একজন বাবা যেভাবে আদর্শে পরিণত হন

প্রতি বছর বাবা দিবস এলে আমরা বাবাদের ত্যাগ, ভালোবাসা ও অবদানের কথা স্মরণ করি। একজন বাবা তার পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে জীবনের একটি বড় অংশ উৎসর্গ করেন। নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা আরাম-আয়েশের কথা না ভেবে তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অনেক সময় তিনি নিজের চাওয়া-পাওয়াকেও বিসর্জন দেন। তাই একজন বাবার প্রতি সন্তানের কৃতজ্ঞতা ও সম্মান থাকা স্বাভাবিক এবং আবশ্যিক। 

তবে বাবা দিবস উপলক্ষে আমরা সাধারণত একটি বিষয় খুব কমই আলোচনা করি। আমরা প্রায়ই বলি, একজন বাবার দায়িত্ব কী, তিনি কেমন হবেন, সন্তানের জন্য কী করবেন। কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি; সন্তানের কিংবা পরিবারের কি কোনো দায়িত্ব নেই? একজন বাবা কি একাই আদর্শ বাবা হয়ে ওঠেন, নাকি সেই যাত্রায় পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ভূমিকা থাকে? আমার বিশ্বাস, একজন আদর্শ বাবা তৈরি হওয়ার পেছনে যেমন তার নিজের ত্যাগ ও নৈতিকতা কাজ করে, তেমনি কাজ করে তার সন্তান, জীবনসঙ্গী এবং পুরো পরিবারের মূল্যবোধ।

বাস্তবতা হলো, একজন বাবা অনেক সময় সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে ভুল পথেও পা বাড়াতে পারেন। সন্তান যা চায়, তা যেকোনো মূল্যে এনে দেওয়ার প্রবণতা কখনো কখনো একজন মানুষকে নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে। যদি কোনো বাবা সন্তানের সকল চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে দুর্নীতি, অসততা বা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে আমরা কি তাকে একজন আদর্শ বাবা বলতে পারি? নিশ্চয়ই না। আবার যে সন্তান চাওয়ামাত্র সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে, সে হয়তো তার বাবাকে একজন ‘সুপারম্যান’ হিসেবে দেখছে; কিন্তু সে কি কখনো ভাবছে, তার সেই প্রাপ্তির পেছনে কী মূল্য দিতে হচ্ছে? একজন সন্তানেরও দায়িত্ব আছে তার বাবাকে এমন কোনো চাপের মধ্যে না ফেলা, যা তাকে নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য করে।

সন্তানের দায়িত্ব বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দায়িত্বের অস্তিত্ব কখনোই অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে কৈশোর বা টিনএজ এমন একটি সময়, যখন সন্তান নিজের পরিচয়, স্বপ্ন ও স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এই বয়সে অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়ে বা তাদের পরামর্শকে গুরুত্বহীন মনে করে। অথচ এই সময়েই একজন সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা। একজন কিশোর বা কিশোরীর দায়িত্ব হলো এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, এমন বন্ধু নির্বাচন করা এবং এমন জীবনচর্চা গড়ে তোলা, যা তার বাবাকে গর্বিত করে, উদ্বিগ্ন নয়। কারণ একজন বাবার সবচেয়ে বড় স্বস্তি সন্তানের সাফল্যে নয়, বরং সন্তানের সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠায়।

একইভাবে সন্তানের মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একজন আদর্শ বাবা কখনো একা তৈরি হন না। একটি পরিবারের মূল্যবোধ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং নৈতিক অবস্থান একজন বাবাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। একজন স্ত্রী যদি স্বামীর সততা ও নীতিবোধকে সমর্থন করেন এবং সন্তানদের মধ্যেও সেই মূল্যবোধ গড়ে তোলেন, তাহলে একজন বাবা অনেক বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে সৎ পথে চলতে পারেন। তাই একজন আদর্শ বাবার পেছনে যেমন তার নিজের ত্যাগ ও পরিশ্রম থাকে, তেমনি থাকে একজন সচেতন সন্তান এবং একজন দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গীর নীরব অবদান।

বাবা দিবস উপলক্ষে আমরা অনেকেই বাবাকে ফুল, শুভেচ্ছা কার্ড কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে সম্মান জানাই। এসব প্রকাশ অবশ্যই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু একজন সন্তানের পক্ষ থেকে বাবার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার সম্ভবত এগুলোর চেয়েও অনেক বড় কিছু। একজন বাবা প্রকৃত আনন্দ পান তখনই, যখন তিনি দেখেন তার সন্তান সৎ, দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং মানবিক একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে। সন্তানের ভালো ফলাফল, পেশাগত সাফল্য বা আর্থিক অর্জন বাবাকে আনন্দিত করে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গর্বের বিষয় হলো সন্তানের চরিত্র ও মূল্যবোধ। যে সন্তান সততার সঙ্গে জীবনযাপন করে, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে, সে-ই প্রকৃত অর্থে তার বাবার ত্যাগ ও পরিশ্রমকে সম্মান জানায়।

বাবা দিবস তাই শুধু বাবাদের সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি আমাদের নিজেদের দায়িত্ব নিয়েও ভাবার দিন। একজন বাবা পরিবারকে যা দেন, তার প্রতিদানে আমরা তাকে কী দিচ্ছি, এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শ সন্তান, আদর্শ মা এবং আদর্শ পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একজন আদর্শ বাবা গড়ে ওঠেন। তাই এই বাবা দিবসে শুধু প্রাপ্তির গল্প বলে আপনার বাবাকে ‘সুপারম্যান’ আখ্যা না দিয়ে, তার কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষাকে গুরুত্ব দিন।  বাবাকে ‘সুপারম্যান’ নয়, একজন ‘আইডিয়াল ম্যান’ হিসেবে দেখুন। কেননা, আমাদের সমাজে অলৌকিক ক্ষমতার সুপারম্যানের চেয়ে নৈতিকতা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ আদর্শ ‘কমন ম্যানের” প্রয়োজন বড্ড বেশি।"

মো. ইনজামুল হক
লেকচারার, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি