জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক এবং ওপেনার তামিম ইকবালের অবসর নিয়ে দেশের ক্রিকেটে একরকম লঙ্কাকাণ্ডই ঘটে যায়। ফিটনেস নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসানের “মন্তব্যের জেরে” ঘরের মাটিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের মাঝপথে ৬ জুলাই চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তামিম। বিষয়টি যে সবার কাছেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এসেছিল, সেটি না বলে দিলেও চলছে।
যদিও জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বর্তমান সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ২৮ ঘণ্টা পরই অবসর প্রত্যাহার করে নেন তামিম। ৩৪ বছর বয়সী এ বাঁহাতি ওপেনার আপাতত দেড় মাসের বিশ্রামে রয়েছেন। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া কাপে আবার দলে ফিরবেন তামিম।
অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর থেকে মাঠ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে তামিম দূরত্বই বজায় রেখেছেন। অবশেষে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এ ওপেনার নিজের নীরবতা ভেঙেছেন। তামিম তার দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়ে যাওয়া অবসর নিয়ে অনেক কিছুই বলেছেন।
অবসরকাণ্ডের পর থেকে কেমন আছেন?
তামিম ইকবাল: সত্যি বলতে কয়েকটা দিন খুবই কঠিনভাবে কেটেছে। মনে হয় না এখনও আমার মাথা থেকে বিষয়টি পুরোপুরি বের হয়েছে। পুরো ঘটনাটা আমার জন্য কঠিন ছিল।
খেলাটির প্রতি ভালোবাসা এবং পরে বাবার স্বপ্নপূরণের জন্য ক্রিকেট শুরু করি। ক্রিকেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে আমি অবসর নেওয়ার পরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমি কল্পনাতেও আনিনি। পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে আসা প্রতিক্রিয়া চমকপ্রদ ছিল। পুরো ঘটনাটি হজম করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল।
সবকিছুর পরও অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল। সংবাদ সম্মেলনে আমি কখনই কারও দিকে আঙুল তুলিনি। কারও দিকে আঙুল তোলার চেয়ে জাতীয় দলে আমার ১৬-১৭ বছরের ক্যারিয়ারকেই আমি বড় মনে করেছিলাম।
আরেকটা ব্যাপার হলো সিদ্ধান্তটা হুট করেই নিইনি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে এটি নিয়ে ভাবছিলাম এবং সংবাদ সম্মেলনের তিন-চার দিন আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমি আমার প্রতিকূলতার কথা প্রকাশ করতে চাই না, এটা ক্রিকেট বোর্ডের জানা উচিত। আমি পরিবার নিয়ে প্রথমে দুবাই এবং পরে চিকিৎসার জন্য ইংল্যান্ড যাব। ঢাকায় ফিরে বোর্ডে আমার রিপোর্টিং বসের (ক্রিকেট অপারেশন কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস) সঙ্গে কথা বলব। আমি তার সঙ্গে পুরো ঘটনা, আমার সিদ্ধান্তের কারণ, গত ছয়-সাত মাস ধরে আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি এবং কেন আমার অবসর নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল- সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই।
গণমাধ্যম বা অন্য কোনো পাবলিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে নয়, আমি বিসিবির সঙ্গে কথা বলতে চাই। পেশাদার হওয়া এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা অনেক কথা বলি এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমরা প্রায়ই তা অনুসরণ করি না। অফিস সিক্রেট বলে কিছু নেই। আমাদের সবসময় কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। কিন্তু কখনো কখনো সেই সীমারেখা অতিক্রম করা হয়। অতীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে আমি বোর্ডের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেছি কিন্তু সেটিও গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। এটা শুধু আমার সঙ্গেই নয়, আরও অনেক ক্রিকেটার এমনকি বোর্ড সদস্যদের সঙ্গেও ঘটেছে। ব্যাপারটি সবাইকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। এমন সময়ও গিয়েছে যখন জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে আপনি অনেক কিছু বলতে পারেন না।
আমি আশা করব ক্রিকেট অপারেশন্স প্রধানের সঙ্গে আমার যে আলোচনাই হোক না কেন, তা চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। জালাল ভাইয়ের ওপর আমার অনেক আস্থা আছে। আজ পর্যন্ত আমি তার সাথে অনেক বিষয় আলোচনা করেছি, যা কখনো বাইরে প্রকাশ করা হয়নি। তাই আমি তার সঙ্গে মুক্ত আলোচনার জন্য অপেক্ষা করছি এবং সেখান থেকে আমার ভবিষ্যৎ ঠিক করব।
আপনার আলোচনা কি শুধু ক্রিকেট অপারেশন্সের সঙ্গেই হবে?
