ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত হোক ঈদ-উল-আজহা

ঈদ মানে খুশি বা আনন্দ। দুনিয়াজুড়ে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। বাংলাদেশের মুসলমানরাও সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-আজহা।

ঈদ-উল-আজহা (কোরবানির উৎসব) মুসলিম ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসবটি নবি ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে তার পুত্রকে উৎসর্গ করার ইচ্ছাকে স্মরণ করে। আল্লাহর আদেশে নিজ পুত্র ইসমাঈল আলাইহি  ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর জন্য কুরবানি করার হযরত ইব্রাহিম (আ:) এর ইচ্ছা ও ত্যাগের কথা স্মরণ মক্কায় বার্ষিক হজ্জ।

জ্যোতির্বিদ্যার হিসেবে অনুযায়ী, বাংলাদেশে জিলহজ মাস শুরু হয়েছে ২৮ মে। ৭ জুন হবে ঈদ এবং তার আগে ৫ জুন হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন আরাফাত দিবস। মধ্যপ্রাচ্যের একদিন পর সাধারণত বাংলাদেশে ঈদ পালিত হয়। ঈদের সময়সীমা নির্ধারণে জ্যোতির্বিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চাঁদ দেখার বিষয়টি ইসলাম ধর্মে অগ্রাধিকার পায়। ফলে চাঁদ দেখা কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদের তারিখ ঘোষণা করে।

কোরবানির ঈদকে বাংলা ভাষায় সবসময় ঈদ-উল-আজহা বলা হয়ে এলে সম্প্রতি মানুষের মধ্যে আজহা'র স্থলে আদহা ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে, গল্প-উপন্যাসে, সরকারিভাবে কোরবানির ঈদ নির্দেশ করতে ঈদ-উল আজহাই ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু বেশ কয়েকবছর ধরে আজহা'র বদলে আদহা'র ব্যবহার জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনানুষ্ঠানিকভাবে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আজহা'র চেয়ে আদহা'র ব্যবহার করতেই বেশি দেখা যাচ্ছে মানুষকে। আরবি থেকে বাংলায় পরিবর্তন করার সময় উচ্চারণের পার্থক্যের কারণে এই শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আরবিতে শব্দটি দোয়াদ বর্ণ ব্যবহার করে যেভাবে লেখা হয়, সেই হিসেবে উচ্চারণটা আদহা হওয়ার কথা - অর্থাৎ “জ” না হয়ে অনেকটা “দ” এর মতো উচ্চারণ হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আবহমান কাল থেকে আজহা শব্দটির ব্যবহারই হয়ে এসেছে।

নবি ইব্রাহিম (আ.) একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বার্তা ছিল; স্বপ্নে তাকে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তার পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করতে বলেছিলেন। শয়তান ইব্রাহিমকে (আ.) আল্লাহর অবাধ্য হতে এবং তার পুত্রকে বাঁচাতে বলে প্রলুব্ধ করেছিল। ইব্রাহিম ইব্রাহিম (আ.) যখন তার পুত্রকে কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন, তখন আল্লাহ তাকে থামিয়ে দিলেন এবং তার পরিবর্তে তাকে একটি মেষ-শাবক কোরবানি করার জন্য দিলেন।

ঈদ সাধারণত মুসলিমরা মসজিদে নামাজ পড়ার মাধ্যমে শুরু হয়। তারা তাদের সেরা পোশাক পরে এবং তাদের প্রাপ্ত সমস্ত আশীর্বাদের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। এটি এমন একটি সময় যখন তারা পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে দেখা করে। দরিদ্র মানুষদেরও উদযাপন করার জন্য মুসলমানরা দান-খয়রাতও করে।

