বিরূপ কাজের পরিবেশ, অসহযোগিতাপূর্ণ সহকর্মী, অন্তর্কোন্দল কিংবা অপ্রতুল পারিশ্রমিক- বিভিন্ন কারণে অনেকেই নিজের বর্তমান কর্মস্থল নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকেন। এমনকি এমন ভাবনার ব্যক্তিরা প্রায়ই চাকরিজীবনে নতুন কোনো গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণেই শেষ পর্যন্ত নতুন চাকরিতে আর যোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।
পুরোনো কর্মস্থল ছেড়ে নতুন চাকরিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের মনে বিভিন্ন দুশ্চিন্তা কাজ করে। এমনকি আগের চাকরির চেয়ে তুলনামূলক বেশি সুযোগসুবিধা পেয়েও অনেকে নতুন কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে দুবার ভাবেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইসের ইংরেজি সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রমবাজারের জটিলতা এবং বিদ্যমান স্থিতিশীলতা আঁকড়ে ধরে থাকার প্রবণতা ছাড়াও আরও অনেক কারণেই নতুন চাকরিতে আবেদন নিয়ে আমাদের মনে সংকোচ কাজ করে।
শ্রম ও ব্যবসা বিষয়ক মনোবিজ্ঞানী এলেনা আলামিডা বলেন, “মানুষ স্থিতিশীলতা প্রাধান্য দেয়। নিজের কাছে পরিচিত এবং জানা বিষয়ই মানুষ পছন্দ করে। আমাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনবে এবং নতুন কোনো পরিবেশে নিয়ে যাবে- এমন যেকোনো কিছু আমাদের মনে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে। যে কাজ আমরা খুব ভালোভাবে করতে পারি, সেটাই আমাদের কমফোর্ট জোন হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই চাকরি বদলানো আমাদের কাছে খুব কঠিন বলে মনে হয়।”
কর্পোরেট ওয়েল-বিইং বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী রাফায়েল সান রোমানের ধারণা, নতুন শুরুর ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতি একইরকম থাকে না। পুরোনো চাকরি ছেড়ে আরেক কর্মস্থলে যাওয়া, একটা নিয়ন্ত্রণাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন চাকরি না পেয়েই বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতি একরকম না।
চাকরি-কর্মস্থল পাল্টানোর পরিস্থিতিতে মানুষের মনে মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয় উল্লেখ করে আরেক মনোবিজ্ঞানী বার্নার্ডো রুইজ বলেন, মানুষের মধ্যে চাকরিজীবনের নতুন যাত্রা শুরুর উত্তেজনা এবং পেশাদার অর্জনের সুখকর অনুভূতির মতো ইতিবাচক আবেগ থাকাটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি নতুন কর্মস্থলে আগের সাফল্য ধরে রাখতে না পারার আশঙ্কায় নেতিবাচক আবেগও কাজ করতে পারে।”
শুরুতে সহজ বলে মনে হলেও আবেদন প্রক্রিয়ার পেছনে ব্যয় হওয়া শ্রম আর সময়ের কারণে পুরোনো কর্মস্থল ছেড়ে নতুন চাকরিতে যোগদানের কাজটি চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আপনাকে নিতে আগ্রহী থাকে, তারপর কর্মী নির্বাচন প্রক্রিয়ার সেই কষ্টকর যাত্রা শুরু হয়। লিংকডইন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এ কর্মী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ কার্যদিবস সময় প্রয়োজন হয়।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গে রাফায়েল সান রোমান বলেন, “কিছু কিছু প্রক্রিয়া খুবই দীর্ঘমেয়াদি আর চাহিদাপূর্ণ হয়। এমনকি মাঝে অনেকদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাড়াও আসে না। ওই সময়টা আমরা জানিই না যে আবেদনপত্রের কী হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যার ভিত্তিতে আমরা পুরো বিষয়টা প্রত্যক্ষ করি: যেখানে আবেদন করেছি সেই চাকরিটা আমি কতটা চাই, আমার কতটা প্রয়োজন এবং আমার বর্তমান অবস্থা কী।”
আর সবকিছু যদি ভালোয় ভালোয় শেষ হয়, তখন এক পর্যায়ে আপনার সামনে নতুন চাকরিতে যোগদানের সময় আসবে। সাধারণত অভিজ্ঞতাটি ইতিবাচক হলেও তার মানে এই না যে কারও পক্ষে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা সহজ হবে।
এছাড়া, একটা নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে একজন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় সময়টাও আপেক্ষিক। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৭২% মানুষ কর্মক্ষেত্রে নিজের মতোই থাকেন। যদিও নতুন পরিবেশে নিজের মতো হয়ে উঠতে তাদের (ওই ৭২%) গড়ে দুই থেকে তিন মাস লেগে যায়। এ দলের ৬০% মানুষের ধারণা, তারা তিন মাসের মধ্যেই নিজের স্বরূপে ফিরতে পেরেছেন। অন্যদিকে, ২২% মানুষ মনে করেন, তাদের ৯ মাস সময় লেগেছে।
নতুন কর্মস্থলের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে স্বাভাবিক আচরণ ও কাজের প্রক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে জার্নাল অব হ্যাপিনেস স্টাডিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, একজন কর্মী নতুন কর্মস্থলে যত নিজের স্বরূপে থাকবেন; চাকরির প্রতি তার সন্তুষ্টি, অর্পিত দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতাও তত বেশি আসবে।
গতিশীল এ প্রক্রিয়া নিয়ে বার্নার্ডো রুইজ বলেন, “একটা নতুন কাজের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন কাজের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে এবং নতুন কর্মস্থলের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।”
কিন্তু নতুন সামাজিক দলের সাথে মানিয়ে নেওয়াকে চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে এলেনা আলামিডা বলেন, “আমার ধারণা, নতুন কর্মস্থলের কাজের পরিবেশের অংশ হওয়ার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আমরা সহকর্মীদের যোগাযোগের ধরনেরও একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন বুঝতে হলে আমাদের নির্দিষ্ট একটা সময় লাগে, আর এটা মেনে নিতেই হবে। এসব ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সহায়তা খুবই প্রয়োজনীয়।”
তবে এখানে বসদেরও অনেক কিছু করণীয় আছে জানিয়ে রাফায়েল সান রোমান বলেন, “নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াতে সময় দেওয়ার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠান ও কর্মীর মধ্যে সমন্বয় গড়ে ওঠার একটা ব্যাপার। দুই পক্ষকেই যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে, যেন প্রতিষ্ঠান ও কর্মী দুজনেই ভাবে যে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যথার্থ ছিল।”
এ মনোবিজ্ঞানী জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো কর্মী ধীরে ধীরে পরিচিত হতে শুরু করলেও, একজন কর্মী নতুন কাজ শুরুর সময়ও নিজেকে কিছুটা অনিরাপদ বা ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে ধারণা করে। কারণ তাকে খুব দ্রুত এমন একটা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়, যেখানে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত অনেক কর্মী এবং কর্পোরেট ডায়নামিকস রয়েছে। আর সেগুলোকে মেনে নিয়েই তাকে নতুন কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হয়।
নতুন চাকরিতে যোগদানের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে নতুন কর্মস্থলের কাজের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে এলেনা আলামিডা গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদেশ দিয়েছেন। সেগুলো হলো:
-তাড়াহুড়া করা যাবে না। নিজেকে থিতু করতে সময় নিন এবং নতুন পদ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিষয়গুলো শিখুন।
-নিজের জন্য কিছু সময় বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। নিজের পছন্দের কাজগুলো করুন, নিজেকে মনে করিয়ে দিন যে বিভিন্ন পরিবর্তনের পরও আপনি নিজের মতোই আছেন।
-স্বাস্থ্যকর রুটিন মেনে চলুন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, ঘুমাতে যাওয়া এবং খাওয়ার অভ্যাস করুন। মানুষের সঙ্গে মেলামেশার জন্য এবং অবসর যাপনের জন্যও সময় বরাদ্দ রাখতে হবে।
-রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গেলে মনে অনেক রকম দুশ্চিন্তা ভর করে। তাই রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রামও নিতে হবে।
- যেকোনো বিষয়ে কৌতূহলী হন। নতুন চাকরির ভিত্তিই হচ্ছে শেখা। নিজ থেকে কৌতূহলী হয়ে নতুন নতুন কাজ শিখতে হবে। এমনকি আগের জানা জিনিসগুলোও আরও শানিয়ে নিতে হবে।
- নিজের আবেগ-অনুভূতির দিকে গুরুত্ব দিন এবং নিজেকে সংযত রাখতে শিখুন। যখন আমরা পরিবর্তনের মুখোমুখি হই, তখন আমাদের আবেগে আঘাত লাগতে পারে। এ কারণেই আবেগ সামলানো শিখতে হবে। আবেগ সামলানোর মাধ্যম হতে পারে চিত্তবিনোদন, ধ্যান করা, জার্নালিং-ডায়েরি লেখা বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা।