সাধারণ মানুষ বহু দিন থেকে সাংবাদিকতা পেশার মানুষকে ডাকে “সাংঘাতিক”। অনেকের মতে পুলিশের চেয়েও বেশি সাংবাদিকের প্রভাব। বিশেষত, বাংলাদেশে এ এক অপার ক্ষমতার বৃত্তি। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে তুলনায় পেশাটির কি মর্যাদা বাড়ে? এর উত্তর দেবেন এমন সাংবাদিক বেশি দেখি না দেশে।
অতি সামান্য ব্যতিক্রম বাদে সাংবাদিক মানে দাপট। রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী তোষণে বিলিন হওয়া মেরুদণ্ড। রাতারাতি দিনবদল মানে সাংবাদিক। সব দায় মুক্তির প্রেসকার্ড যার পকেটে সেই যেন সাংবাদিক। সাংবাদিকতা মানে বিদেশ থেকে ঋণ করা টাকায় মেগাপ্রকল্প (দফায় বাড়ে যার প্রকল্প বাজেট) দেখে উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির বয়ান। সাংবাদিকতা মানে শাসকের চোখে দেখা। এমন “এমবেডেড” হওয়া মানলেও মানা যায়; যদি তাতে থাকতো পেশাগত কোনো ঐক্য। সাংবাদিক সংগঠন নামে যেগুলো আছে, এমনই জিনিস তা গড়া মাত্রই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়। যেখানে সরের পুরোটা যায় নেতাদের হা করা মুখে। তলানির পচাবাসী থাকে ঘাম ঝরানো নিষ্ঠাবান গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য। পেশায় শ্রমনিষ্ঠ নিজেদের উজাড় করা সংবাদকর্মীর স্বার্থ দেখে এমন পেশাজীবী সংগঠন আজকের বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিরাজমান সংস্কৃতি হতাশা বাড়ায়। এ পরিস্থিতিতে একজন মোনাজাতউদ্দিনকে স্মরণ খুব জরুরি।
১৯৪৫ সালের আজকের দিন ১৮ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন রংপুরে।
শুভ জন্মদিন, মোনাজাতউদ্দিন!
চারণ সাংবাদিক নামে যিনি স্বতন্ত্র। তার লেখা "সংবাদের নেপথ্য", "পথ থেকে পথে", "কানসোনার মুখ", "নিজস্ব রিপোর্ট", "অনুসন্ধানী প্রতিবেদন", "পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ", "চিলমারীর একযুগ", "কাগজে মানুষেরা", "ছোটছোট খবর" বইগুলো দৃষ্টান্ত এক অন্য বাংলার। যে উত্তর বাংলায় মরা কার্তিকে অনাহারে মানুষ মরে। হিমে কাঁপে ঠকঠক করে অপ্রতুল বস্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তাদের কথাই তুলে ধরতেন মোনাজাতউদ্দিন। আমৃত্যু মফস্বল সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন মন্ত্রীর অনুষ্ঠানের নিউজের শিরোনাম করেন “আসাম থেকে বন্যা, ঢাকা থেকে বাবুর্চি, বগুড়া থেকে দৈ।”
তার সাংবাদিকতায় প্রথম হাতেখড়ি বগুড়ার বুলেটিনে। সময়টা ষাটের দশকের প্রথমভাগ। মোনাজাতউদ্দিন পড়তেন রংপুরের কৈলাশরঞ্জন হাইস্কুলে। তখন তিনি যুক্ত ছিলেন মুকুল ফৌজের সাথে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আওয়াজ পত্রিকার প্রতিনিধি হয়ে পেশা হিসেবে তার সাংবাদিকতার যাত্রা। সেখানে কিছুদিন কাজের পর উত্তরবঙ্গ সংবাদদাতা হিসেবে তিনি যোগ দেন দৈনিক আজাদে। মাঝে কিছুদিন কাজ করেন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধের পরে রংপুর থেকে মোনাজাতউদ্দিনের নিজের সম্পাদনায় বের হয় দৈনিক রংপুর। চার বছর এই পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন তিনি। এরপর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় উত্তরবঙ্গের সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন। টানা ২০ বছর দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। অল্প কিছু দিন উত্তরবঙ্গে ছিলেন জনকণ্ঠের প্রতিনিধি হয়ে।
রাজ মুকুট মাথায় নিয়ে জন্মাননি মোনাজাতউদ্দিন। সংগ্রামী জীবন তার। কারমাইকেল কলেজে বি.এ. ক্লাসে পড়ার সময় বাবার মৃত্যুতে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। তখন সংসারের হাল ধরতে হয়েছিলো তার। পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। পরে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে বি.এ পাশ করেন তিনি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তাকে টানেনি কখনোই। সংবাদের শিরা তুলে আনাই ছিল তার আমৃত্যু নেশা।
সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন যতটা ছিলেন মফস্বল প্রতিনিধি তার চেয়ে বেশি ছিলেন কৃষক প্রতিনিধি, শ্রমিক প্রতিনিধি, ছাত্র প্রতিনিধি তথা জনতার প্রতিনিধি। তাকে বলতে পারি, বাংলা ভাষার সাংবাদিকতার নূরুলদীন। উত্তর বাংলা থেকে পাঠানো তার ঝড় তোলা সংবাদে কেঁপে উঠতো দেশ। “জাগো বাহে” ডাক তিনি দিতেন পত্রিকার খবরে।
অপমৃত্যুতে মোনাজাতউদ্দিনকে হারাতে হয় মাত্র ৫০ বছর বয়সে। এর পরের বছর ১৯৯৭ সালে তাকে মরনোত্তর “একুশে পদক”কে ভূষিত করা হয়। তার সৃষ্টিকর্ম এখনো সজীব ও জীবন্ত। রচনা সমগ্রও প্রকাশিত। সত্যনিষ্ঠ, পেশাদার ও ডিজিটালাইজড বিশ্বে সময়োপযোগী সাংবাদিকতার জন্য মোনাজাতউদ্দিন পাঠ ও তাকে ধারণ জরুরি মনেকরি।
ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।