দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি এবং জনগণের জীবনরক্ষায় অবিলম্বে নদী সমস্যা কাটিয়ে ওঠা বাঞ্ছনীয়। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫০% নদী গত কয়েক বছরে চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেছে। দক্ষিণ -পশ্চিমাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য নদী যেমন- ভৈরব, রূপসা এবং পশুর নদী বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কয়েক বছর আগেও এই নদীগুলো এই অঞ্চলের প্রাণ ছিল। কিন্তু এখন সেগুলো নিষ্প্রাণ।
এই সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি অনুসারে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা পাই মাত্র ৯,০০০ কিউসেক। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। প্রকৃতপক্ষে, গঙ্গার প্রধান শাখা হিসাবে, পদ্মা নদী, গঙ্গা থেকে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পাচ্ছে না। ফলে পদ্মার পানি শুকিয়ে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ পলি জমছে। এদিকে, গড়াই আবার পদ্মার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই এর প্রভাব পড়ছে গড়াইয়ের ওপরেও।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব শাখা ও উপনদী পানির জন্য গড়াই নদীর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ গড়াই নদী যদি পদ্মার মাধ্যমে প্রভাবিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমের সবগুলো শাখা এবং উপশাখা নদীগুলো স্পষ্টতই ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি হবে। প্রাকৃতিক নিয়মেই উপনদীগুলো সবসময় প্রধান নদীগুলোর মাধ্যমে প্রভাবিত।
এভাবে এই জটিল সমস্যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্যার প্রভাবকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, অর্থনৈতিক ধস, দ্বিতীয়ত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রাদুর্ভাব এবং সর্বশেষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে মানুষের শহরমুখী অভিবাসন।
অর্থনৈতিক ধস দক্ষিণ-পশ্চিমের জন্য একটি প্রচলিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিডিপিতে অন্যান্য অঞ্চলের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা) কয়েক বছর আগেও সমান অবদান রাখলেও সম্প্রতি অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ধারণা করা হয়, নদীগুলোর ক্রমাগত মৃত্যুর কারণেই তারা অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়ছে।
চিংড়ি রপ্তানিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশে চিংড়ি উৎপাদনের ৮০% আসতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৩০ হাজার টনের বেশি চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যা ছিল ২৫০০০ টন। কিন্তু ২০১৯- ২০ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ১৮,০৪৬ টনে দাঁড়িয়েছে। এর একমাত্র কারণ নদী নাব্য হ্রাস।
অর্থনৈতিক অবমূল্যায়নের পর, নদী মরে যাওয়ার ফলে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার জন্য দুর্দশা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রায় প্রতি বছর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক পরের বছর আরও একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অনেক ধ্বংসলীলা নিয়ে হাজির হচ্ছে। আর এই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো প্লাবিত হচ্ছে। কারণ এই সমস্ত নদী ইতিমধ্যে তাদের নাব্য হারিয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে উপকূলীয় এলাকার বহু বাসিন্দা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
ফ্রিডম্যানের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫,০০,০০০ মানুষ উপকূলীয় ও গ্রামীণ এলাকা থেকে ঢাকা শহরে অভিবাসন করে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ কৃষিকাজে জড়িত। ক্রমাগত ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার কারণে তারা কৃষি ও উৎপাদন কাজে নিরুৎসাহিত হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
নদীগুলো মরে যাওয়ার কারণ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ধ্বংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ খুলনা শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী দুই জেলা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার “পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা”। আশ্চর্যজনকভাবে, খুলনা শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না। ফলে বিভাগীয় শহরটির সমস্ত বর্জ্য নির্বিঘ্নে সরাসরি পানিতে পড়ছে। “ওয়ার্ল্ড ওয়াটার অ্যাটলাস” বিশ্লেষণ অনুসারে, খুলনা শহর থেকে প্রায় ২৫% কঠিন বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ করা হয়। অবশিষ্টাংশ সরাসরি রূপসা নদীতে পুরোদমে ফেলা হয়। এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা শুধু খুলনা শহরেই নয়, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাতেও একইভাবে দৃশ্যমান।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই সমস্যা দূরীকরণে কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের যে নদীগুলো এখনও টিকে আছে তাদের পাশে পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে যাতে স্রোত তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে পারে। তাছাড়া অবিলম্বে আইন প্রয়োগ করে নদীর আশপাশের জমি ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
এমতাবস্থায় বলা যায়, যত দ্রুত সম্ভব অপরিকল্পিত বাঁধ এবং নদীশাসনের সমাপ্তি না ঘটছে ততক্ষণ পর্যন্ত নদীর অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকবে।
সৌরভ রায় একজন আন্তর্জাতিক সমসাময়িক ইস্যু বিশ্লেষক এবং ফটোগ্রাফার। বর্তমানে তিনি পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগে।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।