যেকোনো সমাজের বাতিঘর হলো সে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এদিকে সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানবকল্যাণ এবং টেকসই অগ্রগতির সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান হলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সমাজ-উন্নয়নে সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রের স্পন্দিত হৃদয় হয়ে উঠে এই প্রতিষ্ঠান। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়কে চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকা কোনো জ্ঞানকেন্দ্র বা প্রাণহীন ডিগ্রি তৈরির সামান্য কোনো কারখানা ভাবলে আমাদের ভুল হয়। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এখন তো সময়েরই দাবি। জ্ঞান-শাখার একীভূত বিশ্বে নতুন নতুন পথ আর পরিক্রমা সামনে আসছে ক্রমশ। সকল প্রকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে আমাদের আজ গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে, গবেষণায় আত্ম-নিমগ্ন হতে হচ্ছে অহর্নিশ এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপায় বের করতে হচ্ছে।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আমিও এই মহান কর্মযজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে-বরং মানবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করায় হাত দিয়েছি।
আমি চাই, আমাদের এই বিদ্যাপীঠ কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করবেনা, বরং জন্ম দেবে একদল আলোকিত ও সংবেদনশীল মানুষের, যারা সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তনের রূপকার হবে। এক্ষেত্রে প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের মায়াবী সেতুবন্ধন তৈরি করা বিশেষভাবে জরুরি।
শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার বীজ বপন করতে আমি 'স্বেচ্ছাসেবী ক্লাস কার্যক্রম' নামে একটি পন্থা চালু করতে চাই। অভিনব হলেও সমাজ গঠনে বিষয়টি যে দারুনভাবে কাজ করবে তা নিঃসন্দেহ। নিকট অতীতে আমার নিজ গ্রামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার মাধ্যমে এমন কার্যক্রম যে বাস্তবিক, তার প্রমাণ পেয়েছি।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো দৃশ্যটি—পাবিপ্রবি’র উচ্ছল ও মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীরা যখন হাসিমুখে গিয়ে দাঁড়াবে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে! গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজির মতো যেসব বিষয় শিশুদের মনে অহেতুক ভয়ের জন্ম দেয়—আমাদের শিক্ষার্থীরা পরম মমতায় যখন সেই ভয় দূর করে দেবে, তখন প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের কী এক অভূতপূর্ব ও মায়াবী সেতুবন্ধন তৈরি হবে!
এই উদ্যোগ কেবল শিশুদের শিক্ষার ভিতই মজবুত করবে না, বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মিক উত্তরণও ঘটাবে। তারা শিখবে, কীভাবে নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো যায়। আমার এই স্বপ্নের শুরুটা হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ঘিরে। কারণ, প্রাথমিক স্তর হলো একটি জাতির শেকড়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তিভূমি এবং সুনাগরিক নির্মাণের প্রথম ও প্রধান স্তর।
একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ। আর একটি শিশুর ভাষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সামাজিক শিষ্টাচার ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রথম স্ফুরণ ঘটে এই প্রাথমিক স্তরেই। শেকড় যত মজবুত হবে, মহীরুহ ততটাই বিশাল আর শক্তিশালী হবে। আমরা চাই, আমাদের তরুণদের হাত ধরে শিশুদের সেই শেকড়টি পরম যত্নে সিঞ্চিত হোক।
আমাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যে জিনিসটির অভাব দেখা যায়, তা হলো নৈতিকতা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন ‘মানুষ করে তোলাই শিক্ষা’। ভালো মানুষ হওয়ার অসংখ্য ক্রাইটেরিয়া’র মধ্যে উদাহরণ হিসেবে সালাম দেয়ার প্রসঙ্গটি ধরা যাক! সালাম প্রদান হলো মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ। কাজেই, প্রাথমিক স্তর থেকেই ছেলে-মেয়েদের ঘরে বাইরে সালাম দেয়া প্রাকটিস করাতে হবে, সরি ও ধন্যবাদ বলা শেখাতে হবে। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, শিশুরা যা দেখে তাই অনুসরণ করে, আর যা শেখে তাই জীবনভর বহন করে। একজন মানুষের বিনয়ী হওয়াটা খুবই জরুরি। আর এর ভিত্তি রচিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
“এক পাবনা, এক ভাবনা” এই সুগভীর দর্শনের আলোকে আমি পাবিপ্রবি-কে স্থানীয় সমাজের স্পন্দনের সাথে একাত্ম করে দিতে চাই। এটি হবে এমন এক 'মডেল বিশ্ববিদ্যালয়', যেখানে জ্ঞান, গবেষণা এবং জনসেবা একসাথে চলবে।
আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন ল্যাবরেটরির গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হবে, নিজেদের অর্জিত জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে বিলিয়ে দেবে, তখনই সার্থক হবে আমাদের শিক্ষা। আসুন, আমরা এমন একটি আগামীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে পাবিপ্রবি শুধু দেশের নয়, বরং মানবতার সেবায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।