‘‘জীবন থেকে আমি একটা শিক্ষাই পেয়েছি। বাঁচতে হলে বাঁচার মতো করে বাঁচব। আমরা যাকে বলি বেঁচে থাকা, সে গল্প মহাবিশ্বজুড়ে একটাই। একদিন সবাই বুঝতে পারে, বেঁচে থাকাই জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আর জীবন মানেই সেই শ্রেষ্ঠ উপহারকে আঁকড়ে ধরে রাখার নিরন্তন চেষ্টা’’-কথাগুলো একটা নাটকের।
নাটকের মতোই জীবনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক নিরন্তন চেষ্টা করে যাচ্ছে সনদবিহীন এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। মুক্তিযোদ্ধার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে পরিবারটি। যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে পরিবারটি তার আর ঘরে ফেরা হয়নি। হয়ত আর কখনও ঘরে ফেরা হবে না।
১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে বীজ বপন করে তা ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়।
বিজয়ের অনুভূতি সবসময় আনন্দের ও সম্মানের। তবে বাংলাদেশে বিজয় দিবস, স্বাধীনতার মাস, মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে উপহাস, অসম্মান বা অবহেলা কম হয়নি এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করা যায়নি আজও। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে আজও বিভক্ত আমরা। এর চেয়ে গ্লানিকর আর কী হতে পারে!
অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তছনছ হওয়া দেশ জাপান আজ মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়েছে, পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিয়েছে। এর মূলে আছে দেশপ্রেম। এই দেশপ্রেম তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছে, এনে দিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি।
বলছিলাম একজন সনদবিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা। নাম আব্দুল মালেক। চুয়াডাঙ্গা জেলার গাটঘাইট গ্রামের মহব্বত আলী বিশ্বাসের সন্তান তিনি। মালেক আর চুন্নু দুই ভাই। তারা রক্তের ভাই নন। পিতা মহব্বত আলী বিশ্বাস এক পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের জনক। জমি-জায়গা বেশ ভালোই ছিল। মালেক আপন আর চুন্নু পালিত পুত্র। মালেককে জিজ্ঞেস করা হলে, চুন্নু তার আসলে কী? জবাবে মালেক বলতেন, “তিনি আমার ভাই। না, তার চেয়ে বেশি কিছু। তিনি সারাক্ষণ আমার সাথে থাকেন। আমি জানি না, তিনি কে...তিনি আমার সাথী।”
সন্তান পড়ালেখা করে বড় হবে কিন্তু জমি-জায়গা কে দেখভাল করবে? এ ভেবে একজনকে দত্তক নেওয়ার কথা ভাবলেন বাবা মহব্বত আলী বিশ্বাস। চুন্নুকে খুব সহজেই দত্তক নিলেন তিনি। ওই সময় সন্তান দত্তক নেওয়ার অত কঠোর আইন ছিল না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালেক আর চুন্নুর মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন আরও গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। দেখে মনে হতো যেন যমজ তারা। শৈশবে তাদের মধ্যে খুব কমই মারামারি হয়েছে। মালেক বুঝতেন, চুন্নুকে তাদের মা-বাবা বিশেষ আদর-যত্ন করেন। তবু কখনও তার মনে ক্ষোভ জন্মেনি। মহব্বত আলী বিশ্বাসের নানারকম চেষ্টা থাকলেও ছেলে আব্দুল মালেকের পড়ালেখা বেশিদূর এগোয়নি। এরই মধ্যে মালেক বিয়ে করেন। সংসারের প্রতি উদাসীন মালেকের গানবাজনা বা এখান-সেখানে ঘুরতেই ভালো লাগে।
হঠাৎ শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। বদলে গেল অনেক কিছু। বাবা-মার বাধা উপেক্ষা মালেক যুদ্ধে যান। দেশের জন্য তিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সময় তিনি শ্বশুরবাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতেন। শ্বশুরও তাকেসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। এতে তার পাশাপাশি শ্বশুর-পরিবারের লোকজনও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের রোষানলে পড়েন এবং হেনস্থার শিকার হন। নামে-বেনামে চিঠিপত্র লিখে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো শ্বশুরকে। যুদ্ধের মাঝামাঝি একবার খবর আসে মালেক যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার এক নিকটাত্মীয় দামুড়হুদার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যান। সেখানে একজন মিলিটারি সেনাকে জিজ্ঞাসারত অবস্থায় দেখতে পান মালেককে। ওইদিন রাতেই শ্বশুরবাড়ি ফিরে পরিবারের সাথে দেখা করেন মালেক।
