২০১৯ সালের দিকে বাংলাদেশে ফুড ব্লগিং ও ট্রাভেল ভ্লগিং আজকের মতো এতোটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সেই সময়ে ‘দ্য ফুড রেঞ্জার’ হিসেবে অতিপরিচিত ট্রেভর জেমস, বাংলাদেশের খাবার, জনজীবন ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। তার পর আরও অনেক বিদেশি পর্যটক ও কনটেন্ট নির্মাতা বাংলাদেশে এসেছেন, ঘুরে দেখেছেন আমাদের বৈচিত্র্যময় জীবন, আর নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন এ দেশের নানা রূপ।
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের মানুষের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা ইনস্টাগ্রামের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা মেলে বাংলাদেশের খাবার, পথঘাট, মানুষ, আতিথেয়তা, সংস্কৃতি ও প্রতিদিনের জীবনের নানা দৃশ্য। নিঃসন্দেহে, এটি আমাদের দেশের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কোনো বিদেশি পর্যটক যখন আমাদের খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখেন কিংবা দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়ান, তখন তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে এমন একটি ভিডিওই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশকে চেনার প্রথম জানালা।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-
আমরা যখন বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছি, তখন আসলে কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরছি?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আসা কিছু বিদেশি পর্যটককে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা গেছে, যেগুলো কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনবিরুদ্ধও। এর মধ্যে চলন্ত ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অন্যতম।
বাংলাদেশে ট্রেনের ছাদে যাতায়াত একটি দুঃখজনক বাস্তবতা। অতিরিক্ত যাত্রী, সীমিত পরিবহনব্যবস্থা এবং নানা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে কিছু মানুষ এমন বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু কোনো একটি কাজ সমাজে প্রচলিত হলেই তা নিরাপদ, গ্রহণযোগ্য কিংবা আইনসম্মত হয়ে যায় না। কোনো বিপজ্জনক আচরণ আমাদের বাস্তবতার অংশ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে সেটিকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, একজন বিদেশি পর্যটক যখন চলন্ত ট্রেনের ছাদে উঠে সেই অভিজ্ঞতা ধারণ করেন এবং তা বিশ্বের মানুষের কাছে উপস্থাপন করেন, তখন বিষয়টিকে কি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়?
আমার মনে হয়, বিষয়টি এতোটা সরল নয়।
একজন বিদেশি কনটেন্ট নির্মাতা যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন তিনি কেবল নিজের জন্য ভ্রমণ করেন না। তার হাতে থাকা ক্যামেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি তার অভিজ্ঞতাকে পৌঁছে দিতে পারে হাজার, লাখ কিংবা কোটি মানুষের কাছে। তিনি কী ধারণ করছেন, কীভাবে তা উপস্থাপন করছেন এবং কোন বার্তা দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন-এসবই একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে।
ধরা যাক, একজন বিদেশি পর্যটক ট্রেনের ছাদে উঠে সেই অভিজ্ঞতাকে একটি রোমাঞ্চকর কিংবা অনন্য ‘বাংলাদেশি অ্যাডভেঞ্চার’ হিসেবে উপস্থাপন করলেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে। তখন কী হতে পারে, যদি অন্য দর্শকদের কাছেও এমন একটি বিপজ্জনক কাজ অনুকরণযোগ্য বা আকর্ষণীয় বলে মনে হয়? আর সেই কর্মকাণ্ড ধারণের সময় যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে?
তখন বিষয়টি আর কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সামনে আসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-কেন এমন ঝুঁকি নেওয়া হলো, দর্শকদের কাছে তা কীভাবে উপস্থাপন করা হলো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের দায়িত্ব কতোটা সচেতনতার সঙ্গে পালন করলেন?
এর অর্থ এই নয় যে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণ থেকে নিরুৎসাহিত করা উচিত। বরং আমরা চাই, আরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে আসুক, আমাদের দেশকে জানুক, এর বৈচিত্র্য অনুভব করুক এবং বিশ্বের কাছে এ দেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরুক।
তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা জরুরি-
‘স্থানীয় অভিজ্ঞতা’ আর ‘ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ’ এক বিষয় নয়।
ব্যস্ত শহরের অলিগলিতে রিকশায় চড়া, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া, ঐতিহ্যবাহী বাজার ঘুরে দেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নদী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন কিংবা গ্রামীণ জীবনের কাছাকাছি যাওয়া-এসবই বাংলাদেশের বাস্তব ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার অংশ।
কিন্তু আইন ভঙ্গ করা কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে না।
সাম্প্রতিক সময়ে হিউ অ্যাব্রড, ট্রেকা জ্যাক, সিল অন ট্যুর, ফ্লোরা গনিং এর মতো কনটেন্ট নির্মাতারাও বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং তাদের দর্শকদের সঙ্গে নানা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। তাদের ভিডিওতে বাংলাদেশের খাবার, মানুষের আতিথেয়তা, দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবামাধ্যমে বাংলাদেশের যে চিত্র প্রায়ই অনুপস্থিত, তাদের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তার একটি ভিন্ন ও প্রাণবন্ত রূপ বিশ্বের মানুষের সামনে প্রকাশ পেয়েছে।
তবে তাদের কিছু কনটেন্টে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের দৃশ্যও দেখা গেছে-যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের রেলওয়ে বিধিমালা অনুযায়ী নিষিদ্ধ। ফলে উদ্বেগের বিষয় তাদের বাংলাদেশ ভ্রমণ কিংবা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া নয়; বরং এমন বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের কোনো ‘আসল’ বা রোমাঞ্চকর ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
এখানে দায়িত্ব কেবল বিদেশি কনটেন্ট নির্মাতাদের নয়; বাংলাদেশি দর্শকসমাজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও রয়েছে।
আমরা বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানাব, তাদের বাংলাদেশকে আবিষ্কার করতে উৎসাহিত করবো। কিন্তু শুধুমাত্র বিনোদনমূলক কনটেন্ট তৈরি কিংবা ভাইরাল হওয়ার আশায় বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডকে উদ্যাপন বা উৎসাহিত করা উচিত নয়।
একইভাবে, বিদেশি পর্যটকদেরও মনে রাখতে হবে-কোনো দেশের ‘অচেনা’ কিংবা ‘অপ্রচলিত’ দিক আবিষ্কার করার অর্থ তার আইন ও নিরাপত্তাবিধিকে উপেক্ষা করা নয়।
দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাণের সঙ্গে সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করার সময় একজন কনটেন্ট নির্মাতার দায়িত্ব কেবল সেখানকার মানুষ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোতেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশটির আইন ও নিরাপত্তাবিধির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি।
একটি ভাইরাল ভিডিও হয়তো কয়েক মিনিটের বিনোদন এনে দিতে পারে, কিন্তু একটি দুর্ঘটনার পরিণতি অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বিদেশি পর্যটক ও কনটেন্ট নির্মাতারা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। আমরা চাই, তারা এ দেশে আসুক, আমাদের খাবারের স্বাদ নিন, মানুষের সঙ্গে মিশুন, সংস্কৃতিকে জানুন এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক গল্পগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরুন।
তাদের গল্পে উঠে আসুক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের আন্তরিকতা, বৈচিত্র্যময় খাবার, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। বিপজ্জনক কিংবা আইনবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আকর্ষণীয় উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হোক-এমনটা আমরা চাই না।
বাংলাদেশকে বিশ্ব কীভাবে দেখবে, সেই চিত্র নির্মাণে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে।
তাই আমাদের লক্ষ্য কেবল বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা নয়; বরং দায়িত্বশীলতা, সম্মান ও সচেতনতার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলে ধরা।