তামিম ইকবাল: হ্যাঁ। আলোচনাটা শুধুমাত্র জালাল ভাইয়ের সঙ্গেই শুরু হবে। তবে বোর্ড এবং জালাল ভাই যদি মনে করেন যে এতে আরও বেশি লোকের অংশ নেওয়া উচিত, তাহলে এটি তাদের ব্যাপার। আমি সবসময় চেইন অব কমান্ডকে সম্মান করি। আমি জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার এবং আমার ডিরেক্ট বস হলেন জালাল ভাই। আমাকে যা কিছু করতে বা বলতে হবে, সেটা অবশ্যই তার এবং বিভাগের মাধ্যমে হতে হবে। হ্যাঁ, আমি বোর্ড সভাপতির সঙ্গেও ভাল যোগাযোগ বজায় রাখি। তবে আমি কখনোই চেইন অব কমান্ড ভাঙতে চাই না। আমি বলব না যে আমি শতভাগ চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে পেরেছি, তবে আমি সবসময় চেষ্টা করি।
কারা চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করছে না? ক্রিকেটাররা, দলের কর্মকর্তারা নাকি বোর্ডের সদস্যরা?
তামিম ইকবাল: আমি কথাটা সার্বিকভাবে বলেছি এবং কারো দিকে আঙুল তুলছি না। যারা এমনটা (চেইন অব কমান্ড অমান্য) করে, তারা নিজেরাই জানে তারা কারা। এ কারণেই আমি বললাম যে আমাদের মধ্যে কতজন চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করে, তা আমি নিশ্চিত না। চেইন অব কমান্ড মেনে চললে সবার সম্মান অটুট থাকে। কিন্তু এমন কিছু লোক আছে যারা প্রায়শই এটি ভঙ্গ করে। আমি ক্রিকেট অপারেশন্সের সঙ্গে কথা বলব এবং তারা ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের অধিকার রাখেন। তবে আমি কখনোই সীমে অতিক্রমের মাধ্যমো এমন কিছু করব না, যা নৈতিকভাবে সঠিক নয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আপনি অবসরের সিদ্ধান্ত তুলে নিয়েছেন। সেই বিষয়ে একটু বলবেন?
তামিম ইকবাল: আমি যুক্তিযুক্ত কারণেই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং যথোপযুক্ত কারণেই ক্রিকেটে ফিরে এসেছি। ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ১০-১৫ মিনিট কথা হবে। ওনার মতো একজন ব্যস্ত ব্যক্তির পক্ষে আমার পেছনে ১০ মিনিট সময় ব্যয় করা অনেক বড় বিষয়। কিন্তু ওনার সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক চলে এবং এর মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা তিনি আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। আমার অবসরের সিদ্ধান্তের পেছনের সব সমস্যা এবং কারণ আমি ওনাকে খুলে বলেছিলাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি শুনতে চেয়েছিলেন বলেই তাই তাকে সব বলতে হয়েছে।
আমার সমস্যা শুনে তিনি ওনার ব্যক্তিগত মতামত জানিয়েছেন, যা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত বলে আমার মনে হয় না। আমি কেন অবসর নিয়েছি এবং কীভাবে এটি আমার জন্য ভালো হবে, সেটা আমি ওনাকে কিছুটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি।
তিনি আমাকে অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বলেন এবং আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রীকে না বলার মতো কেউ নেই। আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বলার পেছনে ওনার শক্ত যুক্তি ছিল। আর ওনার কথাই শেষ কথা। ওনার আদেশকে না বলা অসম্ভব। যারা আমাকে ভালো করে চেনেন, তারা জানেন যে আমি সহজে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি না। আমি যখন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছিলাম, তখন আমাকে ফেরানোর জন্য প্রচুর অনুরোধ করা হয়েছিল ছিল। সবাই তা জানে। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিনি। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আপনাকে কিছু বলেন, তখন তা অন্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়।
মাশরাফি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তখন কি আপনার মনে হয়েছিল অবসরেন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে?
