কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও দেখে দ্রবীভূত হয়েছিল আমাদের হৃদয়। একটা ছোট্ট হাতির বাচ্চা গর্তে পড়ে গিয়েছিল। কাদা-মাটি ভরা গর্তে পড়ে যাওয়া বাচ্চাটাকে কোনোভাবেই তুলতে না পেরে মা হাতিটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটালো। সে গিয়ে ওই সরু গর্তের ওপর মাথা নিচু করে উবু হয়ে পড়ে গেল যেন ভেতরে থাকা তার বাচ্চাটা মায়ের স্তন থেকে দুধ খেতে পারে। সেভাবেই সে পড়ে থাকলো টানা তিন দিন। বাচ্চাটা মায়ের স্তন থেকে দুধপান করে বেঁচে রইল সেই গর্তে। পরবর্তীতে উদ্ধারকারীরা এসে বহু কষ্টে গর্তের মুখ থেকে সরিয়ে আনতে পারলেও ততক্ষণে হার্টবিট বন্ধ হয়ে যায় হাতিটার।
একদিকে তার হার্টবিট ফেরানোর চেষ্টা, অন্যদিকে তার বাচ্চাটাকে গর্ত থেকে তোলার চেষ্টা- সবমিলিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর দীর্ঘসময় পর অবশেষে বাচ্চাটাকে তোলা সম্ভব হয়, মা হাতিটা চেতনা ফিরে পায়। পেয়েই তাৎক্ষণিক লাফ দিয়ে উঠে বাচ্চাটাকে আগলে ধরে মা, তারপর তাকে নিয়ে চলে যেতে থাকে বনের দিকে। ভিডিওটার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল জঙ্গলে ঢোকার আগে মা হাতিটা একবার পেছনে ঘুরে ফিরে তাকিয়ে তার শুঁড়টা তুলে ধন্যবাদ জানায় উদ্ধারকারী দলকে। যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে তাকে এবং তার সন্তানকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য।
এই প্রবল সংবেদনশীল ও শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ বুদ্ধিমান প্রাণীটির কাছ থেকে এ ধরনের কৃতজ্ঞতা কিংবা আবেগের বহিঃপ্রকাশ খুবই স্বাভাবিক। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এই প্রাণীটির ওপর চলে নিদারুণ অত্যাচার ও নির্যাতন। গত কয়েকদিন আগেই যার নিষ্ঠুর এক উদাহরণ দেখতে হলো আমাদের। একটা ফুটফুটে হাতির বাচ্চা। তাকে এবং তা মা'কে রাজধানীর উত্তরার কোর্টবাড়ি এলাকায় রেললাইনের পাশে চাঁদাবাজি করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল গত বুধবার (১৭ মে )। চট্টলা এক্সপ্রেস চলে আসায় ট্রেনের ধাক্কায় নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে বাচ্চাটা। ট্রেনের হুইসেল পেয়ে মাহুত মা হাতিকে সরিয়ে নিতে পারলেও বাচ্চাটা রেললাইনের ওপর চলে আসে, ১০০ মিটার দূরত্বে আচমকা লাইনের ওপর হাতির বাচ্চাকে দেখে ট্রেনচালক ট্রেন থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বাচ্চাটাকে ধাক্কা দেয় ট্রেন, ছেঁচড়ে অনেকদূর নিয়ে যায়। ক্ষত-বিক্ষত বাচ্চাটার ডান পা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়, লাইন থেকে সরিয়ে পাশের একটা খোলা জায়গায় নিয়ে রাখা হয় বাচ্চাটাকে। সেখানে সে পড়ে ছিল পরের ৯ ঘণ্টা, না বন বিভাগ; না দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ, কেউই আসেনি! হাতির মাহুত মা হাতিকে নিয়ে পালিয়েছে বহু আগেই!
