বিদায়েও কেন মেসি-রোনালদোর গল্প আলাদা হলো

ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তুলনা নতুন কিছু নয়। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময়ই পাশাপাশি রেখে আলোচনা হয়েছে সময়ের দুই সেরা ফুটবল তারকাকে। এবার জাতীয় দল থেকে বিদায়ের সম্ভাব্য ধরন নিয়েও সেই পুরোনো দ্বৈরথ সামনে এসেছে। তবে এবার লড়াইটা মাঠের পারফরম্যান্সে নয়, বরং বিদায়ের মুহূর্তে -কে কীভাবে শেষ করছেন জাতীয় দলের অধ্যায়।

লিওনেল মেসি ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় ৭ অক্টোবর ভোর ৫টায় বেনিনের বিপক্ষে এস্টাডিও মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার এই ম্যাচকে ঘিরে আর্জেন্টিনায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন। অন্যদিকে পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বেরিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ডেনমার্কের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচের আগে তার এই সিদ্ধান্ত নতুন করে মেসি-রোনালদো তুলনা সামনে এনেছে।

আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ ২১ বছরের ক্যারিয়ার শেষে মেসি জাতীয় দল থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন সতীর্থ ও সমর্থকদের ভালোবাসা নিয়ে। তার শেষ ম্যাচকে ঘিরে আলাদাভাবে বিদায়ী আয়োজন করা হয়েছে।

অন্যদিকে পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছর কাটানো রোনালদোর সম্ভাব্য বিদায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাকে ঘিরে কোচিং স্টাফের সঙ্গে টানাপোড়েনের আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় দল থেকে তার বিদায় হলে তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে হতে পারে। তবে রোনালদোর আনুষ্ঠানিক অবসরের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

জাতীয় দল থেকে বিদায়ের সময় মেসির অর্জনের তালিকায় থাকবে একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি ফাইনালিসিমার শিরোপা। বিশ্বকাপে তিনি দুবার রানার্সআপও হয়েছেন।

ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৩৯ বছর বয়সেও তিনি নিজের সেরা বিশ্বকাপ খেলেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১২৫।

জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ এই যাত্রা এবং অর্জনগুলোই মেসির শেষ ম্যাচকে কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং তার বিদায়কে পরিণত করেছে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের উদ্‌যাপনে।

পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর অর্জনও বিশাল। তিনি জিতেছেন ইউরো ২০১৬ এবং দুটি উয়েফা নেশন্স লিগ শিরোপা। জাতীয় দলের জার্সিতে ২৩২ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৪৬ গোল। ম্যাচ ও গোল -দুই ক্ষেত্রেই তার পরিসংখ্যান মেসির চেয়ে বেশি।

তবে জাতীয় দলের বর্তমান অধ্যায়টি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে অনেক বেশি বিতর্কের মধ্যে। কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে টানাপোড়েনের আলোচনা, কখনো শুরুর একাদশে থাকা আবার কখনো ম্যাচেই না খেলার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তার শেষ সময়টা কাটছে।

দলের ক্যাম্প থেকে যেভাবে বের হয়ে এসেছেন রোনালদো, তাতে জাতীয় দলে তার আর ফেরা হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফিরলেও মেসির মতো আনুষ্ঠানিক বিদায়ী সংবর্ধনা তার ভাগ্যে জুটবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।

দুই তারকার সম্ভাব্য বিদায়ের এই বৈপরীত্য তুলে ধরেছে স্প্যানিশ সংবাদপত্র মুন্দো দেপোর্তিভো। পত্রিকাটি তাদের প্রচ্ছদে লিখেছে, ‘৬ তারিখে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির দারুণ বিদায় এবং ক্রিশ্চিয়ানো পর্তুগাল ছাড়ছেন পেছনের দরজা দিয়ে।’

শিরোনামটিই ফুটিয়ে তুলেছে দুই কিংবদন্তির সম্ভাব্য বিদায়ের পার্থক্য। একজনের বিদায়ে থাকছে ভালোবাসা, উদ্‌যাপন ও আনুষ্ঠানিকতা; অন্যজনের সম্ভাব্য বিদায় ঘিরে রয়েছে বিতর্ক ও সংঘাত।

মেসি ও রোনালদোর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদায়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক কলম্বিয়ান ফুটবলার ভিক্টর হুগো আরিস্তিসাবাল।

তার মতে, মেসি আগে জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেওয়ায় রোনালদো হয়তো সেটি অনুসরণ করতে চাননি। তিনি বলেন, মেসি যখন ঘোষণা দিয়ে বললেন যে তিনি চলে যাচ্ছেন, তখন রোনালদো হয়তো ভেবেছেন, "আমি সেটা করব না, আমি মেসিকে অনুসরণ করব না।"

আরিস্তিসাবালের ধারণা, দুই তারকা এমনকি বিদায়ের ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। তার ভাষায়, "আমার কাছে মনে হয়, তারা এমনকি এটাতেও প্রতিযোগিতা করেছে।"

মেসি ও রোনালদোর জাতীয় দল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় তাই সামনে আনছে দুটি ভিন্ন গল্প। মেসির ক্ষেত্রে শেষ ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ২১ বছরের পথচলার উদ্‌যাপন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো সাফল্য সঙ্গে নিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সামনে বিদায় নেবেন তিনি।

রোনালদোর ক্ষেত্রে ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হলে তার পাশে থাকবে ইউরো ও নেশন্স লিগের শিরোপা, ১৪৬ গোল এবং ২৩২ ম্যাচের বিশাল পরিসংখ্যান। কিন্তু সেই বিদায় কীভাবে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সময়কালের দুই সেরা ফুটবল তারকার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় তাই একই সময়ে দাঁড়িয়ে দুই ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে -একদিকে ভালোবাসা ও উৎসব, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক। আর এ কারণেই জাতীয় দল থেকে মেসি ও রোনালদোর সম্ভাব্য বিদায়ও হয়ে উঠেছে তাদের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি আলোচিত অধ্যায়।