নিজেদের সমর্থক, চেনা ঘাস আর দারুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে চলমান ইউরোয় উড়ন্ত যাত্রা শুরু হয়েছে স্বাগতিক জার্মানির। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে এবারের টুর্নামেন্টের ‘ব্ল্যাক হর্স’ খ্যাত হাঙ্গেরিকে ২-০ ব্যবধানে হারায় তারা। তবে গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে স্বাগতিকদের মাটিতে নামিয়েছে সুইজারল্যান্ড।
ফ্রাঙ্কফুর্টের ডয়চে ব্যাংক পার্কে রবিবার রাতের ম্যাচটি ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয়েছে।
ম্যাচের ২৮তম মিনিটে উইঙ্গার ডান এনডয়ের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর স্বাগতিকদের প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল সুইজারল্যান্ড। তবে শেষের নাটকীয়তায় কোনোমতে এক পয়েন্ট আদায় করে মাঠ ছেড়েছে ইউলিয়ান নাগেলসমানের শিষ্যরা।
এই ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকেই শেষ ষোল নিশ্চিত করেছে জার্মানি। আর তিন ম্যাচে একটি জয় ও দুটি ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে নকআউট পর্বে উঠেছে সুইসরা।
দিনের অন্য ম্যাচেও শেষ মুহূর্তের গোলে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে তিনে রয়েছে হাঙ্গেরি। চারটি গ্রুপের তৃতীয় দল থেকে সেরা দলটির পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ থাকায় কার্যত এখনও টুর্নামেন্টে টিকে রয়েছে তারা। তবে তিন ম্যাচ থেকে মাত্র ১ পয়েন্ট সংগ্রহ করে বিদায় নিতে হয়েছে স্কটিশদের।
ফ্রাঙ্কফুর্টে ম্যাচের প্রথম মিনিটেই দারুণ আক্রমণে যায় জার্মানি। একের পর এক সুইস খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে বল নিয়ে এগিয়ে যান বায়ার্ন মিউনিখের ২১ বছর বয়সী প্রতিভাবান উইঙ্গার জামাল মুসিয়ালা। বক্সের মধ্যে ঢুকতে থাকা ইলকাই গুনডোগানকে তিনি পাস দিলে প্রথম ছোঁয়াতেই গোল পাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু রক্ষণে কাটা পড়ে বল বাইরে বেরিয়ে যায়। ফলে কর্নার কিক পায় জার্মানি।
কর্নার থেকে টনি ক্রুসের পাঠানো ক্রসটি কাছের পোস্টের কাছে মোটামুটি ফাঁকায় থাকা কাই হাভার্টসের কাছে চলে আসে। তিনি হেড দিলে সরাসরি সুইস গোলরক্ষক ইয়ান জমারের কাছে চলে যায়। এর ফলে গোল খেয়ে ম্যাচ শুরু করার অবস্থা থেকে রেহাই পায় সুইজারল্যান্ড।
এরপর দ্বাদশ মিনিটে দুটি দারুণ সুযোগ তৈরি করে জার্মানি। প্রথমটি সুইজারল্যান্ডের রক্ষণে প্রতিহত হলেও কয়েক সেকেন্ড পর ফের বাঁ পাশ ধরে এগিয়ে গিয়ে বক্সের মধ্যে এগিয়ে যাওয়া হাভার্টসকে ক্রস বাড়ান বায়ের লেভারকুজেনের তরুণ প্রতিভা ফ্লোরিয়ান ভিয়ার্টস। তবে ফের ডিফেন্ডাররা তার কাজ দুরুহ করে দেয়।
এর পরের মিনিটে ম্যাচে প্রথম গোলের সুযোগ তৈরি করে সুইজারল্যান্ড। কাউন্টারে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেও শেষ স্পর্শটি জোরালো হয়ে যাওয়ায় নয়ার দৌড়ে এসে বল কুড়িয়ে নেন।
এরপর সপ্তদশ মিনিটে গোল পেয়ে উল্লাসে মাতে জার্মানি। তবে ভিএআরের হস্তক্ষেপে তাদের আনন্দ মাটি হয়ে যায়।
ষোড়শ মিনিটে বাঁ পাশ দিয়ে বল নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে বক্সের মধ্যে ভয়ঙ্কর এক পাস দেন জার্মান ফুলব্যাক মাক্সিমিলিয়ান মিটেলস্টেডট। মুসিয়ালা বলটি রিসিভ করার সময় একজন ডিফেন্ডার তা ক্লিয়ার করেন। তবে বক্সের বাইরে থেকে বল পেয়ে কাছের পোস্ট ঘেঁষে শট নেন রবার্ট আন্ডরিখ। জমার চেষ্টা করেও গোল আটকাতে পারেন না। তবে ভিএআর রিভিউতে দেখা যায়, বলটি যখন সুইস ডিফেন্ডার আইবিশার ক্লিয়ার করছেন, তখন মুসিয়ালা তাকে ফাউল করেন। ফলে গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