হাতির বাচ্চাটার মৃত্যুর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পরবর্তীতে শোকাভিভূত ট্রেন চালক লোকোমাস্টার কাওছার হোসেন বলেন, “চলন্ত ট্রেনের সামনে হাতি চলে আসবে কল্পনাতেও ছিল না, হাতি বন্য প্রাণী, বন্য প্রাণী কেন রেললাইনে আসবে? হাতির তো লোকালয়ে আসারই কথা না।' কাওছারের প্রশ্নটাই যেন প্রবল হয়ে ধাক্কা মারে আমাদের চিন্তা-চেতনায়। জগতের অন্যতম প্রকান্ড রাজকীয় চেহারার সুন্দর ও বুদ্ধিমান প্রাণী হাতি, যার থাকার কথা অরণ্যে তার গোত্রের সঙ্গে, সে কেন ব্যস্ত শহরে শেকলবন্দী অবস্থায় দ্রুতগতির ট্রেনে ধাক্কা খেয়ে ছেঁচড়ে করুণ মৃত্যুবরণ করবে? বনের হাতি শহরে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে এক বিষাদময় হতাশার আশ্চর্য গল্প। একুশ শতকের এই সভ্য যুগেও আজকের বাংলাদেশে হাতিদের ব্যবহার করা হচ্ছে চাঁদাবাজির কাজে। দিনের পর দিন প্রশিক্ষণের নামে যন্ত্রণাদায়ক অত্যাচার আর নির্যাতনে এই ম্যাজেস্টিক প্রাণীটাকে শিকলে আটকে ভয় দেখিয়ে শেখানো হয় জনসাধারণকে ভয় দেখিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে চাঁদা আদায়ের নানা কলাকৌশল। এই ভয়াবহ অপরাধ করার আইনসম্মত লাইসেন্স দিয়ে এতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব পালন করে বন বিভাগ। বেদনাদায়ক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত বিভিন্নজনের কাছে বনবিভাগ যতগুলো হাতির লাইসেন্স দিয়েছে, সেসব হাতি কী অবস্থায় কেমন আছে সে ব্যাপারে বনবিভাগ আর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি।
এই বিস্ময়কর তিক্ত অমার্জনীয় উদাসীনতা আরেকবার প্রকট হয়ে ওঠে উত্তরায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হস্তীশাবকের বেলায়। রেলওয়ে পুলিশের এস আই আলী আকবরের ভাষ্যমতে ঘটনার আট ঘণ্টা পরেও রাত ১০টা পর্যন্ত বন বিভাগের কারও উপস্থিতি দেখা যায়নি। অথচ অসহায় এই প্রাণীগুলোকে পালার লাইসেন্স দেওয়ার নামে এভাবে অত্যাচারের মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রধান কুশীলব বন বিভাগের উচিত ছিল সবার আগে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। কিন্তু তাদের একেবারেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য লাইসেন্স দেওয়া হাতি কোথায় আছে, কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, হাত বদল হচ্ছে কিনা- এসব মনিটর করার দায়িত্ব বন বিভাগের হলেও গত কয়েক দশকে বন বিভাগ যে আদৌ কোনো দায়িত্ব পালন করেনি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পরদিন তারা সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিতে পারায়!
হাতির নির্মম মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন পরদিন বন ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। Captive (বন্দি) হাতির ওপর নির্যাতন ও বন বিভাগ কর্তৃক লাইসেন্সকৃত হাতি দিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি ছিল এই কর্মসূচির মূল প্রতিপাদ্য। সেখানে তাদের কাছে এখন পর্যন্ত যতজনকে হাতির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে সেটার তালিকা আছে কিনা জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক জানান, তাদের কাছে আপডেটেড তথ্য নেই, জানাতে জুন মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময় লাগবে। লাইসেন্স দেওয়া হাতিগুলো কে কোথায় কিভাবে আছে তার বেশিরভাগেরই কোনো খোঁজ তারা জানেন না। ক্যাপ্টিভ হাতিগুলোর ওপর নির্যাতনের যতগুলো ঘটনার ওপর রিপোর্ট হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগের বেলাতেই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ট্রেনে কাটা পড়া হাতির মাহুতকেও তারা খুঁজে বের করার ব্যাপারে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
