বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল এমন এক নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা, অসংখ্য গৌরবগাথা আর সাম্বা ফুটবলের জাদু। সেলেসাওদের হারানোই যেখানে যেকোনো দলের জন্য পরম আরাধ্য, সেখানে এক ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৭ বা তার বেশি গোল করাকে ভাবা হয় প্রায় অসম্ভব এক মহাকাব্যিক অর্জন। তবে শতবর্ষের ফুটবল ইতিহাসে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে, যার সংখ্যাটি মাত্র দুটি। তবে এর বাইরে যুব ফুটবলে বাংলাদেশকে নিয়েও জড়িয়ে আছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রাজিলের বিপক্ষে এক ম্যাচে ৭ বা তার বেশি গোল করতে পেরেছে কেবল দুটি দেশ। আর এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে ব্যবধান ছিল দীর্ঘ ৮০ বছর।
ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথমবার ৭-এর বেশি গোল করার কীর্তি গড়েছিল তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া। ১৯৩৪ সালের ৩ জুন বেলগ্রেডে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৮-৪ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে ইউরোপের এই দলটি।
ম্যাচটির শুরুটা অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষে ছিল। খেলার মাত্র ৮ মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায় তারা। তবে এরপর যুগোস্লাভিয়ার আক্রমণভাগের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। একের পর এক গোল হজম করে শেষ পর্যন্ত ৮-৪ ব্যবধানের বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিরা। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম কোনো ম্যাচ, যেখানে তারা ৭ বা তার বেশি গোল হজম করেছিল।
যুগোস্লাভিয়ার পর দীর্ঘ আট দশকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিল আরও শক্তিশালী হয়েছে, জিতেছে একের পর এক বিশ্বকাপ। ফলে এমন রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি আর কখনো দেখা যাবে, তা ছিল ফুটবলপ্রেমীদের কল্পনার অতীত। কিন্তু ২০১৪ সালে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখায় জার্মানি।
নিজেদের মাটিতে আয়োজিত ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে জার্মানির মুখোমুখি হয় ব্রাজিল। ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলকে চেপে ধরে জার্মানি। রক্ষণভাগের নজিরবিহীন বিপর্যয়ে ম্যাচের মাত্র ২৯ মিনিটের মধ্যেই ৫-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে সেলেসাওরা। পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক ব্যবধানে জিতে নেয় জার্মানি। ব্রাজিলের হয়ে অস্কার একটি গোল শোধ করলেও তা পরাজয়ের জার্মানি-বেদনা কমাতে পারেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় হার হিসেবে আজও স্মরণীয়।
ব্রাজিলকে ৭-০ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ, এমন দাবি শুনলে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। তবে আন্তর্জাতিক অনূর্ধ্ব-১৪ যুব ফুটবল টুর্নামেন্টে এমন একটি ঘটনার ইতিহাস রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গণমাধ্যম উপদেষ্টা তৌহিদ ফিরোজ এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ১৯৯০ সালে ‘বাংলা একাদশ’ নামে বাংলাদেশের একটি অনূর্ধ্ব-১৪ দল ইউরোপে অনুষ্ঠিত ডানা কাপ ও গথিয়া কাপে অংশ নিয়েছিল। ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত ডানা কাপ এবং সুইডেনে অনুষ্ঠিত গথিয়া কাপ বিশ্বের তরুণ ফুটবলারদের অন্যতম বড় আসর হিসেবে স্বীকৃত। ওই প্রতিযোগিতার একটি ফাইনালে বাংলাদেশের বাংলা একাদশের প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-১৪ দল।
তৌহিদ ফিরোজের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রাজিলের কিশোর ফুটবলাররা তাদের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি পরেই মাঠে নেমেছিল। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের কিশোররা ব্রাজিলের বিপক্ষে ৭-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নেয়। ওই সময়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শুধু ব্রাজিল নয়, ফাইনালে ওঠার পথে আরও কয়েকটি শক্তিশালী দেশের যুব দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিল।
জাতীয় দলের আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রাজিলের মূল দলের বিপক্ষে এক ম্যাচে ৭ বা তার বেশি গোল করার অফিশিয়াল রেকর্ড রয়েছে কেবল যুগোস্লাভিয়া (১৯৩৪ সালে ৮-৪) এবং জার্মানির (২০১৪ সালে ৭-১)।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ৭-০ গোলের জয়টি কোনো মূল জাতীয় দলের ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ের একটি আন্তর্জাতিক যুব টুর্নামেন্টের অনবদ্য সাফল্য। ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে যেকোনো পর্যায়ে এত বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। সে কারণেই জার্মানি ও যুগোস্লাভিয়ার রেকর্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের সেই যুব দলের ঐতিহাসিক সাফল্যের গল্পও ফুটবল অনুরাগীদের কাছে একটি রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।