বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কেও নানা পরিবর্তন ঘটে। অনেকেই বয়স বৃদ্ধির স্বাভাবিক লক্ষণ হিসেবে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা কিংবা পরিচিত কোনো বিষয় মনে করতে দেরি হওয়াকে মেনে নেন। কিন্তু স্মৃতিশক্তির অবনতি সব সময় বয়স বৃদ্ধির অনিবার্য পরিণতি নয়। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাপনের বিভিন্ন অভ্যাস মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্বজুড়ে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ বর্তমানে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়; বরং স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, ভাষা, বিচারক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক রোগের সমষ্টিগত লক্ষণ। আলঝেইমার রোগ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত কারণ।
বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবর্তনযোগ্য জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কোনো একটি খাবার ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ এবং রক্তচাপ ও রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের পুষ্টি জৈবরসায়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরেমি স্পেন্সার মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য আট ধরনের খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসব খাবারের অনেকগুলোই আমাদের দৈনন্দিন বাজারে পাওয়া যায়।
১. মাছ: মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড - বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। মাছ আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। মাছের বিশেষ গুরুত্ব হলো এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে ডোকোসাহেক্সায়েনোয়িক অ্যাসিড বা ডিএইচএ (DHA) এবং আইকোসাপেন্টায়েনোয়িক অ্যাসিড বা ইপিএ (EPA)।
ডিএইচএ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ঝিল্লির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি স্নায়ুকোষের গঠন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ইপিএ প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
বাংলাদেশে ইলিশ, পাঙ্গাশ, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও বিভিন্ন ছোট মাছ নিয়মিত খাওয়া হয়। তবে সব মাছের ওমেগা-৩-এর পরিমাণ সমান নয়। ইলিশ তুলনামূলকভাবে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ। অন্যদিকে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়ায় এর পরিমাণ মাছের খাদ্য, চর্বির পরিমাণ ও উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
ছোট মাছ যেমন মলা, পুঁটি ও কাচকি কাঁটাসহ খাওয়া গেলে ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। যদিও এসব মাছের সবগুলোকে উচ্চ ডিএইচএ-সমৃদ্ধ মাছ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
সপ্তাহে অন্তত দুই দিন মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। মাছ রান্নার সময় অতিরিক্ত তেলে ভাজার পরিবর্তে কম তেলে ঝোল বা ভাপে রান্না করলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস আরও স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
২. রঙিন ফল: অ্যান্থোসায়ানিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস - ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি ও স্ট্রবেরির মতো বেরিজাতীয় ফল মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ফলে অ্যান্থোসায়ানিন নামের একধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে, যা ফলকে লাল, নীল ও বেগুনি রং প্রদান করে।
অ্যান্থোসায়ানিন ও অন্যান্য পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। কিছু গবেষণায় ফ্ল্যাভোনয়েডসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে উন্নত স্মৃতিশক্তি ও বয়সজনিত জ্ঞানীয় অবনতির কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে ব্লুবেরি সাধারণত ব্যয়বহুল ও সহজলভ্য নয়। তবে স্থানীয়ভাবে জাম, কালোজাম, পেয়ারা, আমলকি, ডালিম ও বিভিন্ন মৌসুমি ফল পাওয়া যায়। কালোজামে অ্যান্থোসায়ানিন রয়েছে। অন্যদিকে পেয়ারা ও আমলকী ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস।
তবে স্থানীয় এসব ফলের সবগুলোর ক্ষেত্রে ব্লুবেরির মতো একই মাত্রার স্মৃতিশক্তি-সংক্রান্ত উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রতিদিন মৌসুমি ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ফলের রসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ফল খেলে খাদ্যআঁশও পাওয়া যায়।
