বাংলা একাডেমিতে পর্দা নামছে সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষ আসর ঢাকা লিট ফেস্টের দশম আসরের। এবারের আসরে অংশ নিয়েছেন পাঁচ মহাদেশের পাঁচ শতাধিক বক্তা। চার দিনের এই উৎসবে ১৭৫টির বেশি সেশনে অংশ নিয়েছেন তারা।
৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া উৎসবের সমাপনী দিনে রবিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে তীব্র শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে হাজির হন দর্শনার্থীরা।
সমাপনী দিনে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে “পুরুষত্ব বনাম পুরুষতন্ত্র” শিরোনামের একটি সেশনে অংশ নেন অভিনেতা ইরেশ যাকের, অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, নবনীতা চৌধুরী, ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের অ্যাডভোকেসি লিড তাকবির হুদা, ব্র্যাকের সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড সোশাল ট্রান্সফরমেশনের ভিজিটিং ফেলো মাহীন সুলতান, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকস ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ আহমেদ এবং মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী তাসাফি হোসেন। সেশনটি সঞ্চালনা করেন অভিনেত্রী বন্যা মির্জা।
এই সেশনে অংশ নিয়ে সংগীতশিল্পী ও ব্র্যাকের জেন্ডার কর্মসূচির পরিচালক নবনীতা চৌধুরী বলেন, “নারীবাদ মানেই মাতৃতান্ত্রিকতা নয়, মেয়েরা বেশি পাবে এমন নয়। নারীবাদ আসলে সমতার কথা বলে।”
সেশন অংশ নিয়ে এই আলোচনাটাকেই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন ইরেশ যাকের।তিনি বলেন, “পুরুষত্ব বনাম পুরুষতন্ত্র হবে কেন? কারণ, এটাই সমাজের অসম বাস্তবতা। পুরুষ হিসেবে আমার আচরণ, অভিব্যক্তি, কথাবার্তা এসব সমাজ থেকেই গড়ে উঠেছে। এজন্য এমন আলোচনা করতে হচ্ছে। কিন্তু এই বনাম আলোচনাটাই দুঃখজনক বলে মনে করি আমি।”
সঞ্চালক বন্যা মির্জা জানান, তিনি অবশ্য পুরুষতন্ত্রের চেয়ে পিতৃতন্ত্র শব্দটা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি বলেন, “অনেক বছর ধরে ঢাকা বা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পুরুষতন্ত্র শব্দটা ব্যবহার করা হয়। হয়তো পুরুষদের আধিপত্যের বিষয়টি তুলে ধরার জন্যই বলা হয়। তবে আমি পিতৃতান্ত্রিক শব্দটাকে গুরুত্ব দেবো। তাহলে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ আরও সহজ হবে।”
মাহীন সুলতান বলেন, “পুরুষতন্ত্র একটি সামাজিক আইডিওলজি। যুগ যুগ ধরে এটা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে পুরুষরা দায়িত্ব নেবেন, পরিবারের সব কর্তৃত্ব তাদের হাতে থাকবে। অন্যরা তাদের অধীনে থাকবে। এটা কোনো পুরুষের একক কোনো বিষয় নয়, গোটা সমাজ ব্যবস্থা। কথা হলো, এটা ঐতিহাসিকভাবে চলে আসছে বলে চলতেই হবে, এমন তো কথা নেই। আমরা সামাজিক জীব, সমাজ পরিবর্তনশীল। সুতরাং এই ধারণাগুলোও পরিবর্তন করতে হবে।”
সাঈদ আহমেদ বলেন, “পুরুষত্ব শব্দের উৎপত্তিগত অর্থ যেটা, সেটা কিন্তু এখন অনেকটা হারিয়ে গেছে। এখন পুরুষত্ব বলতে আমরা অনেক গুণবাচক বিষয় যোগ করে ফেলি। যেমন পুরুষ অনেক শক্তিশালী, সবল, সক্ষম ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীর ক্ষেত্রে ছলনাময়ী থেকে অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পুরুষত্ব আর পুরুষতন্ত্র দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। সমাজ বাস্তবতার কথা যদি বলি, পুরুষতন্ত্র থাকলে পুরুষত্ব জাহির করা অনেক সহজ হয়ে যায়। পুরুষ হওয়ার কারণে অনেক সুবিধা ভোগ করা যায়। বাস্তবতাটা এমন, পুরুষত্ব জাহির না করেও করতে পারি। জমিজমা থেকে শুরু করে যাবতীয় সুযোগ পাই। সেই সঙ্গে আবার যাবতীয় অক্ষমতাও ঢাকা যায়। তো আমি মনে করি, পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র বা ভাইতন্ত্র কিছু না, পুরুষ হলেই চলে।”
পুরুষতান্ত্রিকতার মধ্যে রাজনীতিও প্রবল বলে মনে করেন নবনীতা চৌধুরী।এ বিষয়ে তিনি বলেন, “পুরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে রাজনীতি তো আছেই। সবচেয়ে বড় রাজনীতি হল কে বেশি পাবে। নারী-পুরুষের বাইরে অন্য লিঙ্গের কথা ভাবলেও দেখা যায় পুরুষ শক্তিশালী। যেমন একজন আমি যতই যোগ্য, কর্মজীবী, সফল হই না কেন, রাস্তায় চলাচলের সময় একেবারে প্রান্তিক কোনো পুরুষও আমাকে চিমটি কেটে যেতে পারেন। অন্যদিকে তিনি চাইলেই ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারেন।”
সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে নবনীতা আরও বলেন, “কিছুদিন আগে ইরেশের একটি লেখা পড়েছি। সেখানে তিনি বলেছেন, বাবা হওয়ার পর তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মেয়ের ভালো বাবা হয়ে উঠতে পারছে কি-না, এ নিয়ে তার চিন্তা হয়। তো এটা অনেককে নাড়া দিয়েছে। কারণ, একজন পুরুষ এভাবে ভাবছেন। কিন্তু যদি আমি এমনটা লিখতাম, তাহলে কিন্তু অনেক মন্দ কথা শুনতে হতো। কারণ, ধরেই নেওয়া হয়, আমাকে ভালো মা হতেই হবে। ইদানীং নতুন প্রজন্মের কিছু পুরুষ কথা বলতে শুরু করেছেন। এভাবে ভাবতে শুরু করেছেন। তবে আমার মনে হয় এগুলো নিয়ে কথা বলা আরও বাড়াতে হবে। কারণ, যত আলোচনা করবো, ততই সমাধান বের হয়ে আসবে।”
তাকবির হুদা বলেন, “নারীরা বাইরে আসছে, এই সংখ্যার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের সমীকরণ মেলানো জটিল ব্যাপার। যেমন এক জরিপে দেখা গেলো, বাইরে আসা নারীদের ৯০%-ই যৌন হয়রানির শিকার হন। তাহলে তারা বাইরে এলেও পরিস্থিতি কিন্তু আদতে পরিবর্তন হচ্ছে না। এর বিপরীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? নারীদের জন্য আলাদা বাস দিয়ে বলে দেওয়া হচ্ছে, যৌন হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে হলে তোমাকে এই বাসে চলতে হবে। বেশি দাম দিয়ে ভিন্ন বাসে চলতে হবে। একবার উদ্যোগ নেওয়া হলো, কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি বন্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু কয়টা অফিসে সেই ব্যবস্থা আছে?”
তাসাফি হোসেন বলেন, “পুরুষতন্ত্র নিয়ে যে আমরা আলোচনা করছি, এর মানে কি আমরা শুধু পুরুষদের নিয়ে কথা বলছি? না, এটা একটা সামাজিক অবস্থা। ছোটবেলা থেকে আমিও দেখে এসেছি, পুরুষ মানে শক্তিশালী। এজন্য অনেক মেয়েও ছোটবেলায় পুরুষ হতে চায়। কারণ, সে ভাবে পুরুষ হলে স্বাধীনতা পাবে, ইচ্ছেমতো চলতে-ফিরতে পারবে, পোশাক পরতে পারবে।”
আজমেরী হক বাঁধন যেহেতু অভিনেত্রী, তাই তার কাছে সেই সংক্রান্ত প্রশ্নই করেন বন্যা মির্জা। জানতে চান, শোবিজে কাস্টিং কাউচ, পারিশ্রমিকের বৈষম্যের বিষয়ে। এসব নিয়ে বছরের পর বছর ধরে কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির কি পরিবর্তন হচ্ছে?
জবাবে বাঁধন বলেন, “আমার চোখে দেখি পরিবর্তন বাহ্যিকভাবে হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে যা ছিল, তাই। আর কাস্টিং কাউচের শুধু মেয়েরা না, ছেলেরাও শিকার হয়। নারীদের পারিশ্রমিকে শুধু মিডিয়া নয়, সবক্ষেত্রেই বৈষম্য আছে। তাই যতই প্রতিবাদ হোক, পরিবর্তন হচ্ছে কেবল সারফেস লেভেলে। ভেতরে ভেতরে আমরা আরও নষ্টের দিকে যাচ্ছি।”
পাশাপাশি নারীদের বিষয়ে আইনের নানান অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরেন বাঁধন। বিশেষত মেয়েরা তার সন্তানের লিগ্যাল গার্ডিয়ান হতে পারে না, আবার সম্পত্তির দিক দিয়েও বঞ্চিত হয়। শত শত বছরের পুরনো এসব আইন সংশোধন জরুরি বলেও মনে করেন এ অভিনেত্রী।