ব্যাক্তি মালিকানায় হাতি পালনের লাইসেন্স নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সেই হাতিকে চাঁদাবাজির প্রশিক্ষণ দিয়ে শহরের সর্বত্র জনসাধারণের কাছ থেকে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এটা মোটামুটি “ওপেন সিক্রেট”। অথচ এসব প্রতিরোধে বন বিভাগের নেয়া একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা হচ্ছে ২০১৯-এ র্যাবের সহায়তায় চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত দুটো হাতি এবং তাদের মাহুতকে আটক করা। এছাড়া তাদের আর কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে লাইসেন্স করে দেওয়া হাতির তালিকাটাও যদি বন বিভাগের কাছে সম্পূর্ণ গোছানো অবস্থায় থাকতো এবং সেই তালিকা অনুযায়ী হাতিগুলোর গায়ে মাইক্রোচিপিং করা থাকতো, তাহলে ট্রেনে কাটা পড়া হাতি শাবকের মালিককে খুঁজে বের করতে বনবিভাগের খুব বেশি সময় লাগতো না। তালিকা হাতে নিয়ে যেখানে যেখানে হাতি রয়েছে সেখানকার ফরেস্ট অফিসারদেরকে বললেই তারা খোঁজ দিয়ে দিতে পারতো।
চলুন এক নজরে দেখে আসি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ধারা ১১ এর উপধারা ২ অনুযায়ী ব্যাক্তিমালিকানায় কোন প্রাণীকে পালন করতে নেওয়ার পূর্বশর্তগুলো-
“লালন-পালনযোগ্য বন্যপ্রাণীর জন্য নিবন্ধন সনদ ইস্যুর পূর্বে নিশ্চিত হইতে হইবে যে, আবেদনকারী আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং উক্ত বন্যপ্রাণী লালন-পালনের জন্য ক্ষেত্রমত, প্রয়োজনীয় স্থান, জলাধার, পরিবেশ, ফিডিং স্পট ও পরিচর্যাকারী লোকবল, লালন-পালন সম্পর্কে জ্ঞান ও সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রহিয়াছে।“
এই আইনের ধারা ২৪ এবং ধারা ২৫ এ বন্যপ্রাণী প্রতিপালনের জন্য প্রদেয় লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়া রয়েছে, যেটা ইতমধ্যেই শোচনীয়ভাবে বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কারণ আমাদের দেশে হাতি লালনপালনের জন্য লাইসেন্স নিয়ে মূলত শুরু থেকেই একের পর এক নির্দয় আচরণ করা হতে থাকে। সাধারণত শৈশব থেকেই মা হাতির কাছ থেকে শাবককে ছাড়িয়ে নিয়ে নির্মম অত্যাচারের মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাতির মাহুত চাঁদাবাজির সময় একটি ধাতব হুক হাতে নিয়ে বসে থাকে। যা দিয়ে সে হাতির শরীরের বিভিন্ন দুর্বল স্থানে আঘাত করে চাঁদাবাজিসহ মানুষের উপর চড়াও হতে বাধ্য করে। হাতিশাবক বা মা হাতির ব্যথায় বাধ্য হয়ে যেটা নির্দেশ করা হয় সেটা করে এবং শহরের রাস্তায় আচমকা হাতি দেখে জনমনে আতংকের সৃষ্টির পাশাপাশি অনেকেই মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও ভয়ে এবং বিব্রত হয়ে টাকা-পয়সা দিতে বাধ্য হন। এই অন্যায় চাঁদাবাজির চক্র চলে আসছে বছরের পর বছর।
পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রশ্নের জবাবে প্রধান বন সংরক্ষক যৎসামান্য কিছু আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন। যার মধ্যে আছে লাইসেন্সকৃত হাতির তালিকাটি এ বছরের জুনের ১৫ তারিখের মাঝে প্রকাশ করা, ভবিষ্যতে দলছুট বা মা হারা অথবা লাইসেন্স বাতিল করে জব্দ করা কোনো হাতি যদি পাওয়া যায়, তাদের নিরাপদ রাখার জন্য সিলেটে একটি হাতির অরফানেজ করার প্রস্তাব প্ল্যানিং কমিশনে জমা দেয়া ইত্যাদি। কিন্তু অপরদিকে হরিণ ও হাতি লালন-পালন বিধিমালা ২০১৭ বাতিল করা, নতুন করে কোনো হাতিকে লাইসেন্স না দেওয়া এবং বন্দী হাতিদের জব্দ করে বাংলাদেশে একটি হাতির অভয়ারণ্য তৈরি করার বিষয়ে তেমন কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি প্রধান বন সংরক্ষক।
মৌলভীবাজারকেন্দ্রিক ৫০ টি সিন্ডিকেট অবৈধ ইজারা নিয়ে সারাদেশে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট চালাচ্ছে যাদের হাতে আনুমানিক ৯৬টি হাতি এখনো বন্দি আছে। এই বন্দিত্বের লাইসেন্স দেওয়া কর্তৃপক্ষ হিসেবে বন বিভাগ কোনোভাবেই তাদের দায় এড়াতে পারে না। অবিলম্বে হাতিদের পুরোনো সকল লাইসেন্স বাতিল করে সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে বন্দি হাতিদের উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করতে হবে। আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে হাতিদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাদের দিয়ে চাঁদাবাজি করা সিন্ডিকেটগুলোকে। এই কর্মযজ্ঞে বনবিভাগের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
শেকলে বাঁধা দড়িতে আটকানো অসহায় হাতির বাচ্চাটার মৃতদেহের জায়গায় নিজের সন্তানকে একবার ভাবতে চেষ্টা করুন তো! পারছেন? যদি অসম্ভব মনে হয় তবে আজই হাতি রক্ষায় সর্বস্তরের সবাই সোচ্চার হোন, আওয়াজ তুলুন। প্রাণীদের ওপর এই বর্বরতা বন্ধ হতেই হবে!
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।