংশ দুর্নীতি সিনেমার মতো বড় নয়। এটা ছোট, নিত্যদিনের, প্রায় “স্বাভাবিক” হয়ে যাওয়া—ফাইল তিন দিনে হওয়ার কথা, তিন মাস লাগে—যদি না “স্পিড মানি” থাকে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা রাস্তা-বিদ্যুৎ দেখে, ঠিকই। কিন্তু তারা আরও দেখে—আইন-কানুন কি স্বচ্ছ? অনুমোদন প্রক্রিয়া কি পরিষ্কার? নাকি “ট্র্যাপ”?

এই কারণেই বাংলাদেশের নবম সরকারি বেতন কাঠামো (৯ম পে স্কেল)  শুধু কাগুজে একটা সংশোধনী নয়। এটা নৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত জরুরি। নবম পে স্কেল নিয়ে চলমান কমিশনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ৯ শতাংশের ওপরেই রয়েছে। ফলে যে বেতন একসময় পরিবার চালাত, আজ তা ভাড়া, স্কুল, চিকিৎসা, যাতায়াত—সব সামলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। এদিকে সরকার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে স্কেলের জন্য পে কমিশন গঠন করেছে, রিপোর্ট পাওয়ার পর ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথাও আলোচনায় এসেছে—এবং লক্ষ্য রাখা হচ্ছে যেন মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত বেতন ২০১৫ সালের বাস্তব মূল্যমানের নিচে না নামে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই বুঝছে চাপটা সত্যি। এখন প্রশ্ন—এটাকে আমরা টেকনিক্যাল ফাইল হিসেবে রাখব, নাকি জাতীয় অগ্রাধিকার বানাব?

এটা বোঝার জন্য পাশের দেশগুলোকে দেখলেই চলে। একই ধরনের অর্থনীতি ও জনতাত্ত্বিক বাস্তবতার তুলনায় বাংলাদেশের “শেষ বড় আপডেট” তুলনামূলকভাবে পুরোনো—বাংলাদেশে জাতীয় পে স্কেল-২০১৫ কার্যকর হয় ১ জুলাই ২০১৫, যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা, আনুমানিক ডলারে প্রায় ৬৭.৫। ভারতে ৭ম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন ১ জানুয়ারি ২০১৬ থেকে কার্যকর হয়ে ন্যূনতম বেতন ১৮,০০০ রুপি, আনুমানিক ১৯৯.৪ ডলার। পাকিস্তানে Revised Pay Scale ২০২২ (BPS) ১ জুলাই ২০২২ থেকে, ন্যূনতম ১৩,৫৫০ রুপি, আনুমানিক ৪৮.১ ডলার—যেখানে ভাতা/রিলিফ আলাদা করে যোগ হয়। শ্রীলঙ্কায় পাবলিক সার্ভিস বেতন সংশোধনের সিদ্ধান্ত (Circular 10/2025) ১ জানুয়ারি ২০২৫, যেখানে স্কেল শুরু হয় ৪০,০০০ রুপি থেকে, আনুমানিক ১২৯.৩ ডলার এবং পরিশোধ ধাপে ধাপে। ফিলিপাইনে Executive Order 64-এর বেতন সূচির তৃতীয় ট্রাঞ্চ কার্যকর ১ জানুয়ারি ২০২৬; Salary Grade 1 হলো ১৪,৬৩৪ পেসো, আনুমানিক ২৪৬.৯ ডলার। ভিয়েতনামে Decree 73/2024 অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৪ থেকে বেস/স্ট্যাচুটরি পে রেট ২,৩৪০,০০০ ডং, আনুমানিক ৮৯ ডলার—এটি বেস রেট, যার গুণিতকে টেবিলভিত্তিক বেতন দাঁড়ায়। এই তুলনাই বলে দেয়—অন্যরা নিয়মিত আপডেট করছে, আর আমরা একই কাঠামো টেনে নিচ্ছি যেন রাষ্ট্রের সেবাদাতাদের বাস্তব জীবনযাত্রা থেমে আছে। বাংলাদেশকে কারও মডেল অন্ধভাবে কপি করতে হবে না; কিন্তু নীতিটা মানতেই হবে—আপনি যদি বিশ্বমানের সেবা চান এবং টেবিলের নিচে লেনদেন কমাতে চান, তাহলে পেশাদার সরকারি জীবনকে এমন এক ত্যাগের নাম বানিয়ে রাখা যাবে না, যা শুধু ধনীদের পক্ষে বহন করা সম্ভব।

