কফি পান নয়, শুধু গন্ধেই কি মন ভালো হতে পারে?

কফির কাপ সামনে এলেই অনেকে চুমুক দেওয়ার আগেই স্বস্তি পান। গরম কফির গন্ধটা যেন সকালটাকে অন্য রকম করে দেয়। এই ভালো লাগার পেছনে শুধু কফি খাওয়ার অভ্যাস নয়, রয়েছে কফির পরিচিত গন্ধ।

কফি খাওয়ার আগেই কেন এমন হয়, তা নিয়ে এবার গবেষণা করেছেন একদল বিজ্ঞানী। তাদের গবেষণায় মিলেছে বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পান না করেও শুধু এর গন্ধ নিলে মানুষের মেজাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কয়েক মিনিট কফির গন্ধ নেওয়ার পর ক্লান্তি, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও মন খারাপের অনুভূতি কমে যেতে পারে। একই সময়ে মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।

বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স অ্যালার্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের শোয়া ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই পরীক্ষা চালিয়েছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nutrients জার্নালে। এতে অংশ নেন ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

গবেষণার সময় শিক্ষার্থীদের সামনে সদ্য তৈরি কফি রাখা হয়। তবে তাদের কফি পান করতে দেওয়া হয়নি। গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন, কফি শরীরে প্রবেশ না করেও শুধু এর গন্ধ কোনো পরিবর্তন ঘটায় কি না।

এজন্য ২০ গ্রাম গুঁড়া কফি ৪০০ মিলিলিটার পানিতে তৈরি করা হয়। এরপর কফির পাত্রটি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার দূরে রাখা হয়। তাঁর পাঁচ মিনিট ধরে স্বাভাবিকভাবে বসে কফির গন্ধ নেন।

পাঁচ মিনিট পর শিক্ষার্থীদের মেজাজ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এতে দেখা যায়, কফির গন্ধ নেওয়ার পর তাদের ক্লান্তি, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি ও মন খারাপের মতো অনুভূতি কমেছে।

তবে কফির গন্ধে তারা হঠাৎ করে বেশি চনমনে হয়ে উঠেছেন - এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ গন্ধটি বাড়তি শক্তি দেওয়ার চেয়ে নেতিবাচক অনুভূতি কমানোর ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলেছে।

মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন দেখা গেলো 

গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের কার্যক্রমও পরীক্ষা করেন। সেখানে মস্তিষ্কের শিথিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সূচকে পরিবর্তন দেখা যায়।

তবে এই পরিবর্তনকে কফির গন্ধে মস্তিষ্ক শান্ত হয়ে যাওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। পরিবর্তনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের হৃদস্পন্দনেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।

গন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি

কোনো পরিচিত গন্ধ অনেক সময় আমাদের পুরোনো স্মৃতি বা অনুভূতির কথা মনে করিয়ে দেয়। কারণ ঘ্রাণ নেওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগের অংশগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

কফির গন্ধের সঙ্গেও অনেকের দৈনন্দিন জীবনের নানা অভ্যাস জড়িয়ে থাকে। কারও কাছে এটি দিনের শুরুর অংশ, কেউ কাজের বিরতিতে কফি পান করেন। আবার কারও কাছে কফির গন্ধ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা বিশ্রামের স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে। তাই কফির গন্ধে ভালো লাগার পেছনে শুধু গন্ধের প্রভাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অভ্যাস ও প্রত্যাশারও ভূমিকা থাকতে পারে।

২০১৮ সালের একটি গবেষণাতেও কফির গন্ধের এমন প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, কফির মতো গন্ধ মানুষের কিছু বিশ্লেষণধর্মী কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকদের ধারণা ছিল, কফির গন্ধের সঙ্গে আগে থেকেই তৈরি ইতিবাচক ধারণা বা প্রত্যাশা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা

তবে নতুন গবেষণার ফলকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এতে অংশ নিয়েছেন মাত্র ২০ জন তরুণ শিক্ষার্থী। এছাড়া কফির গন্ধ না পাওয়া কোনো দলের সঙ্গে তাদের ফলাফল তুলনা করা হয়নি। অন্য কোনো গন্ধের প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে মেজাজের পরিবর্তনের জন্য শুধু কফির গন্ধই দায়ী কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত কতটা কফি পান করেন, কফি পছন্দ করেন কি না কিংবা কফির গন্ধের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই কতটা পরিচিতি ছিল - এসব বিষয়ও আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাই কফির গন্ধ মানুষের মেজাজ ও মস্তিষ্কে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।

অর্থাৎ কফিতে চুমুক দেওয়ার আগেই যদি এর গন্ধে মনটা একটু ভালো হয়ে যায়, তার পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে। তবে সেই কারণ ঠিক কী, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।