বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠানে 'উইচ হান্টিং' বন্ধ হোক

বিগত বছরগুলোতে দেশের ছোট বড় নানান প্রতিষ্ঠানে সরকারি পরিচয় কাজে লাগিয়ে অনেকেই সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু এদের বাইরেও দেশের ভালোবাসায় অন্তপ্রাণ কিছু মানুষ কাজ করেছে নীরবে, নিরলস। এই মানুষগুলোর কেউ কেউ কখনো কখনো কোনো পদবী পেয়েছেন, বা তাদেরকে অনেক সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কোনো না কোনোভাবে। দলান্ধ মানুষের মাধ্যমে দেশের ক্ষতি যেমন হয়েছে, তেমনি দেশপ্রেমিক কিছু মানুষ সিস্টেমের ভেতরে থেকেই দেশকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরির কথা প্রনিধানযোগ্য। পদ্মা সেতু প্রকল্পে তার নেতৃত্ব দেশকে আরও অপচয় কিংবা আরও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে- এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাদের অনেকেই যখন কোনো জায়গায় অবদান রাখার সুযোগ পাননি, সেই সময়েও কিছু মানুষ দেশের সেবা করেছেন- রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে থেকেই, কেবল পেশাদারিত্বের কথা মাথায় রেখে। দীর্ঘ পনের বছরের বেশি সময় ধরে যখন একটি দল ক্ষমতায় থাকে, দেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধান যখন কাউকে বিশেষ কোনো দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ডাকেন, যখন আহ্বান করেন কারো পেশাগত দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য, তখন দেশের জন্য হলেও সাড়া দেওয়া প্রয়োজন হয়। 

দেশের ভালো মানুষগুলো ওই সময়ে কিছু জায়গা না পূরণ করলে সে জায়গাগুলো খালি থাকতো না, নিশ্চয়ই দলান্ধ কিংবা দুর্নীতিপরায়ণ কেউ কেউ জায়গাগুলো দখল করতো। তাতে দেশের ক্ষতিই হতো বেশি। 

এই সময়ে এসে আমরা দেখছি,  এই বাস্তবতা অস্বীকার করে আগের সরকারের সাথে যুক্ত অনেক যোগ্য ব্যক্তিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।  সবচেয়ে বড় কথা এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থকে অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকার পতনের পরপরই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকাদের অপমানজকভাবে পদত্যাগ করানোর হিড়িকের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্কুল বা কলেজের শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেষারেষি বা স্থানীয় প্রভাবশালী/ম্যানেজিং কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিজেদের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছে কেউ কেউ। বিষয়টি বুঝতে পেরে কয়েক জায়গায় শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে শিক্ষকদের ফিরিয়ে এনেছে ক্ষমা চেয়ে। 

একই রকম ঘটনা পরবর্তীতে আরো দেখা গেছে দেশের বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠানে। বিশেষকরে ডিজি হেলথ-এর মহাপরিচালক পদে অধ্যাপক রোবেদ আমিন-কে যোগদান করতে দেওয়া হয় নি, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি বড় দুর্ভাগ্য। তিনি আগের সরকারের আমলে দেশের স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন- একথা তার চরম শত্রুরাও স্বীকার করবে। বর্তমান অরাজনৈতিক সরকারে তিনি আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সরিয়ে দিতেই হয় রাজনৈতিক কারণে। আমাদের স্বাস্থ্যখাতের জন্য এটি একটি বড় ধরনের ক্ষতি। বিষয়টিকে চলমান পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরিকে সরিয়ে নিলে যেমন হতো, তার সাথে কিছুটা হলেও তুলনীয়। 

বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তৈরি হতে সময় লাগে, এর সাথে রাজনৈতিক পরিচয় বা বিশ্বাসের সম্পর্ক নেই। যেকোনো সরকারেরই উচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে গিয়ে বিশেষজ্ঞদের দেশের কাজে লাগানো। আমাদের দেশের এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি আছে এমনটাও নয়। তাদের নতুন দেশ গড়ায় সুযোগ দেওয়া না হলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। 

