ভুট্টার তেল উৎপাদন: বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত

ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। দিনে দিনে ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। তাই বর্তমানে সরকারের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এজন্য আমন ও বোরো ধানের মাঝে যে সময়টুকু থাকে, সেসময় স্বল্পমেয়াদী চাষ করে সরিষা ও সরিষা তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এ ধরনের উদ্যোগ আগে থেকে চলমান থাকলেও বর্তমানে এজন্য সরকারিভাবে ব্যাপক ও অধিকতর পরিকল্পনা মাফিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহজ মনে হলেও  কাজটা কিন্তু অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এর মধ্যে নানাধরনের প্রযুক্তিগত বিষয় রয়েছে। আশা করি এই সুন্দর উদ্যোগটি সফলকাম হবে। ভোজ্যতেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা আংশিক স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে আরও একাধিক উৎস্য থেকেও তেল আহরণের উদ্যোগ নিতে হবে। 

যেহেতু দেশে বিপুল পরিমানে ভু্ট্টা উৎপাদন হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা আছে, তাই ভুট্টার তেল বা কর্ন অয়েল বা কর্ন জার্ম অয়েল উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল, সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ খাত। 

স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও আমদানি

বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য প্রচলিত তেল ফসল হচ্ছে- সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিন, তিল ও তিসি। এর মধ্যে নানাবিধ ব্যাবহারের কারণে সরিষা ছাড়া অন্যান্য উৎস্য থেকে ভোজ্যতেলের উৎপাদন খুবই সামান্য। এক সময় গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুস্বাদু বাঝনার তেল পাওয়া যেত, যা এখন শুধুই অতীত। 

এ বছরের ২৭ মে দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ গত বছর ১৭ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা ব্যয় করে ১৮ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানী করে দেশের চাহিদা মেটানো হয়েছে। 

চাহিদা থাকায় বাংলাদেশের বাজারেও বিদেশ থেকে আমদানি করা ভুট্টার তেল পাওয়া যায়। এসব আমদানি করা ভোজ্যতেলের সঙ্গে সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল থেকে দেশেজ উৎপাদন (প্রায় ৩ লাখ টন) যোগ করে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা নিরূপণ করা যায়, যা কম-বেশি ২১ লাখ টন প্রতি বছর (মতান্তরে ২৪ লাখ টন প্রতি বছর)। 

তাই, দেশের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দেশে ভুট্টার তেল উৎপাদনের কথা এখনই ভাবতে হবে। তাহলে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

বিশ্বে ভুট্টার তেল উৎপাদন

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক, ব্রাজিল, জাপান, ইতালি, বেলজিয়াম, কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, স্পেন, মোজাম্বিক, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভারতসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টার তেল উৎপাদন করছে যার মোট পরিমান প্রায় ৩২ লাখ মেট্রিক টন। এসব তেল তারা  বিদেশেও রপ্তানি করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অন্যতম প্রধান ভুট্টা উৎপাদনকারী দেশ হলেও ইতালি এবং জাপানের ভুট্টা উৎপাদনের পরিমাণ আমাদের মতোই। তা সত্ত্বেও ইতালি ও জাপান ভুট্টা থেকে তেল উৎপাদন করছে।  

ভুট্টার তেলের গুণাগুণ ও ব্যবহার: ভুট্টার তেল একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল। প্রায় সব ধরনের রান্নায় এ তেল ব্যবহার করা যায়। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন-ই (১০%) ও ভিটামিন-কে (১%)। এর ফ্যাটি এসিড কম্পোজিশন অনেকটা সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, তুলাবীজ, তিল ও তিসি তেলের মতোই। 

এতে রয়েছে ৫৫.০-৬২.০% ওমেগা-৬ (Linoleic acid) এবং ০.০-১.১% ওমেগা-৩ (α-Linolenic acid) ফ্যাটি অ্যাসিড যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এক টেবিল চামচ (১৩.০ গ্রাম) ভুট্টার তেলে রয়েছে ১২২.৪ কিলোকেলোরি শক্তি, মোট ফ্যাট-১৩.০ গ্রাম, স্যাচ্যুরেটেড ফ্যাট- ১.৮ গ্রাম, মনোআনস্যাচ্যুরেটেড ফ্যাট-৩.৮ গ্রাম, পলিআনস্যাচ্যুরেটেড ফ্যাট- ৭.৪ গ্রাম, ওমেগা-৬ (Linoleic acid)-৭.২ গ্রাম ও ওমেগা-৩ (α-Linolenic acid)-০.২  গ্রাম। এই তেল ব্যাবহারের ফলে রক্তের কোলস্টরলের উন্নয়ন হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ও হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন হয়, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে, পেটের দাহ নিয়ন্ত্রণ করাসহ নানাবিধ উপকার রয়েছে। সুস্বাদু, মিষ্টি গন্ধ ও সুন্দর রংয়ের জন্য এই ভোজ্যতেল অধিক জনপ্রিয়। 

