পাঠ-প্রতিক্রিয়া: হলুদ হিমু কালো র‌্যাব

রাজনীতির পটবদলে অন্য বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে জনগণ। সবক্ষেত্রে নতুনের উত্থানে পরিস্থিতি আখ্যায়িত হচ্ছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা নামে। বাংলা সাহিত্যের অতলষ্পর্শী জনপ্রিয় বাদশাহ নামদার খ্যাত প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদও বাংলাদেশ নিয়ে দারুণ আশাবাদী ছিলেন। জীবনকালে বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে নিয়ে নিজের আকর্ষণ গোপন রাখেননি তিনি। ফ্যাসিস্ট ক্ষমতামত্ত জুলুমবাজ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের অভূতপূর্ব সব কৌশলসহ গ্রাফিতিগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত উৎসাহী ভক্ত দেশজুড়ে। পরের প্রজন্ম হলে আজকের নবীনরাও ভক্ত হুমায়ূনের। শিল্প-সাহিত্যের সক্ষমতা নিয়ে তাই প্রশ্ন উত্থাপনের আগে সৃষ্টিশীল নিজে কোন পক্ষে এর পরখ আগে জরুরি। আজ ১৩ নভেম্বর মায়েস্ত্রো হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিবসে তার অজর সৃষ্টি “হলুদ হিমু কালো র‌্যাব”- এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখনীতে এমন কিছু বিষয়ের উত্থাপনা।     

৭০ এর দশকের প্রথমভাগে হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম আবিষ্কার করেন গত শতকের বাংলার অন্যতম মণীষী ও লেখক আহমদ ছফা। ড. আহমদ শরীফ উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন হুমায়ূনের প্রথম দিকের সাহিত্যকর্মের। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের প্রথম স্বীকৃতি এসেছিল “বাঙলাদেশ লেখক শিবির” পুরস্কার অর্জনে। যে লেখক শিবিরে তখন সক্রিয় শক্তিমান কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে রাঢ়বাংলার কল্প রূপকার হাসান আজিজুল হক। অনেকে মনে করেন, লেখক জীবনের পরের দিকে তিনি শুধুমাত্র “বাজারি” ও “সস্তা” সাহিত্যের পথে হেঁটেছেন। শুধু হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সমালোচনা হলে এক ব্যাপার। কিন্তু ক্রমাগত ব্যাপক ব্যক্তিগত জীবনের জন্য আক্রমণের শিকার হয়েছেন এ লেখক।

২০০৬ সালে অন্যপ্রকাশ প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজের ১৫তম বই “হলুদ হিমু কালো র‌্যাব” উপন্যাসে হিমুর অতীন্দ্রীয় নানা কাণ্ড আছে। আছে তার মাজেদা খালা আর খালুকে তুমুল হাস্যরসাত্মক বর্ণনা। উপন্যাসে ঢাকার পার্ক, যৌনকর্মী, মাদক বিক্রিতা, পুলিশী নজরদারি ও শহরের বিবরণসহ বিভিন্ন বিষয় নিজের স্বভাবজাত লেখক ভঙ্গীতে তুলে ধরেছেন লেখক। স্যাটায়ার, ফান তুমুলভাবে বিরাজিত হুমায়ূনের অন্য সৃষ্টির মতো এ বইয়েও। কিন্তু এ উপন্যাসের রাজনৈতিক গুরুত্ব এই ২০২৪ সালের নতুন বাংলাদেশে কম নয়। 

শিল্প, সাহিত্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ বলে কিছু নেই। প্রতিকূলতাই আসল সৃষ্টিমানের পরীক্ষা। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের এ উপন্যাস যারাই পড়বেন তাদেরই মনে হবে সে পরীক্ষায় অনবদ্য সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, স্লোগান, মিছিল, মিটিং, বিবৃতি, কলাম লেখা, টক শো- মোটেই গুরুত্বহীন নয়। কিন্তু সর্বজনের কাছে সহজে পৌঁছার মতো সার্থক একটি সৃষ্টির নজির এ উপন্যাস।

লেখনী দীর্ঘ না করে বরং উপন্যাসের শেষ দিকে হিমুর সাথে বাংলাদেশের দাপুটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতনের আলাপ উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতর তুলে দেওয়া যেতে পারে।

“ . . .

তোমার মধ্যে আমাদেরকে রিডিকিউল করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছি। হোয়াই?

আমি বললাম, আপনারা মানুষের জীবন নিয়ে রিডিকিউল করেন, সেই জন্যেই হয়তো?

শুভ্রের বাবা বললেন (তিনি আপনি আপনি করে বলছেন) আপনি কেন আমাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন না বলুন তো? আপনার যুক্তিটা শুনি। আপনি কি চান না ভয়ঙ্কর অপরাধীরা শেষ হয়ে যাক? ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করতেই হয়। ধ্বংস না করলে এই সেল সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

আমি বললাম, স্যার, মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে। একটা ভ্রুণ মায়ের পেটে বড় হয়। তার জন্য প্রকৃতি কী বিপুল আয়োজনই না করে! তাকে রক্ত পাঠায়, অক্সিজেন পাঠায়। অতি যত্নে তার শরীরের একেকটা জিনিস তৈরি হয়। দুই মাস বয়সে হাড়, তিন মাস বয়সে চামড়া, পাঁচ মাস বয়সে ফুসফুস। এত যত্নে তৈরি একটা জিনিস বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে মরে যাবে- এটা কি ঠিক?

পিশাচের আবার বিচার কী?

পিশাচেরও বিচার আছে। পিশাচের কথাও আমরা শুনব। সে কেন পিশাচ হয়েছে এটাও দেখব।

 . . .”       

গণতন্ত্রের ঘাটতি, দায়হীনতা, বিচারহীনতা, এক পরিবারের শাসন, এক দলের শাসন তো ছিলই। বিশেষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও এমন কী রাষ্ট্রে অনেক অসঙ্গতি এখনও আছে। ক্ষমতার পট বদলে বেরিয়ে আসছে সাবেক শাসকদের ঘৃণ্য যত কর্ম। জুলাই বিপ্লবের আগেই বিশেষ বাহিনীর সাবেক প্রধানের দেশ ছাড়ার খবর প্রকাশ হয়। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে গুম কমিশন। শুরু হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া। আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারে আশাবাদী আজকের বাংলাদেশের জনগণ।

জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নিপুণ কৌশলে সে সময়ে একটি দাপুটে বাহিনীর মোকাবিলায় হিমুর জবানে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। আর তা প্রচার হয়েছে বিপুল মানুষের ভেতর। সমাজ, রাষ্ট্রের রূপান্তরে যারা কাজ করেন তাদেরও শেখার আছে এ উপন্যাসে মূল দিক নির্দেশনা থেকে। সেই সঙ্গে বেআইনী ঘটনার বিচার নিশ্চিতে কোনো বাহিনী প্রধান বা বাহিনী সদস্যের দায় মুক্তির সুযোগ নেই। বৃষ্টি বিলাস ও জোছনা দেখার মতো যাপনের আরও বড় পরিসরের ক্ষেত্র বুঝতে একজন হুমায়ূন আহমেদের কাছে আমাদের ফিরতে হয় এতগুলো অতিক্রান্ত বছর পরও। এমন কারণে এই দিনে ভক্ত মন বলে যায়, "সেলাম, হুমায়ূন!"

ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়। ২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।