যাঁরা বলেন “এটা তো খরচ”—তাঁরা রাষ্ট্রকে শুধু হিসাবের খাতায় দেখেন। অথচ আধুনিক বেতন কাঠামো রাষ্ট্রের “পাইপলাইন”; পাইপলাইন ভেঙে গেলে ভোগে সবাই—বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ, যাদের কাছে “প্রাইভেট” বিকল্প সবসময় থাকে না। সঠিকভাবে করা পে স্কেল একদিকে সৎ কাজকে “শাস্তি” হওয়া থেকে বাঁচায়—কারণ বেতন জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে না মিললে রাষ্ট্র নীরবে প্রতিভা হারায়; অন্যদিকে বেতন মানসিক স্থিতি দেয় বলে সেবার মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি আস্থা ফিরিয়ে আনে—যা অর্থনীতির অদৃশ্য মুদ্রা।  

পে স্কেল নিয়ে আলোচনা অনেক সময় সংখ্যা হয়ে যায়—কত শতাংশ বাড়বে, কত গ্রেড, কত ভাতা। কিন্তু সেই নার্সের কাছে নবম পে স্কেল মানে অন্য জিনিস: “আমি কি রোগী দেখার সময় মাথার ভেতর বাজারের লিস্টটা থামাতে পারব?” একজন শিক্ষক ভাবেন—“আমি কি পরীক্ষার খাতা দেখার সময় টিউশনের চিন্তা ছাড়াই মন দিতে পারব?” একজন সৎ পুলিশ ভাবেন—“আমি কি মাস শেষে কারও কাছে হাত পাততে বাধ্য হব না?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সেবা বদলাবে। সেবা বদলালে মানুষ রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে। বিশ্বাস বাড়লে কর দেওয়ার মানসিকতা বাড়ে, নিয়ম মানার সংস্কৃতি বাড়ে, বিনিয়োগের আস্থা বাড়ে—এভাবেই অর্থনীতি ভেতর থেকে শক্ত হয়। পে স্কেল দরকার উন্নয়নের জন্য।  উন্নয়ন মানে শুধু ভবন নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের মর্যাদা। মর্যাদা ছাড়া রাষ্ট্র থাকে, কিন্তু দেশ থাকে না।

একটা ন্যায্য ও মানসম্মত পে স্কেল তিনভাবে কাজ করে- প্রথমত, অসহায়ত্ব কমায়- নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা বাস্তব জীবনের খরচ সামলাতে পারলে, “বাঁচার জন্য” ছোট দুর্নীতির চাপ কমে। দ্বিতীয়ত, শুদ্ধাচার বাস্তবায়নযোগ্য হয়-বেতন বাড়লে রাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে পারে: “তোমাকে সেবা দেওয়ার জন্য বেতন দিচ্ছি—এখন মানদণ্ড থাকবে, এবং দুর্নীতি ধরা পড়লে শাস্তি হবে।” ন্যায্য বেতন ছাড়া কড়াকড়ি অনেক সময় নিছক নিষ্ঠুরতা মনে হয়। তৃতীয়ত, সিস্টেম পরিষ্কার করে- নতুন পে স্কেল মানে গ্রেড পরিষ্কার করা, ভাতা যুক্তিসংগত করা, ডিজিটাল পে-রোল, ফাঁকফোকর বন্ধ করা—আর দুর্নীতি জন্মায় ঠিক এই ফাঁকফোকরেই। মানুষকেন্দ্রিক, উন্নয়নমুখী নবম পে স্কেলের লক্ষ্য হওয়া উচিত-মুদ্রাস্ফীতির বাস্তবতা, নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি, স্বচ্ছ ও সরল ভাতা কাঠামো, ডিজিটাল পে-রোল ও অডিট ট্রেইল, পারফরম্যান্স ও সেবা মানদণ্ড, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ও বাস্তব শাস্তি। বেতন বাড়িয়ে জবাবদিহি না বাড়ালে এটা ব্যর্থ হতে পারে; আবার, জবাবদিহি বাড়িয়ে বেতন না বাড়ালে নিষ্ঠুরতা হয়ে যায়। তাই, বেতন যুগোপযোগী করে জবাবদিহিতাও উন্নত করতে হবে।