রান্নার তেল ছাড়াও ভুট্টার তেল বায়োডিজেল, সাবান, রং, কালি, ওষুধ তৈরির পাশাপাশি পোশাক শিল্পে বিশ্ববাজারে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। 

ভুট্টার তেল উৎপাদন প্রক্রিয়া

একটি ভুট্টার দানায় চারটি অংশ থাকে- স্টার্চ ও প্রোটিন সম্বৃদ্ধ এন্ডোস্পার্ম (৮৩%), বহিত্বক (৫%), টিপ বা অগ্রভাগ (১.০%) এবং প্রোটিন ও তেলসমৃদ্ধ  ভ্রুণ বা জার্ম (১১%)। কর্ন জার্ম থেকে উৎপাদিত তেলকে কর্ন জার্ম অয়েলও বলা হয়। ভুট্টার দানায় সাধারণত ৪-৫% তেল থাকে, যার অধিকাংশ  (৮৩-৮৫%) ভ্রুণ বা জার্ম অংশে সীমাবদ্ধ। ভুট্টার দানা থেকে ভ্রুণ বা জার্ম অংশ (দানার ১১%) সহজেই আলাদা করা যায়। ভ্রুণ বা জার্ম অংশ আলাদা করে তা শুকিয়ে নিলে তা থেকে প্রায় ৫০% তেল পাওয়া যায়।

ভুট্টার দানা থেকে তেল নিষ্কাশনের জন্য প্রথমেই ভ্রুণ বা কর্ণ জার্ম অংশ আলাদা করে নিতে হবে। তিন প্রক্রিয়ায় ভুট্টার দানা থেকে ভ্রুন বা কর্ণ জার্ম আলাদা করা যায়- (১) শুকনা পদ্ধতিতে (dry method), (২) ভেজা পদ্ধতিতে (wet method) এবং (৩) আধা-ভেজা পদ্ধতিতে (half wet or semi wet method)। আলাদা করার পর ভ্রুণ বা কর্ণ জার্ম থেকে তেল নিষ্কাশনের জন্য তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়- (১) চাপ দিয়ে (pressing method), (২) দ্রবণ পদ্ধিতে (solvent extraction method) এবং (৩) ভেজা এনজাইম প্রক্রিয়ায়   (aqueous enzymatic method)। 

তবে চাপ দিয়ে যে তেল নিষ্কাশন করা হয় তা মানে ভালো, পরিবেশসম্মত ও তুলনামূলক সস্তা। 

এসব প্রক্রিয়া অনুসরণের ফলে কর্ণ জার্ম থেকে ক্রুড তেল নিষ্কাশিত হবে। এই ক্রুড তেল পরবর্তীতে রিফাইন করে খাওয়ার উপযোগী করতে হয়। ভৌত (physical) বা রাসায়নিক (chemical) পদ্ধতিতে চার থেকে পাঁচ ধাপে এই ক্রুড তেল রিফাইন করতে হয়। ক্রুড তেল রিফাইন করার ফলে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর বস্তু তেল থেকে অপসারিত হয়ে খাওয়া ও বাজারজাত করার উপযোগী হয়। রিফাইন তেল দেখতে সুন্দর রং, খেতে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত।  

বাংলাদেশে ভুট্টার ব্যাবহার: বাংলাদেশে উৎপাদিত ভুট্টার সিংহভাগ (প্রায় ৯৫%) ব্যবহৃত হয় পোল্ট্রি, পশু ও মাছের খাদ্যে। সরাসরি মানুষের  খাবার হিসেবে এর ব্যবহার খুবই সীমিত (প্রায় ৫%)। বেবি কর্ন সবজি হিসাবে, পপ কর্ন খৈ হিসেবে ও রোস্টেড কর্ন (পোড়ানো ভুট্টা) মানুষ সরাসরি খেয়ে থাকে। তাছাড়া গমের সঙ্গে কিছু অংশ ভুট্টা মিশিয়ে যে আটা তৈরি হয় তা গুণে ও মানে ভালো বলে জানা যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান ভুট্টা থেকে স্টার্চ তৈরি করছে বলেও জানা গেছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভুট্টা থেকে তেল উৎপাদন করতে গিয়ে সফলকাম হতে পারেনি বলেও জানা যায়। 

মনে করা হয়, এজন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা প্রোটোকল, দক্ষ বা প্রশিক্ষিত জনবল, তেল নিষ্কাশনের লাগসই যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক  এবং তেলসমৃদ্ধ ভুট্টা জাতের অভাব ছিল।

