অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দলের সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনসমূহকে চাঙা করতে চায় বিএনপি। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার শেষে হবে নির্বাচন। তবে ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগে ভাগেই মাঠ গুছিয়ে রাখার কথা ভাবছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে দলের প্রধান ভ্যানগার্ড ছাত্রদলের নারী কর্মীদের আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে সংগঠনটি। নারী বান্ধব সংগঠন গড়ে তুলতে কাজ করছেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। ছাত্র সংগঠনটির নেতারা ছুটে বেড়াচ্ছেন জেলা থেকে জেলায়। এক্ষেত্রে নারী কর্মী বৃদ্ধি করানোর দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন তারা। তবে দলের নারী নেতা-কর্মীরা বলছেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনায় এগোলে নারীবান্ধব সংগঠন হিসেবে ভোটের মাঠে বিশেষ নজর কাড়তে পারবে তাদের দল বিএনপি। এক্ষেত্রে সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়ানো এবং লিঙ্গ বৈষম্য কমিয়ে আনলে নারীরা নেতৃত্বে আসতে পারবেন বলে মনে করছেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় মানসুরা আলম। আইন বিভাগে পড়াশোনা করা মানসুরা বর্তমানে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। নারী হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে কোনো সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন কী না এমন প্রশ্নে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “যেহেতু দলের চেয়ারপার্সন একজন নারী, সেহেতু নারীদের নেতৃত্বে উঠে আসতে প্রতিবন্ধকতা দেখিনা। সাধারণভাবে আমি বা আমার একজন পুরুষ সহকর্মীর মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কোনো পার্থক্য নেই। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগের কোনো পার্থক্য নেই। তারপরেও নারী পরিচয় সংগঠনের পদায়নের ক্ষেত্রে অলংকারের মতো করে রাখা হয়। এ অবস্থা বদলালে দলের পরিস্থিতি বদলাবে। ভোটের মাঠেও আমাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।”
তার মতে, “বিগত পনেরো বছর ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আমরা সংগ্রাম মুখর সময় পার করেছি। বিরোধী দলের রাজনীতি করে এসেছি। নানারকম সামাজিক-রাজনৈতিক বাধা থাকায় ছাত্রদলের নারী কর্মী কম ছিল। ধীরে ধীরে দলে নারী কর্মী বেড়েছে। এক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বাড়লে নারী কর্মীর সংখ্যাও দলে বাড়বে।”
ছাত্রদলের আরেকজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সায়রা চন্দ্রা চাকমা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “হাইকমান্ড থেকে নারীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়নের ইতিবাচক দিকনির্দেশনা থাকলেও মাঝপথে কেন যেন নারীদের সবসময় আলাদা করে চিন্তা করা হয়। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো নারীদের মতামতকে প্রাধান্য কম দেয়া হয়। এটা হয়তো কেউ প্রকাশ্যে বলেন না। তবে এটা নানাভাবেই স্পষ্ট হয়। যদিও ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব অসাধারণভাবে কাজ করছে। নারীবান্ধব ও কর্মী বান্ধব হিসেবেই তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। হাইকমান্ড এক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ নিলে দলে নারী সংখ্যা আরও বাড়বে।”
কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সংকট দেখেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “নারীদের তেমন বড় কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয় না। মাঠ পর্যায়ের কাজেও কম রাখা হয়। আবার পুরুষ নেতাকর্মীরা নারী নেতৃত্বের অধীনে কাজ করতে অনাগ্রহ দেখান। বিভিন্ন সভা সমাবেশে নারী নেত্রীদের বক্তব্য প্রদানে তেমন একটা উৎসাহিত করা হয় না। ফলে নারী নেতৃত্বের সামনে আসার সুযোগ কম। ফলে নতুন আগত নারীরা উৎসাহ পান না।”
নারী কর্মী বাড়াতে করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগামীতে দলে নারী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে যেকোনো কমিটিতে কমপক্ষে ৩০% নারী শিক্ষার্থী বাধ্যতামূলক রাখার নিয়ম করা জরুরী। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের সাথে ইতিবাচক রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন সভা সেমিনার সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম করা যেতে পারে। নারীদের কথা বলার সুযোগ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা জরুরি।”
সংগঠনটির ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস নাসরিনও বললেন অনেকটা একইরকম কথা। তিনি মনে করেন, সামাজিক সাংস্কৃতিক বাধার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরেও পরিবেশটা উন্নত করা প্রয়োজন। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে উঠে এসে নারী কর্মীদের সমমর্যাদার কর্মী ভাবা প্রয়োজন। নাসরিনের ভাষায়, “অলংকারিক পদ দিয়ে ক্ষমতায়িত করা যায় না। নারীদের নিজেদেরও আগ্রহ থাকা জরুরি। নতুন চিন্তার সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়াও জরুরি।”
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখার নেত্রী তাসনিয়া জান্নাত চৌধুরী। তার ভাষায়, “পনেরো বছরের লড়াইয়ে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলেও আমরা অনেক নারী কর্মী পেয়েছি, যারা পরীক্ষিত, যোগ্য। কিন্তু সব সময় সেই মূল্যায়নটা আমরা করে উঠতে পারিনি। যদিও ছাত্রদল সাম্যের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, তবুও দলের নারীদের নিয়ে আলাদা করে ভাবা উচিত।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক নেতা মুনমুন ইসলাম ঋতু। তিনি বলেন, “ভোটের মাঠে নারী কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে। দলকে ঢেলে সাজাতে গেলে লিঙ্গ বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। অনেক নারী কর্মী আসতে চায়। তবে নিরাপত্তাহীনতা একটা শঙ্কার বিষয় থাকে। তবে ছাত্রদল এক্ষেত্রে অনেকটাই আস্থার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিনিয়ত নারী কর্মী বাড়ছে। হাইকমান্ড নজর দিলে এটা আরও বাড়ানো সম্ভব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, “ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করা হয়। সেক্ষেত্রে মূল দলে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ছাত্রদলেও নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে আরও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা যায় সেই লক্ষে আমরা কাজ করছি।” বিগত দিনে যেসকল নারীরা তাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তাদের ভবিষ্যতে নেতৃত্বে আসার সুযোগ দেখছেন এই নেতা।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, “নারী কর্মী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা বিশেষভাবে নজর দিয়েছি। এজন্য কয়েকদফা বিভিন্ন স্থানে আমরা কর্মীদের সঙ্গে বসছি। স্থানীয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা সাংগঠনিক সফর শুরু করেছি। একদম গ্রাম অঞ্চলের নারীদের জন্য নিরাপদ ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিতি গড়তে আমরা বদ্ধ পরিকর। দেশনায়ক তারেক রহমান এক্ষেত্রে আমাদের নিয়মিত বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। আগামীতে সব ধরনের ছাত্রদের সর্বোচ্চ আস্থার সংগঠন হবে ছাত্রদল।”
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমাদের সময় ছাত্ররাজনীতিতে মেয়েরা এগিয়ে ছিলেন। তবে কেন্দ্র পর্যায়ে কম ছিল, হলভিত্তিক বেশি ছিল। ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব নিরসলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। লিঙ্গবৈষম্য নয়, বরং সব ছাত্রদের সংগঠন ছাত্রদল। যেটুকু সংকট আছে, দ্রুত বর্তমান নেতৃত্ব দ্রুতই কাটিয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।”