‘স্বপ্নভুক’: আত্ম-দ্বান্দ্বিক সংঘাতের শিল্পরূপ

সৈয়দ শামসুল হক শিল্পসৃষ্টির জগতে নানা শাখায় অবদান রেখে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন অনেক আগেই। তার সৃষ্টিকর্ম নানা আঙ্গিকে আমাদের ভাবনার দুয়ার যেন খুলে দেয়।

১৯৬৩ সালে সৈয়দ শামসুল হকের “জনক ও কালোকফি” উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। তার এই উপন্যাসটিকে নাট্যরূপ দিয়েছেন নির্দেশক সাইফ সুমন। “স্বপ্নভুক” নামে নাট্যরূপ পাওয়া নাটকটিতে প্রকাশ পেয়েছে মানুষের ভেতরের এক অস্থির তাড়না।

“জনক ও কালোকফি”তে সৈয়দ শামসুল হক বইয়ে দিয়েছেন জীবনের দারুণ এক কাব্যিক মধুরতা, মাদকতা। পাঠক শামসুল হকের দেখানো পথ ধরেই খুব সহজভাবে চলতে পারেন। নির্দেশক সাইফ সুমনও সেই কাব্যিক মাধুরতা ধরে রেখেছেন “স্বপ্নভুক”-এ। 

আলো-আধারে হঠাৎ এক কবির আগমন। দর্শকের মনকে চঞ্চল করে যেন কয়েকটি বাক্যেই দখলদারিত্ব নিয়ে নেন সেই কবি। প্রথমে জানান দেন, “সেই ব্যাগ হারিয়ে গেছে যেই ব্যাগে কবিতার খাতা ছিল।” একজন বয়ষ্ক বিষণ্ন কবির সঙ্গে এ সময় দেখা মেলে একই অবয়বের আরেক জনের। দুজনের ব্যথা একই। তবে দ্বিতীয় জনকে চেনা যায় অল্প কিছু পরেই। যখন কবি তার যৌবনের প্রেমের রোমাঞ্চকর স্মৃতি রোমন্থন করেন। তখন আমরা বুঝতে পারি দ্বিতীয় জন হলেন- কবির তরুণ বয়স, ছায়া চরিত্র। এই ছায়া চরিত্রটি ঘটনার পরিক্রমায় ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ছায়া শত্রু।

অসমাপ্ত বেহিসেবি এক আকাশ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো জীবন তার। যে জীবনে একটি স্বপ্ন বদলে দিয়েছে আরেক স্বপ্নকে। আত্ম-দ্বন্দ্ব পরিবারিক সম্পর্ক থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। অর্থকষ্টে পারিবারিক সম্পর্কহীন অনাদরের আক্ষেপ কোথাও গিয়ে মেটাতে পারেননি, মেটানো যায় না। সবার রাত এক প্রশান্তির পসরা নিয়ে আসে কিন্তু কবির রাত এসেছে “অন্ধকারেও স্মৃতি ভোলা যায় না” এর বাহারি আয়োজন নিয়ে। 

মায়ের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন কবি, পারেননি। তার বাবার মৃত্যুস্মৃতির এক দায়বোধ যা কিনা তার ওপর চাপানো হয়েছে। মায়ের দ্বিতীয় বিবাহ তাকে আর ফিরতে দেয়নি। যখন ফিরেছেন তখন তার মা তাকে গ্রহণ করেছেন আগন্তুকের মতো। জীবনে প্রেম এসেছে সংসার হয়নি, প্রলোভন এসেছে বিক্রি হননি, বন্ধু হয়েছে সহচর পাননি। নির্দেশক নানা মাত্রিক সম্পর্কের সংঘাতকে সামনে এনে “সম্পর্কের রাজনীতি”কে ফুটিয়ে তুলেছেন। 

জীবনের নানামুখী অভিজ্ঞতার বিচ্ছুরণ, অতীত-বর্তমান ঘুরে ঘুরে কথা বলতে থাকা কিংবা “স্বপ্নভুক”র মঞ্চের চরিত্রটির মনস্তত্ত্ব নাটকের মিনিট সাতেকের ভেতর যেন ছড়িয়ে পড়ে আমাদের নিজস্ব অতীত আর বর্তমানের দোলাচলে। যেখানে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া চলে। 

“স্বপ্নভুক” নিজেকে জানার বেদনা বয়ে বেড়ানো বেহিসিবি এক জীবনের গল্প! নিজের পেছনে নিজেই ছুটতে থাকা ছায়াশত্রুর মতো। কোথায় যেন নিজের কাছে নিজেই বন্দি। স্বপ্নদৌড়ের মতো- সময় এগোয় দৌড় এগোয় না। বয়স বাড়ে কিন্তু স্মৃতি টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় অতীতে! বিবেকের কাঠগড়ায় নিজেকেই দাঁড় হতে হয় বারবার। এ এক নিজের প্রশ্নবাণে জর্জরিত আহত পাখি যেন! ভুল থেকে স্বপ্ন, স্বপ্ন থেকে বিভ্রম। নিজের জীবন উজার করে জীবনের অর্থ খোঁজা, নাটাইয়ের সুতো ছাড়তে ছাড়তে দেখা কত দূরে যায় ঘুড়ি; আকাশের কাছে কত ছোট হয়ে আসে।

‘স্বপ্নভুক' এর পোস্টার/ সংগৃহীত