তামিম ইকবাল: সংবাদ সম্মেলনের পর থেকেই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে মাশরাফি ভাই টানা যোগাযোগ রেখেছিলেন। তিনি আমাকে মেসেজও দিয়েছিলেন কিন্তু ফোন দেননি। কারণ তিনি জানতেন যে আমি কী অবস্থায় আছি। তিনিও অনুরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাই তিনি ভালো করেই জানেন যে কথা বলার খুব বেশি কিছু নেই।
পরদিন (শুক্রবার, ৭ জুলাই) যখন আমি আমার ঢাকার বাসায় পৌঁছাই, তখন খেয়াল করলাম সে আমাকে ফোন করেছেন। তাই আমি তাকে আবার ফোন দিই। তিনি প্রথমে আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কোথায় আছি এবং আমাকে বললেন প্রধানমন্ত্রী আমাকে খুঁজছেন। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যাই।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার আলোচনা কি শুধু ক্রিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল?
তামিম ইকবাল: সত্যি বলতে অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে। বৈঠকটি তিন ঘণ্টার মতো দীর্ঘ ছিল। তাই অবশ্যই সেখানে আলোচনার অনেক বিষয় ছিল। তাই ক্রিকেট ছাড়াও খেলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আমাকে কিছু বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। যা ঘটছে তিনি সেসবের অনেক কিছুই জানেন এবং আমি এই সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে চাই না।
অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর ট্রলের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে কিছু ভেবেছিলেন?
তামিম ইকবাল: দেখুন পুরো বিষয়টি ২৮-২৯ ঘণ্টার মধ্যে হয়েছে। তাই ভাবার মতো সময় আমার কাছে ছিল না। আমি আবেগের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম। প্রধানমন্ত্রী আমাকে অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বলেছিলেন। তাই কে কী বলছে এবং সমালোচনা করছে, তা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আমি অবসর নিয়েছিলাম কারণ আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর আমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল কারণ আমার পক্ষে না বলার মতো কোনো কারণ ছিল না। আমরা এখানে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথা বলছি।
সিরিজের মাঝপথে আপনার অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক কথা হয়েছে…
তামিম ইকবাল: আগেই বলেছি, গত সাত-আট মাস ধরে আমি এই (অবসর) কথা ভাবছি। কিন্তু সত্যি বলতে কি ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে সহজ বলে মনে হয়নি। নিজেকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে ঠেলে দিয়ে আমি এখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। তবে এই সিরিজের সময় আমি ভেবেছিলাম, যথেষ্ট হয়েছে।
ক্রিকেটের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, ব্যাপারটি আমার রান না পাওয়ার বিষয়টিও না। গত তিন সিরিজে আমি ভালো করতে পারিনি। কিন্তু সেটা আমার অবসরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত না।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডের সময়ে ড্রেসিংরুমে কি এমন কিছু হয়েছিল, যা আপনাকে অবসরের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছিল?
তামিম ইকবাল: এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাবনা সম্পর্কে সতীর্থরা জানত না, এমনকি আমার ভাইও (জাতীয় দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবাল) না। খুব গভীর রাতে তিনি এ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন এবং সেও এতে হতবাক হয়েছিল।
চট্টগ্রামে প্রেস কনফারেন্সের জন্য হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় কি সতীর্থদের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?
তামিম ইকবাল: আগের দিন রাতে যখন আমি সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছিলাম, তখন অনেক গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই কয়েকজন খেলোয়াড় আমার রুমে এসেছিল। তাদের অনেকেই সংবাদ সম্মেলনের পর আমাকে মেসেজ দিয়েছেন। মুশফিকুর রহিম আমাকে ক্রমাগত মেসেজ করেছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমি তাকে উত্তর দিতে পারিনি। এজন্য তার কাছে পরে ক্ষমাও চেয়েছিলাম।
অনেকেই বলছে, ফিটনেস নিয়ে বিসিবি সভাপতির সাক্ষাৎকার আপনার আকস্মিক অবসরের সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে...
