কেমন ছিল সেই 'ফারাক্কা লং মার্চ'?

১৬ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তপ্ত রোদ আর ধুলোবালি উড়িয়ে লাখো মানুষের অবয়ব এগিয়ে যাচ্ছিল রাজশাহীর প্রেমতলীর দিকে। সবার সামনে ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে হেঁটে চলছেন ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ - মাথায় সাদা টুপি, পরনে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি, হাতে লাঠি। তিনি মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার একটি ডাকে সেদিন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এক হয়ে গিয়েছিল ‘ফারাক্কা লং মার্চ’ এ। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পদ্মাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে এই মহাজাগতিক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে।  

পটভূমি 

১৯৫১ সালে ভারত প্রথম পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। উদ্দেশ্য ছিল ভাগীরথী-হুগলী নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে কলকাতা বন্দরকে সচল রাখা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকার - উভয় পক্ষই এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

১৯৭৪ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ভারত মাত্র ৪১ দিনের জন্য (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে ১৯৭৫) পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু  করার অনুমতি পায়। শর্ত ছিল, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৫-৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে ভারত চুক্তি লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে গঙ্গার প্রায় সবটুকু পানি প্রত্যাহার করে নেয়। ফারাক্কার একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এর ফলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়-

কৃষি ও মৎস্য সম্পদ ধ্বংস: পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয় এবং মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

লবণাক্ততার আগ্রাসন: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে) সাগরের লোনা পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে, যা সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম এবং শিল্পকারখানার চরম ক্ষতি করে।

বজ্রকণ্ঠের ডাক এবং ১৬ মে’র সেই ঐতিহাসিক সকাল

এই জাতীয় সংকটে অসুস্থ শরীর নিয়েও গর্জে ওঠেন মওলানা ভাসানী। তিনি ঘোষণা করেন লং মার্চের। ১৮ এপ্রিল ১৯৭৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠিতে ভাসানী লেখেন: “ফারাক্কা প্রসঙ্গে আমি আবারও আপনাকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো সফর করার এবং আমাদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে কী বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা স্বচক্ষে নিরূপণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি আপনাকে কেবল আপনার সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর না করার জন্য জোরালো আহ্বান জানাই.........।” 

১৯৭৬ সালের ১৫ মে রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৬ মে সকালে সেখান থেকেই শুরু হয় ঐতিহাসিক লং মার্চ। রাজশাহী শহর পার হয়ে প্রেমতলী, এরপর কানসাট গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল এই পদযাত্রা। লাখো মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় স্লোগান - “চলো চলো ফারাক্কা, মরণ বাঁধ ফারাক্কা উড়িয়ে দাও।”

মিছিলের শুরুতে রাজশাহী ময়দানে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে মাওলানা ভাসানী বলেন, “গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।” লাখ লাখ মানুষের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছিলেন, “এই মিছিল বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রামের প্রতীক। গোটা বিশ্বের বুক থেকে জালেমের শোষণ-পীড়নের সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবে।”

লাঠিতে ভর দিয়ে মওলানা ভাসানী হেঁটে চলেন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার। তার পেছনে কৃষিজীবী, শ্রমজীবী, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। এই লং মার্চ কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না, এটি ছিল আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পানির অধিকারের দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরার এক অনন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার।

লং মার্চের প্রভাব ও বর্তমান বাস্তবতা

মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের পর বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা সমস্যাটি বিশ্ববাসীর নজরে পড়ে। এরপর জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিষয়টি তোলেন। জাতিসংঘ এটি দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির তাগিদ দেয়। ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম পানিবণ্টন চুক্তি হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (যার মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে যাচ্ছে)।

আজ ফারাক্কা লং মার্চের দীর্ঘ সময় পরও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে বাংলাদেশের লড়াই শেষ হয়নি। প্রতি বছর ১৬ মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ওপর কৃত্রিম হস্তক্ষেপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। মওলানা ভাসানীর সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রা আজও বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।