বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবলই একটি নাম নয়; এক তেজোদীপ্ত তর্জনী, একটি স্বাধীনতা, একটি মানচিত্র কিংবা একটি সার্বভৌম দেশ। জীবনের প্রতিটি ধাপে আদর্শ, সততা ও দেশের মানুষের জন্য অসীম ভালোবাসাই ছিল যার নেশা ও পেশা। একজন মুক্তিসংগ্রামী এবং মহান রাজনীতিবিদ হিসেবে যিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এ মহান স্থপতির দেশ্রপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীনতায় মুগ্ধ হয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দরা কখনো তাকে রাজনীতির কবি আবার কখনো বিশ্ববন্ধু উপাধিতে আখ্যায়িত করেন।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ লুৎফর রহমান ও সায়রা বেগম দম্পতির ঘর আলোকিত করে শেখ মুজিবের জন্ম হয়। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া সহজ-সরল, অতি সাধারণ এই শিশুটিই যে একদিন বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিবেন তা বোধহয় আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন তার নানা শেখ আব্দুল মজিদ। তাইতো তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম রাখার সময় বলে যান, "মা সায়রা, তোর ছেলের নাম এমন রাখলাম যে নাম একদিন জগৎ জোড়া খ্যাত হবে।"
গ্রামীণ নিভৃত পরিবেশেই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন শেখ মুজিব। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বাইগার নদীবেষ্টিত টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, "বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে ছবির মতো সুন্দর একটি গ্রাম। সে গ্রামটির নাম টুঙ্গিপাড়া। বাইগার নদী এঁকে-বেঁকে গিয়ে মিশেছে মধুমতী নদীতে। এই মধুমতী নদীর অসংখ্য শাখানদীর একটি নদী বাইগার নদী।"
ব্যক্তি জীবনে শিল্প-সাহিত্যের গভীর অনুরাগী ছিলেন তিনি। নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করতেন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্র, নজরুল কিংবা বার্নার্ড শ’র বই। ভূরাজনীতি ও বিশ্ব ইতিহাস নিয়ে খুব গভীরভাবে অধ্যয়ন করতেন তিনি। পাশপাশি শৈশব থেকে ছিল পত্রপত্রিকা পড়ার অভ্যাস।
এজন্যই হয়তো মুগ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন, “১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন কিন্তু আমার মার অনুরোধে এ বই কয়টা আব্বা কখনো দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলি, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ড শ’র কয়েকটি বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। জেলে কিছু পাঠালে সেন্সর করা হয়, অনুসন্ধান করা হয়, তারপর পাশ হয়ে গেলে সিল মারা হয়। পরপর আব্বা কতবার জেলে গেলেন তার সিল এ বইগুলোতে ছিল। মা এ কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন।”
এদেশের শোষিত-বঞ্চিত-দুখী মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু নিজ জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। সন্তান জন্মের সময় থাকতে পারেননি স্ত্রীর কাছে। নিজ সন্তানদেরকে দিতে পারেননি খুব বেশি একটা সময়। সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারায় নিজে ভেতরে ভেতরে কিছুটা কষ্টও পেলেও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ত্যাগ করেছিলেন ব্যক্তিগত ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়াসহ সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তাই এসব আবেগ-অনুভূতি লিপিবদ্ধ করতে প্রায়ই হাতে নিতেন কাগজ - কলম। পিতৃত্বের অনুভূতি বর্ণনা করে গিয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, “কয়েকমাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভালো করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলেমেয়ের পিতা হয়েছি।”
শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনকাল সবসময়ই শেখ মুজিব ছিলেন নিপীড়িত বাঙালি জনগনের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের পক্ষে সোচ্চার। রাজপথে বজ্রকন্ঠে হুশিয়ার ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের মাধ্যমে তার পদচিহ্ন রেখে গিয়েছেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে। যার সূচনালগ্ন হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে পরে তিপান্নে যুক্তফ্রন্ট গঠন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্ন'র সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টি'র শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টি'র ছয়দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং সবশেষে একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে।
৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের পতন ঘটে। সেসময়ই বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারি চিন্তায় স্বাধীনদেশ হিসেবে “বাংলাদেশ” নামের বীজ রোপিত হয়। ৬৯ এর ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম হবে বাংলাদেশ।”
এভাবেই একে একে গ্রীষ্ম,বর্ষা পেরিয়ে গিয়ে শীতের রুক্ষতায় চারদিক যখন অমলিন ঠিক তখনই পূর্ব বাংলায় এক পশলা স্নিগ্ধতার আবির্ভাব নিয়ে এলো ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। এতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলে দেশের আপামর জনতা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যখন ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করে তখন বঙ্গবন্ধুর মতো বিচক্ষণ নেতার বুঝতে আর কিছু বাকি রইলো না।
এর পরেই আবির্ভাব হয় অগ্নিঝরা মার্চের। একাত্তরের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু দিলেন সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। এই একটি ভাষণেই বাঙালি হয়ে উঠল স্বাধীনতাকামী। পাল্টে দিল পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠীর এদেশের মানুষের প্রতি অবহেলা, অত্যাচার ও অন্যায়ের তেইশ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বললেন, "তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।" দিলেন সেই কালজয়ী ঘোষণা "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
আজ ১৭ মার্চ বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মদিন। আজ থেকে প্রায় ৫৩ বছর আগে একাত্তরের ১৭ মার্চ ছিল এই মহান নেতার ৫১তম জন্মদিন। স্বাধীন দেশের স্বপ্নে মগ্ন বাঙালি জাতির সামনে ৭১ এর এই দিনটি ছিল এক ঐতিহাসিক দিন।
সেদিন ছিল দেশব্যাপী চলা অসহযোগ আন্দোলনের ১৬তম দিন। এদিন সকালে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তৃতীয় দিনের মতো আলোচনায় বসেন। আলোচনার টেবিলে বঙ্গবন্ধু জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে অবিচল থাকেন। অন্যদিকে ইয়াহিয়া খান তা অস্বীকৃতি জানালে ঘন্টাখানিকেত ব্যবধানে আলোচনা ভেঙে যায়। বৈঠক শেষে ধানমন্ডির বাসভবনে ফিরলে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আসা বিদেশি সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, “আজ আপনার জন্মদিন, জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী?”
উত্তরে বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি বলেন, “এদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তি।”
সেদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথনে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন, মুক্তিকামী জনগনের প্রতি অসীম ভালোবাসা আবারও ফুটে ওঠে। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে তিনি বলেন, “আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কী, আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।”
বঙ্গবন্ধু জানতেন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে চক্রান্ত তাতে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন, তবে তার একটাই ইচ্ছে ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই সে নিজ জীবনের প্রতি মায়া তুচ্ছ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে কোনো আপোষ করেননি, সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। এসময় বাংলার উর্বর মাটি ও সহজ-সরল ও পরিশ্রমী মানুষের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সব কিছুই আছে। বাংলার অবারিত মাঠ, উদার আকাশ, উর্বর পলির নদী, সোনালি ফসল পাট, ইক্ষু, তামাক, চা, মিঠাপানির মাছ, সুপেয় জলাধার, বিরাট কর্মক্ষম জনশক্তি, এসবই আছে আমাদের। আমরা চাই শুধু ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অবসান। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই।”
আপামর জনতার ভালোবাসার সামনে তার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ ছিল। এদেশের জনগনের সমর্থন ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে সেদিন তিনি আরও বলেন, “সাত কোটি মানুষ আজ আমার পেছনে পাহাড়ের মতো অটল। আমার জনগণ আমাকে যা দিয়েছে তার তুলনা নাই।”
এছাড়া সেদিন বঙ্গবন্ধু তার জন্মদিনের বার্তা হিসবে এক টুকরো ক্ষুদে বার্তা কাগজে লিখে পাঠান। সেখানেও ছিল স্বাধীনতার ডাক, বাংলার মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান।
চিরকুটে তিনি লিখেন, "বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্যে আমাদের আজকের এই সংগ্রাম। অধিকার বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। বুলেট বন্দুক বেয়নেট দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আর স্তব্ধ করা যাবে না। কেননা জনতা আজ ঐক্যবদ্ধ। লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দুর্গ। আমাদের দাবী ন্যায় সংগত তাই সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।
জয় বাংলা
শেখ মুজিবুর রহমান, ১৭.৩.৭১। "
দেশপ্রেমে মগ্ন বঙ্গবন্ধুর কাছে জন্মদিন কোনো বিশেষ দিন ছিল না। মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন ৪,৬৮২ দিন। দেশ স্বাধীনের আগে নিজ জীবনের আটটি জন্মদিন তার জেলেই কেটেছে। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের কাউকেই দিতে পারেননি নিজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো। তার অস্থিমজ্জায় শুধুই দেশের মানুষের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা ছিল। তাইতো কেবল নিজ সন্তানের পিতাই নয়, আজ তিনি পরিচিত জাতির পিতা হিসেবে। এদিনটি ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে চিরকাল।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।