কিছু নারী কেন এমন রঙ দেখতে পান, যা অন্যরা দেখতে পান না?

কিছু মানুষের চোখে এমন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যার কারণে তারা সাধারণ মানুষের তুলনায় রঙের আরও সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখতে সক্ষম হন। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘টেট্রাক্রোমেসি’। এর উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে চিত্রশিল্পী কনসেত্তা আন্তিকোর অভিজ্ঞতা।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে চিত্রশিল্পী কনসেত্তা আন্তিকোর অভিজ্ঞতা এবং ‘টেট্রাক্রোমেসি’ সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।  

আন্তিকো একসময় বুঝতে পারেন, তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ জিনিসেও অসংখ্য রঙের আভা দেখতে পান। যেমন একটি ছায়ার মধ্যেও তিনি নানা রঙের উপস্থিতি টের পান, যেখানে অন্যরা শুধু একটি ছায়াই দেখেন। তার ধারণা ছিল, সবাই পৃথিবীকে তার মতো করেই দেখে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি বুঝতে পারেন, তার রং দেখার অভিজ্ঞতা অন্যদের চেয়ে আলাদা।

একবার তিনি এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, আগে কেন তাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। ওই শিক্ষার্থী জানান, আন্তিকো তাদের শিক্ষক হওয়ায় তারা ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো শিল্পীর দৃষ্টিতে রং নিয়ে কিছু বলছেন। পরে জিনগত পরীক্ষা করে আন্তিকো জানতে পারেন, তার শরীরে টেট্রাক্রোমেসির সম্ভাবনা রয়েছে।

টেট্রাক্রোমেসি কী

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ মানুষের চোখে তিন ধরনের বিশেষ কোষ থাকে, যেগুলোকে বলা হয় ‘কোণ’। প্রতিটি কোণ কোষ আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সাড়া দেয়। এই ‘কোণ’ কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। বিভিন্ন ‘কোণ’ কোষ থেকে মস্তিষ্কে আসা সংকেত মিলে মিশেই স্থির করে যে আমরা কী রং দেখছি।

তবে কিছু কিছু মানুষের চোখে এই তিন ধরনের কোণ কোষ ছাড়াও চতুর্থ আরেক ধরনের কোণ কোষ থাকতে পারে।

এর অর্থ হলো, এই ধরনের মানুষের মস্তিষ্ক আরও বেশি, আরও নানা ধরনের সংকেত পায়, যার ফলে তাদের চোখে ধরা পড়া আলোর ছটা আরও বর্ণিল, আরও বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। 

চতুর্থ প্রকারের ‘কোন’ কোষ থাকলে তাকে রেটিনাল টেট্রাক্রোমেসি বলা হয় ‘রেটিনাল টেট্রাক্রোমেসি’। জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়, যাদের শরীরে চার ধরনের কোণ কোষ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

নারীদের মধ্যেই সম্ভাবনা বেশি

লাল ও সবুজ রঙের প্রতি সংবেদনশীল কোণ কোষ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত জিন এক্স ক্রোমোজোমে থাকে। টেট্রাক্রোমেসির জিনগত সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার জন্য এসব জিনের ভিন্ন ভিন্ন রূপের নির্দিষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন।

নারীদের দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকায় সাধারণত তাদের মধ্যেই এই জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকার সম্ভাবনা বেশি। পুরুষদের একটি এক্স ক্রোমোজোম থাকায় একই ধরনের জিনের ভিন্নতা তাদের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ধরনের বর্ণান্ধতার কারণ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির টেট্রাক্রোমেসি প্রজেক্টের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২% নারীর মধ্যে এই বিশেষ জিনগত সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ভিন্ন হতে পারে।

তবে শরীরে চার ধরনের কোণ কোষ তৈরির জিন থাকলেই কেউ যে বাস্তবে বেশি রং দেখতে পারবেন, এমন নয়। অতিরিক্ত কোণ কোষ থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্ক কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলেই সেটিকে ‘ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি’ বলা হয়। এই বিষয়টি প্রমাণ করা বেশ কঠিন।

টেট্রাক্রোম্যাটরা আসলে কী দেখেন

যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি আরভাইন ব্রানসন সেন্টার ফর ট্রান্সলেশনাল ভিশন রিসার্চের ড. কিম্বার্লি এ. জেমসনের গবেষণায় এমন কিছু নারীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের চোখে চার ধরনের কোণ কোষ রয়েছে এবং যারা রঙের বর্ণালিকে আরও বেশি শেডে আলাদা করতে পারেন।

সাধারণত যাদের চোখে তিন ধরনের কোণ কোষ থাকে, তাদের বলা হয় ‘ট্রাইক্রোম্যাট’। গবেষণার ফল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চার ধরনের কোণ কোষ থাকা কিছু নারী ট্রাইক্রোম্যাটদের তুলনায় রঙের আরও সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারেন।

এর কিছু উদাহরণ প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বানরের কয়েকটি প্রজাতিতে পুরুষরা ডাইক্রোম্যাট - তাদের চোখে দুই ধরনের কোণ কোষ থাকে। বিপরীতে স্ত্রী বানররা ট্রাইক্রোম্যাট। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ট্রাইক্রোম্যাট স্ত্রী বানর ডাইক্রোম্যাট পুরুষের তুলনায় লাল ফল দ্রুত খুঁজে পায়। এর থেকে ধারণা করা হয়, লাল রং তাদের চোখে তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের দৃষ্টি-সংক্রান্ত স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. জেনি বোস্টেনের মতে, একই ধরনের পরীক্ষা টেট্রাক্রোম্যাটিক মানুষের ওপর চালানো হলে অতিরিক্ত কোণ কোষ থাকা নারীরা কীভাবে রঙের আভা আলাদাভাবে দেখতে পারেন, তা আরও ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে। তবে এই অভিজ্ঞতা বাস্তবে ঠিক কেমন, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে।

যে রঙগুলো বর্ণনা করা কঠিন  

অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির দার্শনিক ড. মাইকেল নেওয়াল টেট্রাক্রোম্যাটরা কী দেখেন, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, একটি সম্ভাবনা হলো - তারা এমন কিছু রঙ দেখতে পারেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে বর্ণনা করা কঠিন। অন্য সম্ভাবনা হলো, তারা সম্পূর্ণ নতুন কোনো রঙ না দেখে পরিচিত রঙের মধ্যকার খুব সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পারেন। 

কোনো ব্যক্তি ঠিক কীভাবে রঙ দেখছেন, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। এমনকি একজন সাধারণ ট্রাইক্রোম্যাটের রং দেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও সরাসরি পরিমাপ করা যায় না। আবার অতিরিক্ত কোণ কোষটি কতটা সংবেদনশীল, তার ওপরও একজনের রঙ দেখার অভিজ্ঞতা অন্যজনের চেয়ে আলাদা হতে পারে।

এ কারণে বিভিন্ন রঙের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং কাছাকাছি শেডগুলো আলাদা করে চেনার সক্ষমতা পরীক্ষা করেই গবেষকেরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।

টেট্রাক্রোম্যাট যেভাবে শনাক্ত করবেন 

ইন্টারনেটে টেট্রাক্রোমেসি শনাক্ত করার দাবি করা বেশ কিছু পরীক্ষা রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে কাউকে টেট্রাক্রোম্যাট হিসেবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না।

এর একটি বড় কারণ হলো, আধুনিক বেশিরভাগ স্ক্রিনে লাল, সবুজ ও নীল - এই তিনটি রঙের চ্যানেল ব্যবহার করা হয়। ফলে কোনো টেট্রাক্রোম্যাট যদি এমন কোনো রঙের পার্থক্য দেখতে পান, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, সেটি কম্পিউটার বা ফোনের স্ক্রিনে একইভাবে ফুটে নাও উঠতে পারে। পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রযুক্তিও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে কিছু সম্ভাব্য ইঙ্গিত রয়েছে। কেউ যদি ছোটবেলা থেকেই অনুভব করেন যে তিনি অন্যদের তুলনায় রঙের পার্থক্য বেশি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন, সেটি একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। আবার উজ্জ্বল এলইডি বা ফ্লুরোসেন্ট আলোতে অস্বস্তি এবং উষ্ণ আলোতে তুলনামূলক স্বস্তি পাওয়ার অভিজ্ঞতাও কিছু টেট্রাক্রোম্যাটিক নারীর ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে।

যাদের বাবার মৃদু বর্ণান্ধতা রয়েছে, তাদের টেট্রাক্রোম্যাট হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো নিশ্চিত প্রমাণ নয়। জিনগত পরীক্ষা ও গবেষণাগারভিত্তিক পরীক্ষা বেশি নির্ভরযোগ্য।

গবেষকরা কি বলছে

গবেষকেরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন, কীভাবে রেটিনাল টেট্রাক্রোমেসি কার্যকরী বা ‘ফাংশনাল’ টেট্রাক্রোমেসিতে পরিণত হয়। 

এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, অতিরিক্ত কোণ কোষ থাকাই কি যথেষ্ট, নাকি মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন ধরে ওই অতিরিক্ত সংকেত ব্যবহারের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হয়? দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুতন্ত্রের নমনীয়তাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, কারও জীবনে রঙের সংকেতের ব্যবহারিক গুরুত্ব থাকলে তিনি সময়ের সঙ্গে সেগুলোর সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করার ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেন। 

চিত্রশিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো মনে করেন, তার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা এবং নিয়মিত রঙ মেশানোর অভ্যাসের মাধ্যমে তার রঙ দেখার ক্ষমতা আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি নিজের রঙ দেখার ক্ষমতাকে পেশির সঙ্গে তুলনা করেছেন - নিয়মিত ব্যবহারে যেমন পেশি শক্তিশালী হয়, তেমনি দীর্ঘদিনের চর্চায় তার রঙের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতাও আরও বিকশিত হয়েছে বলে তার বিশ্বাস। 

ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি নিয়ে বিতর্ক

ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি আদৌ কতটা বাস্তব, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে। ড. বোস্টেনের মতে, কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় বেশি রং দেখতে পারেন - এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি, কিন্তু একে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার মতো নিখুঁত পরীক্ষা এখনও নেই।

তার মতে, যতক্ষণ এমন কোনো পরীক্ষা তৈরি না হচ্ছে, ততক্ষণ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও কেস স্টাডি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সব প্রমাণ কোন দিকে ইঙ্গিত করছে, সেটিই দেখতে হবে। যদি অধিকাংশ প্রমাণ একই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, তাহলে ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসির পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি পাওয়া যেতে পারে।

তবে এসব সন্দেহ কনসেত্তা আন্তিকোকে দমিয়ে রাখেনি। নিজের এই জিনগত বৈশিষ্ট্যকে তিনি সৌভাগ্য হিসেবেই দেখেন। তার মতে, অন্যরা যে জিনিস দেখতে পান না, তা দেখতে পারা অত্যন্ত বিস্ময়কর। আর এই বিশেষ দৃষ্টিশক্তি তার জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।