স্থায়ী হওয়ার আশায় পরকীয়া, লন্ডনে বাংলাদেশিদের বিবাহ বিচ্ছেদ

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। সদ্য দেশ থে‌কে ইউরোপের দেশটিতে পাড়ি জমানো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ ও নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্ত্রী পু‌লিশ ডেকে স্বামী‌কে বের ক‌রে দি‌চ্ছেন, স্বামীর নির্যাত‌নে স্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, জোর করে গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটছে।

দাম্পত্য কল‌হের ঘটনায় পুলিশ ডাকার পর অনে‌কে স্বামী বা স্ত্রীর বিরু‌দ্ধে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করছেন। অনেকে এসব মামলার সু‌যোগ নি‌য়ে ব্রিটে‌নে স্থায়ী হওয়ার পথ খুঁজছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনকে লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা দাম্পত্য কলহের পেছনে মূলত আর্থিক কারণ দায়ী। এখানে এসে ভালো কাজ না পেয়ে স্থায়ী হওয়ার জন্য পুরুষরা নিজেদের চেয়ে বেশি বয়সী নারীদের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।

এ ব্যাপারে লিংকন্স চ্যাম্বার্স সলিসিটরসের প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার নাজির আহমদ বলেন, “গত তিন বছ‌রে ক‌য়েক হাজার বাংলাদেশি ব্রিটে‌নে কেয়ার ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও স্টুডেন্ট ভিসায় স্বামী-স্ত্রী নি‌য়ে এসেছেন। তা‌দের অনেকে প্রায়ই আস‌ছেন আমা‌দের কা‌ছে ডি‌ভোর্স (বিবাহ বিচ্ছেদ) নি‌য়ে পরামর্শ নি‌তে। অতীতে ব্রিটে‌নে ডি‌ভোর্সের জন্য আবেদন করলে কারণ দেখা‌তে হতো। এখন আইন‌ সহজ করায় অনেকে সু‌যোগ‌টি নিচ্ছেন। ব্রিটে‌নে আসার পথ হিসেবে যারা স্পাউস বা সঙ্গী নি‌য়ে এসেছেন সেসব দম্প‌তি‌দের মধ্যে ডি‌ভোর্স বেশি হ‌চ্ছে।”

তিনি বলেন, “বি‌রোধের মূল কারণ অর্থনৈ‌তিক। যে স্বপ্ন নি‌য়ে লন্ড‌নে তারা এসেছেন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দালা‌লের কথার সঙ্গে কা‌জের কোনো মিল থাকছে না। কাজ নেই। অনেক দম্পতি একসঙ্গে থাক‌তে পার‌ছেন না, কারণ ঘর ভাড়া দেওয়ার মতো উপার্জন নেই। স্থায়ী হওয়ার আশা নিয়ে একা আসাদের মধ্যে অনেকে বিবাহিত মধ্য বয়সীদের সঙ্গে সম্প‌র্কে জড়া‌চ্ছেন।”

স্টুডেন্ট ভিসায় স্ত্রীর ডি‌পে‌ন্ডেন্ট হ‌য়ে লন্ডনে আসা ঢাকার উত্তরার বা‌সিন্দা ফারুক আহ‌মেদ একটি সুপার শপে কাজ ক‌রেন। তিনি জানান, গত দুই বছ‌রে এদেশে আসা তার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকের মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দিয়েছে। এখানে আসার পর দীর্ঘদি‌নের প্রেমের বি‌য়ে ভেঙে যা‌চ্ছে মূলত আর্থিক কারণে। দেশ থে‌কে যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন বাস্তবতার সঙ্গে ফারাক আকাশ-পাতাল। ঘর ভাড়া আর সংসার খর‌চের জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজন দিনে ১০ ঘণ্টা কাজ ক‌রেও যখন কু‌লি‌য়ে উঠ‌তে পারছেন না।”

সাংবাদিক ও ব্রিটে‌নের লিবা‌রেল ডে‌মো‌ক্র্যাটিক পা‌র্টির নেতা মাহবুবুল করীম সু‌য়েদ ব‌লেন, “দাম্পত্য কল‌হের পাশাপা‌শি যা‌রা একা এসেছেন তা‌দের অনেকে স্থায়ী হওয়ার আশায় দ্বিগুণ বয়সী গৃহবধূর সঙ্গে সম্পর্কে জ‌ড়ি‌য়ে পড়ছেন, পুরনো সংসার ভাঙছে। এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে। ডি‌ভোর্স হওয়া মা-বাবার সন্তানরা ভুগ‌ছে বড় সমস্যায়।”

লন্ড‌নের প্রবীণ ক‌মিউনিটি নেতা কে এম আবু তা‌হের চৌধুরী ব‌লেন, “সংসার ভাঙার বড় একটি কারণ হলো অনৈতিকতা। এসব ঘটনা বাংলা‌দেশি‌দের জন্য লজ্জার ও দুর্না‌মের। ডি‌পে‌ন্ডেন্ট ভিসায় যারা আস‌ছেন তা‌দের বড় এক‌টি অংশ প্রতা‌রিত হচ্ছেন, মে‌য়েরা ভিক‌টিম হ‌চ্ছেন বে‌শি।”

তিনি আরও ব‌লেন, “এর মূল কারণ হলো লন্ড‌নে এসে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির মিল না হওয়া। আর্থিক কারণে ঘর ভাড়া দি‌তে না পারায় দেখা যা‌চ্ছে স্বামী হয়ত লন্ডনের বাইরে কাজ নিয়ে সেখানে থাকছেন, স্ত্রী থাক‌ছেন কোনো আত্মীয়ের বাসায়। অনেকে ধার-দেনা করে ভিসার টাকা জোগাড় করে এসেছেন। এখা‌নে এসে কাজ পাচ্ছেন না, সেই ঋণ শোধ করতে পারছেন না। শুধু ব্রিটে‌নে স্থায়ী হওয়া জন্য যারা এদেশে এসেছেন তাদের ক্ষেত্রে দাম্পত্য কলহ বেশি ঘটছে।”

উল্লেখ্য, এ বছর যুক্তরা‌জ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার ছিল প্রায় ৪২%। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার বেড়েছে। এর প্রধান কারণ হলো “অযৌক্তিক আচরণ”। এছাড়া প্রায় ১৪% ক্ষেত্রে ব্যভিচার বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে।