ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ। স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জেলা বিএনপির সভাপতি থেকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও। এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। ইতিমধ্যে দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনে উঠবেন মির্জা ফখরুল।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একাধিকবারের সংসদ সদস্য ও পরে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এ সময় তাকে কারাগারেও যেতে হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের পর আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান তিনি।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবাহিত। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার পর বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপি সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।