ক্লান্ত শরীর আর অপমানিত মর্যাদার ওপর দাঁড়িয়ে “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়া যায় না। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পুলিশ, সচিব বা এমপি—যদি ন্যায্য বেতন ও সম্মান না পান, তবে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সেবার মান ক্ষয়ে যায়। বেতন কাঠামো বাস্তবসম্মত না রেখে শুধু নৈতিকতার বক্তৃতায় দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। সঠিক বেতন, নিয়ম ও নজরদারির সমন্বয়েই সেবা ও সিস্টেম বদলাতে পারে। নবম পে স্কেল শুধু কর্মচারীদের দাবি নয়—এটা সেবাদাতাদের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে এখনই বাস্তবায়ন জরুরি।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের যুক্তি শুধু “জনপ্রিয়তা” নয়—এটা রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে থেকে কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এবং নতুন নির্বাচিত সরকার যাতে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ পায়, সেই ভিত্তিটা এখনই তৈরি করা জরুরি। এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন আলোচনায় গ্রহণযোগ্য মুখ—ফলে বড় ধরনের রাষ্ট্র সংস্কারে দেশি-বিদেশি আস্থা তৈরির সক্ষমতা রাখেন। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) গভর্নর হিসেবে আর্থিক খাত ও রাজস্ব-ব্যয়ের বাস্তবতা বোঝেন—পে স্কেলের মতো সংস্কারকে বাজেট শৃঙ্খলা ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির সাথে মেলাতে তাঁর অভিজ্ঞতা কার্যকর হতে পারে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ—নীতির “লং টার্ম” প্রভাব, মানবসম্পদ ও উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মতো মানুষের উপস্থিতি পে স্কেলকে কেবল বেতন বৃদ্ধি না রেখে রাষ্ট্র সক্ষমতা বৃদ্ধির নীতিতে রূপ দিতে পারে। আর আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল একজন আইন শিক্ষক/বিশ্লেষক হিসেবে জবাবদিহি, শুদ্ধাচার, অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো প্রতিষ্ঠানগত বিষয়কে বেতন সংস্কারের সাথে বাঁধতে সাহায্য করতে পারেন—কারণ দুর্নীতি দমনে শুধু টাকা নয়, নিয়মও লাগে। এই সমন্বয়টাই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে: ন্যায্য বেতন, শক্ত নিয়ম ও ডিজিটাল স্বচ্ছতা।