মুসলমানরা হজের শেষ দিনে ঈদ-উল-আজহা উদযাপন করেন। পবিত্র হজ পালনও এই সময়েই সম্পন্ন হয়, যা ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ। হজ হলো সৌদি আরবের মক্কায় তীর্থযাত্রা। এটি প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ (এবং তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)। হজের সময় তীর্থযাত্রীরা ইবাদত করেন এবং তাদের বিশ্বাস এবং পৃথিবীতে উদ্দেশ্যের অনুভূতি পুনর্নবীকরণ করেন। তারা নবি ইব্রাহিমের নির্মিত কাবার সামনে দাঁড়িয়ে একসাথে আল্লাহর প্রশংসা করেন। কাবা শরীফ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ। হজ যাত্রীরা কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন এবং তাদের অনেকেই কোণে অবস্থিত কালো পাথর স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। সকল মুসলিম যারা সুস্থ এবং ভ্রমণে সক্ষম, তাদের জীবনে অন্তত একবার মক্কা সফর করা উচিত।

ঈদ-উল-আজহা শুধুমাত্র একটি দিন নয়, বরং এটি একটি বৃহৎ আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের সূচনা। এই দিনে মুসলিমরা কোরবানি দেন, যা মূলত  আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের নিদর্শন। কোরবানির মাংস তিনভাগে ভাগ করে নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ভাগ করা ও গরীবদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে সমাজে সাম্যতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়।

এই উৎসব মুসলিম সমাজে আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও মানবতার শিক্ষায় উজ্জীবিত হওয়ার একটি বিরাট উপলক্ষ্য। ঈদ-উল-আজহার আগে থেকেই শুরু হয় পশুর হাট, বাজার ঘোরা ও নতুন পোশাক কেনার ধুম। এই সময় বাংলাদেশসহ মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। অনেকেই কোরবানির পশু আগেভাগেই বুকিং দিয়ে রাখেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে। এক্ষেত্রে অনলাইন কোরবানি সেবা বিষয়টি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কোরবানির সময় পরিবেশ সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে। পরিবেশবান্ধব কোরবানি আজকাল একটি সচেতন প্রবণতা হয়ে উঠেছে।

এই ঈদ শুধুই উৎসব নয়, এটি মুসলিমদের আত্মত্যাগ, একতা ও মানবিকতা চর্চার প্রতীক। তাই আমাদের উচিত সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া, কোরবানির বিধান যথাযথভাবে পালন করা এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া।

বাল্যকালে একটা বিষয় নিয়ে আমার মন খারাপ থাকত, অনেক সময় ঈদের দিনও। কারণ আমি অষ্টম শ্রেণিঅব্দি আটটা বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে হয়েছে। বাবা সরকারি চাকরি করত, যেখানে ট্রান্সফার হতো, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত। শিশুকালে গ্রামে কিছুদিন থাকলেও ওই সময় তিনটা বিদ্যালয় পরিবর্তন করা অলরেডি শেষ। বিদ্যালয়গুলোতে কিছুদিন অতিবাহিত করা মাত্রই আমার সঙ্গে অনেকের খুব বন্ধুত্ব হয়ে যেত। আমি স্কাউট, বিএনসিসি, আন্তঃবিদ্যালয় টুর্নামেন্ট এবং ডিবেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতাম। এ কারণে সহপাঠী এবং শিক্ষকদের সঙ্গে দিন কয়েকের মধ্যেই সুসম্পর্ক তৈরি হতো। তখন মোবাইল ইন্টারনেটের যুগ না থাকায়, অধিকাংশকে পরবর্তী জীবনে আর খুঁজে পেতাম না। মনে পড়লেই ঈদের দিনও আমার কান্না আসত। অধিকাংশকে আর কখনো খুঁজে পাইনি, ও হারানো বন্ধু তোমরা শুনতে কি পাও, এ লেখা আমার।