তামিম ইকবাল: প্রথমত, আমি পরিষ্কার করে দিতে চাই যে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে এমন কোনো কারণ ছিল না। আমি আগেই বলেছি, এ ধরনের মন্তব্য কারও ভালো লাগবে না। কিন্তু এটাও বলেছি যে ওই সাক্ষাৎকারটি (বিসিবি সভাপতির) আমার অবসর নেওয়ার কারণ না।
দ্বিতীয়ত, এই পৃথিবীতে কেউই নিখুঁত নয়। আমিও একজন নিখুঁত মানুষ নই। আমার মধ্যে ভালো-খারাপ দুটো দিকই আছে। আমার মধ্যে সুবিধা এবং দুর্বলতা দুটোই আছে। কিন্তু কেউ যদি আমার ভালো চায়, আমি মনে করি অন্য কাউকে বলার আগে তার উচিত আমাকে বলা। যদি আমার ফিটনেস এবং কাজের নৈতিকতা নিয়ে সমস্যা থাকে, তাহলে আমাকেই আগে জানানো উচিত। আমাকে সময় দেওয়া উচিত এবং আমার পরিবর্তন না হলে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু আমার সাথে কথা না বলে এটা নিয়ে আলোচনা কখনোই ঠিক না।
শতভাগ ফিট না হওয়ার পরও আফগানিস্তানের বিপক্ষে আপনার প্রথম ওয়ানডে খেলতে চাওয়ার পরই বিসিবি সভাপতির মন্তব্য এসেছিল। প্রথম ওয়ানডেতে আপনার খেলাটা কি দলগত সিদ্ধান্ত ছিল?
তামিম ইকবাল: আমি এ বিষয়ে ভেতরের পুরো কথা বলতে পারব না। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটে কি কেউ নিজে জোর করে মূল একাদশে ঢুকতে পারে? আপনি দলের অধিনায়ক বা তারকা খেলোয়াড় হলেও কিছু যায় আসে না।
কোচ, টিম ম্যানেজমেন্ট বা মেডিকেল বোর্ড না চাইলে কি জোর করে মাঠে নামা সম্ভব? ড্রেসিংরুমের কেউ না চাইলে আমি ম্যাচটি খেলতে পারতাম না। এটা কখনোই সম্ভব না।
ফিট হওয়া এবং ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কি একই জিনিস? বিশ্বের কতজন ক্রিকেটার শতভাগ ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে খেলে? একজন খেলোয়াড়কে অনেক কিছুর সঙ্গেই লড়তে হয়। এমনকি অনেকে ৮০% ম্যাচ ফিটনেস নিয়েও মাঠে নেমে যায়। যখন আমি বলেছিলাম, আমি শতভাগ ফিট নই তবে খেলব- এর মানে হলো আমি মাঠে নামার জন্য যথেষ্ট ফিট এবং সিদ্ধান্তটি দলের পক্ষ থেকেই এসেছে। ফিটনেস পরীক্ষা নেওয়া মেডিকেল টিমের একজন ব্যক্তিও যদি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে থাকতো, তাহলে গল্পটি ভিন্ন হতো।
আমি আবারও বলতে চাই- বোর্ড সভাপতির মন্তব্যের কারণে আমি অবসর নিইনি। হ্যাঁ, তার মন্তব্য আমার ভালো লাগেনি কিন্তু সেটি অবসরের কারণ ছিল না।
আপনি দীর্ঘদিন ধরে পিঠের চোটের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। কবে নাগাদ পুরোপুরি সেরে উঠতে সক্ষম হবেন?