পোল্ট্রি, পশু ও মাছের খাদ্য ভুট্টার ব্যবহার

পোল্ট্রি, পশু ও মাছের খাদ্য ভুট্টার ব্যবহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব খাদ্য প্রস্তুত করতে যে ভু্ট্টা ব্যবহার করা তা মূলত কার্বহাইড্রেট বা স্টার্চ এবং প্রোটিনের জন্য, ফ্যাটের জন্য নয়। যে পরিমাণ (৪-৫%) তেল এখান থেকে আসতে পারে তা বিকল্প সোর্স (পাম অয়েল, রাইস ব্রান মিল, সয়াবিন মিল/কেক, সরিষার খৈল ইত্যাদি) থেকে অনায়াসে পূরণ করা সম্ভব। 

উল্লেখ্য, পোলট্রি খাদ্যে মাত্র ১-৪% (সর্বোচ্চ ৫%) ফ্যাট প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনে এসব ফিড ফরমুলেশনে কিছু সংশোধনী লাগতে পারে আবার নাও লাগতে পারে। 

বাংলাদেশে ভুট্টার তেল উৎপাদনে সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা

বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ভুট্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমাদের দেশের কৃষক ভাইয়েরাও এখন প্রশিক্ষিত এবং এর চাষ পদ্ধতিতে সিদ্ধহস্ত। তাই অতি দ্রুত এর সম্প্রসারণ হচ্ছে। 

বাংলাদেশে ২০২০-২১ সালে প্রায় ৫৬.৬ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদন হয়েছে (ডিএই ২০২২)। তবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এক কোটি টন ভুট্টা উৎপাদন করা। ভুট্টার ওপর অধিকতর গবেষণার জন্য ২০১৭ সালে দিনাজপুরে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে স্বতন্ত্র একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সিমিটের (CIMMYT) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখন অনেক উন্নত। 

ভুট্টার চাষ সম্প্রসারণের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছে। আর এগুলি হচ্ছে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের প্রধানতম শক্তি।

আমাদের কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট বা  সিমিটের (CIMMYT) মেন্ডেট অনুযায়ী তাদের কার্য্যক্রম অনেকটাই ফলন বৃদ্ধি-কেন্দ্রিক, ব্যবহারভিত্তিক নয় বা সীমিত। যেমন- কিভাবে আরও বেশি ফলন পাওয়া যাবে সে দিকেই তাদের নজর। কিন্তু এখন সময় এসেছে, ব্যবহারের লক্ষ্য ঠিক করে এর জাত উন্নয়ন ও অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট ডেভেলেপমেন্ট বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা। 

আরও একটু পরিষ্কার করে যদি বলি, এমন ভুট্টার জাত আবিষ্কার করতে হবে যা থেকে ভুট্টার তেল, কর্ন ফ্লেক্স বা উন্নতমানের স্টার্চ উৎপাদন করা যায়। সেই সঙ্গে এসব পণ্য তৈরির জন্য প্রযুক্তিও আবিষ্কার করতে হবে। এসব গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ করার প্রয়োজনীয় জার্মপ্লাজম (যা থেকে জাত উদ্ভাবন করা হয়), প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ল্যাবরেটরির ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে সীমিত ব্যবহারের কারণে কখনও কখনও ভুট্টার বাজারে অনিশ্চয়তাও দেখা দেয়। যেমন মুরগির বার্ডফ্লু-এর সময় ভুট্টার বাজারে সমস্যা হয়েছিল, চাষিরা তখন কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। এসবই আমাদের দুর্বল দিক।

বাংলাদেশে ভুট্টার তেল উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টার তেল উৎপাদন করছে। উপরে বর্ণিত আমাদের শক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এবং দুর্বল দিকগুলোর সমাধান করে এ লক্ষ্য পূরন করতে হবে। 

আমাদের দেশে বর্তমানে ৫৬.৬ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদন হয় তা থেকে  প্রায় ৫.৬ লাখ টন কর্ন জার্ম পাওয়া যাবে (১০% হিসেবে) এবং ২ লাখ টন তেল নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে। এই দুই লাখ টন ভুট্টার তেলের বাংলাদেশে বাজারমূল্য প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা (৩৫০ টাকা কেজি বাজারমূল্য হিসেবে)। তাছাড়া, কর্ন জার্ম আলাদা করার পর বাকি অংশ (প্রায় ৯০%) ব্যবহার করে পোল্ট্রি, পশু ও মাছের খাদ্য এবং কর্ন স্টার্চ উৎপাদন করা সম্ভব। 

তেল নিষ্কাশনের পর যে খৈল পাওয়া যাবে তাও পোলট্রি, পশু ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে। তবে এজন্য প্রয়োজন সুসমন্বিত উদ্যোগ। 

গবেষণা প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ভুট্টা ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে জাত উন্নয়ন করে এর তেলের পরিমাণ ৪% থেকে উন্নীত করে ১০%-এর অধিক করা যায়। 

তাছাড়া, চাষিদের জন্য ভুট্টার বাজার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এর ব্যবহারে ডাইভারসিফিকেশন দরকার। এসবই আমাদের সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক। 