শেষ কথা, ক্লান্ত শরীর আর অপমানিত মর্যাদার ওপর দাঁড়িয়ে “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়া যায় না। একজন স্কুলশিক্ষক যদি বাজার খরচ তুলতে রাতভর টিউশনি করেন, পরদিন ক্লাসে কী থাকে? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি গবেষণার বই কেনা, কনফারেন্সে যাওয়া, ছাত্রদের থিসিস দেখানো—সবকিছুর খরচ নিজের পকেট থেকে টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, জ্ঞান তৈরির সেই আগুনটা কত দিন জ্বলে? একজন হাসপাতালকর্মী যদি ভাড়াই দিতে না পারেন, দশ ঘণ্টার ডিউটির শেষে করুণা কোথায় থাকে? একজন সরকারি চিকিৎসক যদি একদিকে রোগীর চাপ, অন্যদিকে পরিবারের ন্যূনতম খরচ—এই দুই চাপে প্রতিদিন ভেঙে পড়েন, তখন মানবিকতা টিকে থাকে কীভাবে? একজন প্রকৌশলী যদি রাত জেগে ব্রিজের নকশা, সড়কের মান, ভবনের নিরাপত্তা—এসবের দায় কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরে সন্তানের স্কুল ফি নিয়ে হিসাব করতে বসেন, তখন দায়িত্ববোধকে বাঁচিয়ে রাখতে কতটা লড়াই লাগে? একজন পুলিশ সুপার যদি জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক চাপ, মিছিল-মিটিং, মামলা—সবকিছুর ভার বইতে বইতে দেখেন তার বৈধ আয়ে পরিবারকে সম্মান নিয়ে রাখা কঠিন, তখন প্রলোভন আর ‘প্রয়োজন’ একাকার হয়ে যায়। একজন সচিব যদি হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সই করেন, নীতির সিদ্ধান্ত নেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চাপে থাকেন, অথচ তাঁর অফিসের চারপাশে সুবিধাবাদী চক্র দিনের পর দিন ফিসফাস করে—“সবাই তো নেয়”—তখন একজন সৎ মানুষের মাথার ভেতরেও যুদ্ধ শুরু হয়। আর একজন এমপি যদি এলাকার হাজারো মানুষের চিকিৎসা, চাকরি, শিক্ষা, সংকট—সবকিছুর দরজা হিসেবে বিবেচিত হন, কিন্তু তাঁর কাজের স্বচ্ছ ব্যয় কাঠামো ও সম্মানজনক পারিশ্রমিক বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে, তখন রাজনীতিও ধীরে ধীরে সেবার বদলে লেনদেনের ভাষা শিখে ফেলে। একজন কর্মচারীর বেতন যদি মুদ্রাস্ফীতিতে ভেঙে পড়ে, তখন কারও জমির খতিয়ান, পেনশন, প্রতিবন্ধী ভাতা—এসব নিয়ে ফাইল কীভাবে এগোয়? এটা সরকারি ব্যয়ের “অঙ্ক” নয়। এটা মানুষের অধিকার পাওয়ার পথ—অপমান ছাড়া, ভয় ছাড়া—এটা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। বেতন কাঠামোকে বাস্তবসম্মত না রেখে শুধু নৈতিকতার বক্তৃতা দিয়ে দুর্নীতি কমানো যায় না। বরং সঠিক বেতন, সঠিক নিয়ম এবং সঠিক নজরদারি—এই তিনটির সমন্বয়েই দুর্নীতি ও সেবা—দুইয়েরই মান বদলাতে শুরু করে। সঠিকভাবে প্রণীত ও বাস্তবায়িত নবম পে স্কেল হতে পারে এক মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত: সেবার মান বাড়বে, সিস্টেম পরিষ্কার হবে, ক্ষুদ্র দুর্নীতির চাপ কমবে—এবং রাষ্ট্রকে মনে হবে জনগণের, শোষকের নয়। নবম পে স্কেলকে আমরা যদি “কর্মচারীদের দাবি” হিসেবে দেখি, তাহলে অর্ধেক সত্য দেখব। পূর্ণ সত্যটা হলো—সেবাদাতাদের মর্যাদার প্রশ্ন, আর সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার। রাষ্ট্রকে যারা মানুষের দোরগোড়ায় এনে দেয়, তাদের জীবন যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে মানুষের জীবনও অনিশ্চিত থাকে। আজ নবম পে স্কেল মানে শুধু বেশি বেতন নয়—এটা মানুষের চোখে রাষ্ট্রকে আবার বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রতিজ্ঞা। আলোচনা যথেষ্ট হয়েছে, হাসপাতালের সেই করিডোরের লাইন এখনও অপেক্ষা করছে…

মোঃ নিয়াজ আলমগীর, সহকারি অধ্যাপক
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।