বগুড়া-৭ আসনে ৫১ বছর পর নৌকার জয়

বগুড়া-৭ আসনে (গাবতলী-শাজাহানপুর) ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক জয়লাভ করেছিল। তারপর দেশে হয়েছে অনেকগুলো জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু আর কখনোই নৌকা প্রতীকে কেউ জয়লাভ করতে পারেননি এই আসনটিতে। দীর্ঘ ৫১ বছর পর এবার “বিএনপির দুর্গ” হিসেবে পরিচিত আসনটিতে নৌকা প্রতীকের জয় হয়েছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ডা. মোস্তফা আলম নান্নু বগুড়া-৭ আসনে জয় পেয়েছেন। তার কাছে বর্তমান ও সাবেক দু’জন সংসদ সদস্যসহ ১২ জন প্রার্থী শুধু ধরাশায়ী হননি, জামানতও হারিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আমানউল্লাহ খান নির্বাচিত হন। এরপর নানা প্রেক্ষাপটে আসনটি হাতছাড়া হয়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর দখলে চলে যায়।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি। এ কারণে বগুড়া-৭ “জিয়া পরিবারের আসন” হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এই আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালেও এই আসনে তার পক্ষে মনোনয়ন তোলা হয়। তবে সেবার তিনি নির্বাচন করতে পারেননি।

১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির হাবিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে বগুড়া-৭ আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করে শাজাহানপুর উপজেলা যুক্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির এটিএম আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টু সংসদ সদস্য হন।

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের উপ-নির্বাচনে তার উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু সংসদ সদস্য হন।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনের দুই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া আবারও এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেবারও তিনি আসনটি ছেড়ে দেন। সেবারের উপ-নির্বাচনে হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু ফের সংসদে যান।

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া আবার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। সেবার আসনটি ছেড়ে দিলে নভেম্বরে উপ-নির্বাচন হয়। হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু ফের এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালেও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া আসনটি থেকে বিজয়ী হন। তখনও আসটি ছেড়ে দেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। উপ-নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার মওদুদ আহম্মদ নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টির মুহম্মদ আলতাব আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে মনোনয়ন তুললেও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অযোগ্য হন। ওই নির্বাচনে বগুড়া-৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রেজাউল করিম বাবলু।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয়নি বিএনপি। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. মোস্তফা আলম নান্নু ৯১,০২৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ফলে দীর্ঘ ৫১ বছর পর আসনটি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ।

ডা. নান্নুর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এটিএম আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টু পেয়েছেন ৬,৮০১ ভোট। এ আসনে ১৩ প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচিত নান্নু ছাড়া বাকি ১২ জনই জামানত হারিয়েছেন।

বিএনপির কেউ নির্বাচন না করায় অনেকটা ভাগ্যের ফেরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বাবলু এক লাখ ৯০ হাজার ২৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে মাত্র ২,০০৭ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন তিনি।

এর আগে, গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপ-নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু নির্বাচিত হন। ফলে দীর্ঘ ৫০ বছর পর আসনটি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন রিপু। বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত আসনটিতে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এসএম সিরাজুল ইসলাম সুরুজ সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।