তামিম ইকবাল: এটা নিয়ে আমার কাজ করতে হবে। গত বছরের ডিসেম্বরে ভারত সিরিজ থেকে পিঠের চোট নিয়ে কাজ করছি। আমি প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি করে ড্রেসিংরুমে ফিরে এসে প্রথমে পিঠে ব্যথা অনুভব করি এবং ম্যানেজমেন্টকেও মেটি জানাই। সমস্যা হলো- আমার পিঠ থেকে ব্যথাটা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই আমি ভারত সিরিজ মিস করেছিলাম।
তারপর আমি ইনজেকশন নিয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) খেলেছিলাম। কিন্তু ১০টি ম্যাচ খেলার পর আমাকে থামতে হয়েছিল। কারণ আমি আবার ব্যথা অনুভব করছিলাম। সামনে ইংল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ থাকায় আমি কোনো ঝুঁকি নিইনি। ওই সিরিজগুলোতে আমি ভালোই বোধ করছিলাম।
সম্প্রতি আমি যখন জিমে কাজ করছিলাম, তখন আবার চোট দেখা দেয়। এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত- আমি জিমে যে ব্যায়াম করছিলাম, তা সঠিক নাকি ভুল? কেন আমাকে এমন একটি অনুশীলন করতে দেওয়া হয়েছিল, যা আমার করা উচিত নয়? কেন আমাকে ব্যায়ামের একটি রুটিন দেওয়া হয়নি, যাতে আমার পিঠের ক্ষতি হবে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও আমাদের খুঁজে বের করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আপনি বিসিবি সভাপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। উনি বলেছেন, তার আগের রাতে তিনি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না...
তামিম ইকবাল: আমাদের মধ্যে খুব স্বাভাবিক আলোচনা হয়েছিল। আমি মনে করি, পাপন ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ক্রিকেট বিষয়ে এবং সেটা ক্রিকেটের মধ্যেই থাকা উচিত। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রধান। তাই তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক একজন বোর্ড সভাপতি এবং একজন ক্রিকেটারের মধ্যকার সম্পর্কের মতোউ হওয়া উচিত। তাই সেটার ওপর ভিত্তি করে আমাদের আলোচনা হয়েছিল।
পরিস্থিতির কারণে আপনার কাছে মানুষের প্রত্যাশা এখন আরও বেশি। এটা কি বাড়তি চাপের?
তামিম ইকবাল: সবসমইয় প্রত্যাশার চাপ থাকে। এখন আরেকটু বেশি হবে, এই আর কী। এখন এসব ভেবে লাভ নেই। সত্যি বলতে ভাবতেও ইচ্ছে করে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বোর্ডের সঙ্গে অবসরের কারণ নিয়র কথা বলা। এসব না বদলালে আমার অবস্থা আবার আগের মতোই হবে।
আমার ভাবনায় অবশ্যই এমন কিছু আছে, যা আমি জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে চাই না। বিষয়গুলো বোর্ডের জানা উচিত। বোর্ডের সঙ্গে আমার বৈঠকের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
ধরা যাক, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েও এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপে ভালো কিছু করতে পারলেন না। এমনটা হওয়া এবং আপনার অবসর সুখকর না হওয়ার চিন্তা কি আপনাকে ঘিরে ধরে?
তামিম ইকবাল: আসলে তা না। এখন পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো অর্থ নেই। আমি ইতোমধ্যে নিজের অবসর দেখেছি। আমি আবার অবসর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করব না। সেই অংশটি হয়ে গেছে।
সেদিন যে সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম, তার চেয়ে সত্যি আর কিছু হতে পারে না। চোখের পানি এবং আবেগ আড়াল করা যায় না। এটি আমার জন্য একটি খুব আবেগমময় ঘটনা ছিল। এখন আমার মূল লক্ষ্য হলো মাঠে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করা। আমি যদি এক থেকে ১০ বা ২০ ম্যাচ খেলি এবং যখন আমার মনে হবে অবসর নেওয়া উচিত, তখন খুব সহজ উপায়ে আমি খেলা ছেড়ে দেব।
বিসিবির সঙ্গে বৈঠকের আগে আপনার পরিকল্পনা কী?
তামিম ইকবাল: দুবাইয়ে আমি কিছুদিন পরিবারের সঙ্গে কাটাব। তারপর আমি চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য লন্ডনে যাব। আমার দুজন চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে। তাই চিকিৎসকদের মতামতের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আমি ঢাকায় ফিরে আসার পর কয়েকদিনের জন্য ছুটি কাটাব এবং তারপর বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করব।