৩. কোকো: মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহে সম্ভাব্য উপকারিতা - কোকোতে ফ্ল্যাভানল নামের একধরনের উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। এসব যৌগ রক্তনালির কার্যক্রম এবং রক্তপ্রবাহের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু মানবগবেষণায় কোকো ফ্ল্যাভানল গ্রহণের ফলে রক্তনালির কার্যক্রম ও নির্দিষ্ট জ্ঞানীয় পরীক্ষায় উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে কোকো বা চকলেট নিয়মিত খেলে আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব-এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো নেই।
বাংলাদেশে চকলেট ও কোকো পাউডারের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু বাজারে পাওয়া অধিকাংশ মিল্ক চকলেটে চিনি ও চর্বির পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই শুধু চকলেট খেলেই মস্তিষ্কের উপকার হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
চিনি ছাড়া কোকো পাউডার অল্প পরিমাণে দুধ, ওটস বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কোকো প্রক্রিয়াজাতকরণের ধরন অনুযায়ী ফ্ল্যাভানলের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত চকলেট নিয়মিত বেশি খাওয়া উচিত নয়।
৪. ডিম: কোলিন ও ভিটামিন বি১২-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস - বাংলাদেশে ডিম তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য একটি পুষ্টিকর খাবার। ডিমের কুসুমে কোলিন নামের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
কোলিন থেকে অ্যাসিটাইলকোলিন নামের একটি নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হয়। এই রাসায়নিক বার্তাবাহক স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডিমে উন্নতমানের প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, রিবোফ্লাভিন, সেলেনিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও রয়েছে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় ডিম খাওয়ার সঙ্গে জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ডিম খাওয়ার ফলে সরাসরি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমে-এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুষম খাদ্যাভ্যাসে ডিম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ব্যক্তির বয়স, অন্যান্য খাবার এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। ডিমের কুসুম সম্পূর্ণ বাদ দিলে কোলিনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৫. লাল চাল, আটা ও ওটস: মস্তিষ্কের জন্য স্থিতিশীল শক্তি - মস্তিষ্ক শরীরের অন্যতম শক্তিচাহিদাসম্পন্ন অঙ্গ। স্বাভাবিক অবস্থায় গ্লুকোজ মস্তিষ্কের প্রধান শক্তির উৎস। তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে রক্তনালি ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার যেমন লাল চাল, লাল আটা, ওটস এবং কম প্রক্রিয়াজাত শস্যে খাদ্যআঁশ, বি ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে সাদা চাল প্রধান খাদ্য। চাল অতিরিক্ত পালিশ করার ফলে এর বাইরের স্তর ও অঙ্কুরের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। এতে খাদ্যআঁশসহ কিছু ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
লাল চাল বা কম পালিশ করা চাল খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে খাদ্যআঁশ গ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। একইভাবে পরিশোধিত ময়দার পরিবর্তে পূর্ণশস্যের আটা ব্যবহার উপকারী হতে পারে।
গবেষণায় পূর্ণশস্য গ্রহণের সঙ্গে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং কিছু ক্ষেত্রে জ্ঞানীয় অবনতির কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে শুধু লাল চাল বা ওটস খেলেই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ হবে না।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চালের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি মোট পরিমাণ, খাদ্যের ভারসাম্য এবং রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
৬. সবুজ শাকসবজি: ফোলেট, নাইট্রেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট - বাংলাদেশে পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক ও বিভিন্ন মৌসুমি শাক সহজলভ্য। এসব শাকে ফোলেট, ভিটামিন কে, ক্যারোটিনয়েড, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে।
কিছু শাকসবজিতে প্রাকৃতিক নাইট্রেটও রয়েছে। শরীরে নাইট্রেট থেকে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া রক্তনালির প্রসারণ ও স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে সহায়তা করতে পারে।