কিন্তু বেশ খানিকটা সময় পাড় হলেও আমরা দেখছি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে এখনো পেশাদারিত্ব, প্রতিশ্রুতি এবং যোগ্যতাকে সবার আগে স্থান দেওয়া যাচ্ছে না। আগের সরকারের কোন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকলে সেই পরিচয় টেনে আটকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অভিভাবকহীন করে রাখছে মাসের পর মাস। এ যেন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে উইচ হান্টিং (witch-এর প্রবণতা। মধ্যযুগে যেমন একটু বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন নারীদেরকে ডাইনি (witch) উপাধি নিয়ে তাদের খুঁজে বের করে (hunting) আগুনে পোড়ানো হতো; দেশের বিশেষজ্ঞদের যেন এখন স্বৈরাচারী সরকারের সহযোগী প্রমাণ করে সেভাবেই সরিয়ে দেওয়ার একটা সাজ সাজ রব। সম্প্রতি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি-র মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়ে এমন একটি বিষয় পুরো বায়োটেকনোলজি কমিউনিটি-কে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। 

জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে আধুনিক শাখা জীবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি-র শীর্ষ প্রতিষ্ঠান-  ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, যা সংক্ষেপে NIB নামে সকলের কাছে পরিচিত। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘকাল পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি দেশের জীবপ্রযুক্তিবিদদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, দেশকেও প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারেনি।

গত ১৫ নভেম্বর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি(NIB)-এর মহাপরিচালক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি  ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শাহেদুর রহমান-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

অধ্যাপক শাহেদ দেশের সকল জীবপ্রযুক্তিবিদদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত নাম। একজন মানুষ কতটা নিবিষ্টমনে এবং নিঃস্বার্থভাবে তার কমিউনিটির জন্য কাজ করতে পারেন, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অধ্যাপক শাহেদুর রহমান। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিষয়ের প্রথম দিকের গ্রাজুয়েট তিনি। অধ্যাপনা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি নিরলসভাবে বিগত বছরগুলোতে তরুণ জীবপ্রযুক্তিবিদ-দের জন্য বিভিন্ন মহলে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। জীবপ্রযুক্তির মতো আধুনিক একটি বিষয় এই দেশে প্রচণ্ড বঞ্চনার শিকার। বিসিএস থেকে শুরু করে সরকারি নানান চাকুরিতে জীবপ্রযুক্তিবিদদের অংশগ্রহণকে এখনো যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এইসব বৈষম্য নিরসনে কাজ করার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ এ্যসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্রাজুয়েটস-(BABG), যা নানান প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি দৃশ্যমান সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যাায়, অধ্যাপক শাহেদুর রহমান NIB-কে  সত্যিকার অর্থে দেশের জীবপ্রযুক্তির বিকাশে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। তার নিয়োগ সাধুবাদ জানিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি  বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীবৃন্দ বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু একটি মহল সম্প্রতি তার কোন একটি অতীত রাজনৈতিক নির্বাচনের পোস্টারকে সামনে এনে এই নিয়োগ আটকে দেওয়ার পায়তারা করছে। অথচ বিগত ছাত্র জনতার গণ অভ্যূত্থানে অধ্যাপক শাহেদ ছাত্রদের কাতারেই ছিলেন এবং আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। এর প্রমাণ জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিচ্ছে। 

আমি বলবো একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি যদি গত আন্দোলনে যোগ না-ও দিয়ে থাকেন এবং স্বৈরাচারের স্বপক্ষে কোন সক্রিয় ভূমিকা না রাখেন, তাহলে তাকে বর্তমান প্রেক্ষিতে দেশের সেবায় যুক্ত করার উৎকৃষ্ট সুযোগ। সরকারের সিদ্ধান্তগ্রহীতাদের  উচিত পেশাগত 'উইচ হান্টিং'-এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিদের রাষ্ট্রসেবায় নিয়োগে সচেতন প্রচেষ্টা চালানো। অধ্যাপক শাহেদ-দের মতো কেউ বঞ্চনার শিকার না হোক। অবিচার এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে যোগ্যতা ও ন্যায়পরায়ণতার জয়গানই ছিলো ২৪-এর গণ অভ্যূত্থানের প্রাণভোমরা। আমরা যেন তাকে গলা টিপে না মেরে ফেলি।  

ড. মুস্তাক ইবনে আয়ূব, সহযোগী অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: miayub@du.ac.bd
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।