নদীহীন রুক্ষ শহরের কথা

পাই পাই করে ঠিক মনে নেই। লেখাটা ছিল মুনতাসীর মামুন স্যারের। ’৬০-এর দশকে প্রথম মিরপুর আসার বিবরণ দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন অনেকটা এমনভাবে, “জগন্নাথ কলেজের সামনে থেকে বাসে উঠলাম। মাঠের পর মাঠ, পুকুর পার হয়ে বাস চলতে লাগলো। এক সময় থামলো। বটগাছ ঘেরা একটি মাজার। মিরপুর- লাল মাটির এক গ্রাম।”

সুফি সাধক হযরত শাহ আলীর (রা.) দরগাহ ঘিরে মিরপুরের খ্যাতি আছে। আজও মিরপুরগামী বাসের কন্ডাক্টররা চলটে ওঠা বাসের বডি থাপড়ে যাত্রী ডাকে, ‘‘মাজার...মাজার’’ বলে। মিরপুর ভিন্ন এর লাল মাটির গড়নের জন্যও। তুরাগ ঘেঁষা অপরূপ, বিল, ঝিল, নদী ছিল একদা। দখলে, দূষণে এখন তা ড্রেন। কোথাও উন্নয়নে বক্স কালভার্ট। বেশিরভাগ বিলীন ভবনে। অস্তিত্বহীন বলা যায় জলাশয়। সবুজ ক্ষীণ। ছেয়ে পুরোটা কনক্রিট।  

এখন সামান্য বৃষ্টিতে মিরপুর তলায়। পানি সরার পথ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত, প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষাহীন ভাবনায় যে প্রকাণ্ড তিলোত্তমা তৈরি করেছেন শহরকর্তারা এর মাসুল না দিয়ে উপায় কী?      

মধ্য ’৮০-র দশকে বড় হয়ে যে মিরপুর দেখেছি, তার বর্ণনা কল্পকাহিনীর মতো শোনাতে পারে। তখনও রাজধানী ছয় ঋতু টের পেত। অনন্ত গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত তিন পর্ব। গরমের দিনে তুরাগে ডুব দিয়ে উঠতো দুরন্ত ছেলেরা। বর্ষায় দেখতাম বড় বড় নৌকা যাচ্ছে বিলগুলোর দিকে। বাসায় বাসায় টাটকা মাছ ভাজার ঘ্রাণ। শীতে ব্যান্ডমিন্টন, দাড়িয়াবান্দার ফাঁকে যোগ হতো ফড়িং ধরার খেলা। কাঠির মাথায় আঁঠা লাগিয়ে চলত এ কর্ম। স্টপ ওয়াচে চোখ রেখে লজ্জাপতি গাছ আবার কখন পাতা মেলবে তার নিরীক্ষা। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে আহা কী আনন্দ শৈশব!

ব্যক্তিগত নস্টালজিয়ায় এ লেখনী ভরে উঠুক তা উদ্দেশ্য নয়। আমরা এখন শুধু বিস্ময় নিয়ে দেখতে পারি, একটি নদীকেন্দ্রিক, প্রাণ-প্রকৃতি নির্ভর জীবন থেকে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া।

আমাদের শহর গড়ে উঠলো বুড়িগঙ্গা পাড়ে। ইংরেজরা তা টেনে আনলো রমনায়। এরপর পাকিস্তান আর বাংলাদেশ কর্তারা তার বিস্তার ঘটালেন গাজীপুর ছুঁয়ে ময়মনসিংহ অবধি। কিন্তু জিনজিরা, কেরাণীগঞ্জের দিকে নজর প্রায় পড়লোই না। দু’পাড় ধরেই তো সুষম বিস্তার হওয়ার একটি শহরের। কিন্তু ঘটলো কী?

নদীকেন্দ্রিক সভ্যতাই পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর ঐতিহ্য। শহরের মাঝ দিয়ে নদী বয়ে যায়। শহরবাসী যাতায়াত থেকে শ্বাস নেয়া, পর্যটনের যাবতীয় প্রমোদের জন্য এর কূলমুখী হন। কিন্তু বিরামহীন লুটের দেশে শহরে প্রথমে গলা টিপে হত্যা করা হয় নদী। যেন উন্নয়ন মানেই ভরাট।

একটি হাতিরঝিলের সফলতার পরও আমাদের শহরকর্তারা জলাশয়ের গুরুত্ব বোঝেননি। এখনো বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ বাঁচাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়। নদী, জলাধার এক কোণে ফেলে শহর বাঁচে না। এ সত্য বোঝার জন্য দরকার এমন শাসকগোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশকে নিয়ে ভবিষ্যত স্বপ্ন দেখেন। যাদের উত্তর প্রজন্ম এ জনপদে বড় হবে।


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত লেখাটি একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত মত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।