বয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত সবুজ শাকসবজি খাওয়ার সঙ্গে তুলনামূলক ধীর জ্ঞানীয় অবনতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে অনেক সময় শাক দীর্ঘক্ষণ সিদ্ধ করে পানি ফেলে দেওয়া হয়। এতে পানিতে দ্রবণীয় কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নষ্ট বা অপসারিত হতে পারে। তাই শাক ভালোভাবে ধুয়ে অল্প পানিতে এবং প্রয়োজনমতো রান্না করা ভালো।
প্রতিদিনের দুপুর বা রাতের খাবারে অন্তত এক ধরনের শাকসবজি রাখা যেতে পারে। তবে দূষিত পানি দিয়ে উৎপাদিত বা অপরিষ্কার কাঁচা শাক খাওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। তাই যথাযথভাবে পরিষ্কার ও রান্না করে খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ডাল ও ছোলা: অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক - বাংলাদেশে মসুর ডাল, মুগ ডাল, মাষকলাই, ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের শিমজাতীয় খাবার প্রচলিত। এসব খাবারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ফোলেট ও জটিল শর্করা পাওয়া যায়।
ডালজাতীয় খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে থাকা খাদ্যআঁশ ও কিছু প্রতিরোধী শ্বেতসার। এসব উপাদানের একটি অংশ বৃহদন্ত্রে পৌঁছে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
এই প্রক্রিয়ায় অ্যাসিটেট, প্রোপিওনেট ও বিউটিরেটের মতো স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি হয়। এসব যৌগ অন্ত্রের স্বাস্থ্য, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্ত্র-মস্তিষ্কের যোগাযোগব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে ডাল খেলে সরাসরি ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ হয়-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশের সাধারণ খাদ্যাভ্যাসে প্রতিদিন পরিমিত ডাল রাখা সহজ ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। বিশেষ করে চাল, ডাল, শাকসবজি ও মাছের সমন্বয়ে তৈরি খাবার পুষ্টির দিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
৮. গ্রিন টি ও সাধারণ চা: পলিফেনল ও এল-থিয়ানিনের উৎস - চা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। সাধারণত দুধ-চা বেশি প্রচলিত হলেও গ্রিন টি বা সবুজ চায়ের ব্যবহারও বাড়ছে।
চায়ে ক্যাটেচিনসহ বিভিন্ন পলিফেনল রয়েছে। গ্রিন টিতে বিশেষ করে এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেট বা ইজিসিজি (EGCG) পাওয়া যায়। এসব যৌগ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
চায়ে এল-থিয়ানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডও থাকে, যা ক্যাফেইনের সঙ্গে মিলিতভাবে মনোযোগ ও সতর্কতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত চা পানকারীদের মধ্যে জ্ঞানীয় অবনতির তুলনামূলক কম ঝুঁকি দেখা গেছে। তবে এই সম্পর্ক থেকে চা সরাসরি ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে-এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত দুধ-চা পান করার প্রবণতা রয়েছে। চায়ের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বিবেচনায় চিনি ছাড়া বা কম চিনিযুক্ত চা ভালো বিকল্প হতে পারে।
দিনে এক থেকে দুই কাপ চা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল ব্যক্তি, ঘুমের সমস্যায় ভোগা মানুষ এবং নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা - বাংলাদেশে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ব্যয়বহুল বিদেশি খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। আমাদের পরিচিত মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ও পূর্ণশস্য থেকেই মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব।
একজন সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন খাবারে সকালে ডিম ও আটার রুটি, দুপুরে পরিমিত ভাতের সঙ্গে মাছ, ডাল ও শাকসবজি, বিকেলে মৌসুমি ফল এবং রাতে পরিমিত শস্য, সবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। খাদ্যতালিকা ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আয় ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্স ফ্যাট এবং উচ্চমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে শুধু খাবার নয়, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার, শ্রবণসমস্যার চিকিৎসা, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকাও প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষার জন্য কোনো একক অলৌকিক খাবার নেই। বরং দীর্ঘদিনের সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ড. শহীদুল ইসলাম, খাদ্যবিজ্ঞানী, গবেষক এবং খাদ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