ভুট্টার তেল উৎপাদনে আমাদের করণীয়

দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ভুট্টা ব্যবহার করে আমরা মূল্যবান তেল উৎপাদন করতে পারি। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা; পলিসি, গবেষণা ও আর্থিক সাপোর্ট; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি (গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রোডাক্ট ডেভেলেপমেন্ট বিভাগ স্থাপনসহ); প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি  এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ। আমাদের উচিত আর দেরি না করে এখনই তা আরম্ভ করা। এজন্য এখনই কিছু স্বল্প ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা নিচে বর্ণনা করা হলো-

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- (১) প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির লক্ষ্যে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য ভুট্টা তেল উৎপাদনকারী দেশে বিজ্ঞানী পাঠানো, (২) প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির লক্ষ্যে বিজ্ঞানী ও ল্যাব টেকনিশিয়ানদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য তেল উৎপাদনকারী দেশ বা সিমিট (CIMMYT) থেকে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, (৩) উৎপাদনকারী দেশ থেকে তেল নিষ্কাশনের প্রোটোকল/প্রযুক্তি ও ল্যাব যন্ত্রপাতি আমদানি করা এবং সিমিট (CIMMYT)-এর সহযোগিতায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি স্থাপন করা, (৪) সিমিট (CIMMYT) এর সহযোগিতায় তেল উৎপাদনকারী দেশ থেকে তেল নিষ্কাশনের জন্য তাদের ব্যবহৃত জাত/ জার্মপ্লাজম আমদানি করা, (৫) প্রয়োজনে আমাদের দেশে উৎপাদিত ভুট্টা জাতের তেলের পরিমাণ গবেষণাগারে নিরূপণ করে তেল নিষ্কাশন কাজ পরীক্ষামূলকভাবে এখনই শুরু করা। 

অপরদিকে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- (১) উৎপাদনকারী দেশ থেকে তেল নিষ্কাশনের জন্য তাদের ব্যবহৃত জাত/জার্মপ্লাজম আমদানির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উচ্চমাত্রায় তেল সমৃদ্ধ জাত উন্নয়নে গবেষণা আরম্ভ/জোরদার করা, (২) গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রোডাক্ট ডেভেলেপমেন্ট বিভাগ/শাখা স্থাপন করা ও দক্ষ জনবলের নিয়োগ বা পদায়ন, (৩) আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, (৪) বিজ্ঞানী/ল্যাব টেকনিশিয়ানদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, (৫) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং (৬) বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এসব কাজে সম্পৃক্ত করা (পিপিপি)। 

সিমিট এসব কাজে আমাদের অনেক বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা করতে পারে।

এমেরিটাস বিজ্ঞানী ড. কাজী এম.বদরুদ্দোজার স্বপ্ন

এমেরিটাস বিজ্ঞানী, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন  বিজ্ঞানী ড. কাজী এম. বদরুদ্দোজা স্যারের কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই এই প্রতিবেদন লেখা হয়েছে। ৯৮ বছর বয়সেও তিনি কৃষি নিয়ে ভাবেন, সরকারকে বিভিন্ন সময় কৃষি বিষয়ে সুপরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি কর্মজীবনে পাকিস্তান কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে চাকরিকালীন সময়ে ভুট্টার তেল উৎপাদনে সফল হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশেও ভুট্টার তেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এটি তার বর্তমান স্বপ্ন। এজন্য তিনি সরকারের কাছে তার সুপরামর্শ ও সুপারিশমালাও পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি, সিমিটের কাছে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। কাজী স্যারের সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সক্রিয় বিবেচনাধীন আছে বলে জানা যায়।  

প্রতিবেদনে যত সহজভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, বাস্তবে কাজটি অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে, কঠিন মনে হলেও মোটেও তা অসম্ভব নয়। বিশ্বের ৫০টিরও অধিক দেশ বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টার তেল উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই আমাদেরও এই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। 

বাংলাদেশের বাজারেও মূল্যবান ডলার ব্যয় করে বিদেশ থেকে আমদানি করা ভুট্টার তেল পাওয়া যায়। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরিকল্পনামাফিক অগ্রসর হলে আমরাও ভুট্টার তেল উৎপাদনে সফল হব। তাহলে আর বিদেশ থেকে ভুট্টার তেল আমদানি করতে হবে না, বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে। 

আমরাও কি ভুট্টার তেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন এবং রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বপ্ন দেখতে পারি না?


ড. আবুল কালাম আযাদ 

সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট, ঢাকা ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর।

ড. কাজী এম.বদরুদ্দোজা

এমেরিটাস সাইন্টিস্ট, জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম (নার্স)


প্রকাশিত মতামত ও তথ্য লেখকদের নিজস্ব। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।