পাকিস্তানি সেনার কাছ থেকে যাবতীয় তথ্য নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আজ অনেকে নকল কাগজপত্র তুলে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছেন এবং নানারকম সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু মালেকের মতো অনেকে তখন মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন নি। তবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করা জরুরি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকে ঘরে ফিরেছেন, পরিবারকে আগলে রেখেছেন। কিন্তু মালেকের ঘরে ফেরা হয়নি। স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা মালেকের সন্তানেরা অনেকটা অযত্ন-অবহেলায় নানা বাড়িতে বড় হতে থাকে। নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধার মেয়েদেরকে পাত্রস্থ করতে গিয়ে অনেকাটায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয় নানাকে। পাত্রপক্ষরা কন্যার বাবার পরিচয় জানতে চান। নানা এসব প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বস্তি বোধ করেন, ক্লান্তবোধ করেন। তারপরও নাতনিদের এসব বিষয় বুঝতে দেন না তিনি। বরং তারা যে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এটা নিয়েই নানা গর্ব করতে পছন্দ করেন। নানার মুখে ’৭১ এর মুক্তিযোদ্বাদের গল্পে শুনে নাতনিরা তাদের মানসপটে হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খোঁজে। ৫২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবার স্মৃতিকে মনে করার চেষ্টা করে। মেয়েদের এ আকুতিতে মায়ের চোখ, নানার চোখ ভিজে যায়।
নানারকম অভাব-অনটন ও পারিবারিক সমস্যার মধ্যে তিনিই সন্তানের বাবা তিনিই মা-এ পরিচয়ে মেয়েদেরকে বড় করেন এবং পাত্রস্থ করেন।জানা যায় আশির দশকের মাঝামাঝি মালেক দেশ ছেড়ে ভারতের আজমির শরিফে যান। প্রায় দশ বছর সেখানে বসবাস করার পর নব্বই দশকের মাঝামাঝি কোনো একসময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন বলে কথিত আছে। সনদবিহীন এ মুক্তিযোদ্ধার কপালে রাষ্ট্রীয় সম্মান জোটেনি।
মুক্তিযুদ্ধের আজ প্রায় ৫২ বছর পার হলো। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেতে মালেকের ছেলে-মেয়েরা সব রকমের আবেদন নিবেদন করে ব্যর্থ হয়েছে। যে কয়টি ডকুমেন্ট লাগে একটি বাদে সবই জমা দিয়ে আবেদন করেছে। কিন্তু সরকারি অনুমোদন পায়নি। তার সহযোদ্ধারাও এগিয়ে এসেছেন, সাক্ষী দিয়েছেন, কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন-সেগুলো বিস্তারিত জানিয়েছেন। তারপরও আব্দুল মালেককে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এতক্ষণ লিখলাম মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প।
আরেকটি সত্যি গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি। ছোট ছিলাম তাই মুক্তিযুদ্ধ করা হয়নি। তবে স্পষ্ট মনে আছে, পাশের গ্রাম বিষ্ণুপুরে রাজাকার ধরা পড়েছে। সবাই দেখতে যাচ্ছে। আমরাও একদল দামাল ছেলে যাচ্ছি। লাল ইটের তৈরি কাচারি ঘরের সামনে পিঠমোড়া করে বাঁধা আছে এক রাজাকার। মারধর করা হয়েছে আচ্ছামতো। সবাই তার মুখে থুতু দিচ্ছে। আমরাও দিলাম। এরপর একরকম তৃপ্তির আনান্দ নিয়ে ঘরে ফিরলাম। এতদিন পরে এসেও মনে হচ্ছে আমাদের অনেক কিছু অজানা আছে, ভুল জানা আছে। তাই সঠিক ইতিহাস জানা দরকার। সঠিক ইতিহাস কেবল দিতে পারে সঠিক নির্দেশনা। আর সে নির্দেশনার এক নম্বরটি হতে পারে, দেশকে ভালোবাসা যেমনটি ভালোবাসি আমরা আমাদের মা’কে।
প্রক্টর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়