এবার রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সংগঠনের অগণিত নেতাকর্মী ও সমর্থক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘদিন মায়ের হাতের খাবার তাদের ভাগ্যে জোটেনি। পবিত্র ঈদ-উল-আজহার দিনেও মায়ের হাতে গোস্ত রুটি থেকে তারা যেন বঞ্চিত না হয়। সবাই নির্বিঘ্নে নিজ গৃহে পরিবারের সঙ্গে যেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে- এ ব্যবস্থাটি করার জন্য বাংলাদেশ সরকার, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং সবাইকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। ঈদের সময় ও পক্ষ-বিপক্ষ তকমা দিয়ে কারও ওপর যেন হামলা করা না হয়। মনে রাখতে হবে- জীবন রক্ষা করা সবার অগ্রাধিকার। তারপর অন্নবস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা ও শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। আমি আশাবাদী এই ঈদে মৌলিক অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না। কারণ বাংলাদেশে ক্ষমতায় রয়েছেন একজন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী।

ঈদ-উল-আজহার দিনটি আসে,

মুসলিমের ঘরে ,

ইব্রাহিম (আ:)-ইসমাইল (আ:) ত্যাগ তিতিক্ষা পরীক্ষায় ধন্য হয়ে,

ত্যাগ তিতিক্ষার পরীক্ষা হয়,

পশুর জীবন দিয়ে,

হাটে মাঠে রাস্তার ধারে

বসছে পশুর মেলা,

গরু মহিষ বকরি ভেড়া,

আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে,

হাট বাজারে ঠাঁই মিলে না,

মানুষ পশুর ভিড়ে,

কার পশুটা বেশি দামি,

কারটা হবে বেশ,

এই নিয়েই চলছে লড়াই,

টাকার খেলার রেষ।

পশুগুলো ভাবছে তাদের,

প্রভূর পানে চেয়ে,

এ কেমন ত্যাগ তোমরা করো,

মোদের বলি দিয়ে?

প্রতিযোগিতায় ক্কুরবানী যে,

সঠিক হয়না জানি,

তবু কেন করছে সবাই,

মোদের, দাম নিয়ে হানাহানি?

বোবা কান্না কেই বা শোনে,

কারবা আছে এত দায়!

কোরবানির নামে উচ্চ বংশের

পশুটা সবাই চায়।

ভাগ বটোয়ারার ঝুট ঝামেলায়,

কেনইবা যাব ভাই,

পশুর গোস্ত রক্ষনে এবার,

জব্বর ফ্রিজটা যে চাই!

ক্কুরবানীর ছলে গোস্ত দিযে,

ফ্রিজটাতো আগে সাজাই।

এইতো মোদের ত্যাগের ধরণ,

বলারতো কিছুই নাই,

বছর বছর ফি বছর এমন,

চলছে সর্বদাই।

সেই ত্যাগের নজীরখানা

দেখব।

তাপসী, আছিয়া,  ফিলিস্তিনের মুসলমান, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ পৃথিবীর নিষ্পেষিত নির্যাতিত অবহেলিত ও নিরন্ন  মানুষগুলো এবং তাদের পরিবারগুলো পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরে যেন ভালো থাকেন। যে কি-না তুচ্ছ কারণে জর্জরিত, কেউ বা বিনা দোষে শকুনের রোষানলে পড়ে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। তারা যেন না ফেরার দেশে ও ভালো থাকে।

আসুন এবার ঈদের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিই। বাংলাদেশে পোশাক-আশাক তুলনামূলক সস্তায় পাওয়া গেলেও, যেকোনো মাংস ব্যয়বহুল হওয়ায়, অন্তত ঈদ-উল-আজহার দিন কেউ যেন মাংস রান্না থেকে বিরত থাকতে না হয়। পোশাক-আশাকের এই সস্তার জমানায় কেউ যেন ঈদ-উল-আজহার দিন পুরোনো জামাকাপড় পরতে না হয়। আসুন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিগন দেরি না করে, এখনই পার্শ্ববর্তী ঘর-বাড়ি, পাড়া ও মহল্লায় খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন, প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।