২৭তম মিনিটে জার্মানির আরও একটি ভালো সুযোগ ভয়ঙ্কর ওঠার আগেই গোলপোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে শট দিয়ে নষ্ট করেন ক্রুস।
এসময় খেলার গতি কিছুটা কমিয়ে দিতে চেষ্টা করে সুইজারল্যান্ড। কিন্তু তার মধ্যেই ছোট ছোট পাসে এগিয়ে গিয়ে নয়ারকে পরাস্ত করেন এনডয়ে। উল্লাসে মাতে গ্যালারির এক কোণে পড়ে থাকা সুইজারল্যান্ডের লাল অংশটি।
বাঁ পাশে ডি বক্সের সামান্য বাইরে থেকে সতীর্থের কাছ থেকে পাস ধরেই বক্সে ঢুকে জোরালো শট নেন রেমো ফ্রয়লার। শটটি নিচু হওয়ায় ৬ গজ বক্সের সামনে থেকে নয়ার ধরতে যাওয়ার আগমুহূর্তে বুট দিয়ে বলটি উপরের জালে জড়িয়ে দেন এনডয়ে।
গোলের উদ্দেশে প্রথম শটেই সফলতা পেয়ে যায় সুইজারল্যান্ড। এর ফলে ম্যাচের ২৯তম মিনিটে প্রথমবারের মতো এগিয়ে যায় তারা।
এর দুই মিনিট পর ফের কাউন্টারে গিয়ে ফাঁকায় বল পেয়ে যান এনডয়ে। তবে বেশ দূর থেকে দূরের পোস্টে কোনাকুনি শট নিলে নয়ারের আওতার বাইরে দিয়ে গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে বল বেরিয়ে যায়। এসময় জার্মানির সঙ্গে সমানে লড়াই চালিয়ে যায় আত্মবিশ্বাসী সুইজারল্যান্ড।
৪০তম মিনিটে ক্রুস বক্সের ভেতর থেকে দূরের পোস্টে মাথার ওপর ক্রস দিলে তাতে ঠিকমতো মাথা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন আন্টোনিও রুডিগার। পরের মিনিটে জার্মানির আরও একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এক গোলে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই জমে ওঠে খেলা। বল দখল, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে মাঠের লড়াই তুঙ্গে ওঠে।
দ্বিতীয় মিনিটেই গোল পেয়ে যাচ্ছিল সুইজারল্যান্ড। আক্রমণে উঠে দুই জার্মান খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে আরও তিন ডিফোন্ডারের মাঝ দিয়ে চুলচেরা পাস দেন ব্রিল এমবলো। কিন্তু বক্সের মধ্যে বলটি রিসিভ করার পর পিছলে পড়ে যান ফাবিয়ান রিইডার। পরের মিনিটে আরও একটি আক্রমণ শানায় সুইজারল্যান্ড। তবে তা থেকেও গোল আদায় করতে ব্যর্থ হন এমবলো।
৫১তম মিনিটে প্রথম ভালো সুযোগ পায় জার্মানি। কাউন্টারে গিয়ে বক্সের সামনে থেকে মুসিয়ালা জোরালো শট নিলে তা প্রতিহত করেন জমার।
৫৪তম মিনিটে ডি বক্সের কিছুটা বাইরে থেকে বুলেট শট হানেন ক্রুস, কিন্তু বল পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে থাকলেও ইউরোতে এখনও গোল করতে না পারার আক্ষেপে পোড়েন ক্রুস।
৫০তম মিনিটের পর থেকে দুপাশেই বারবার বল নিয়ে আক্রমণে গেলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দেখা পাচ্ছিল না কোনো দল। এভাবে গড়িয়ে যায় প্রায় ২০ মিনিট।
তবে ৭০তম মিনিটে একটি আক্রমণ থেকে নিশ্চিত গোলবঞ্চিত হয় জার্মানি। সতীর্থের বাড়ানো পাস ছয় গজ বক্সের কোণা থেকে ধরে শট নেন বদলি নামা মিডফিল্ডার মাক্সিমিলিয়ান বায়ার। শটটি ম্যানচেস্টার সিটির সুইস ডিফেন্ডার মানুয়েল আকাঞ্জির পায়ে ঠেকে গেলে নিশ্চিত গোলবঞ্চিত হয় জার্মানি। এরপর তা সামনে থাকা কিমিখের কাছে গিয়ে পড়ে। তবে সেখানে অসাধারণ দক্ষতায় কিমিখকে নিষ্ক্রিয় করে দেন আরেক সুই ডিফেন্ডার। ফলে আরও একবার হতাশ হয় জার্মানি।
এসময় থেকে গোল পেতে হন্যে হয়ে ওঠে জার্মানরা। মুহুর্মুহু আক্রমণে সুইজারল্যান্ডকে কোণঠাসা করে ফেলে তারা। প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলেও খুব বেশি সময় তা স্থায়ী হচ্ছিল না। আর বল নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের গোলের সামনে চলে যাচ্ছিল ইউলিয়ান নাগেলসমানের শিষ্যরা। কিন্তু গোলমুখে সুইস ডিফেন্ডারদের অটুট রক্ষণ কোনোভাবেই ভাঙতে পারছিল না তারা। এর মাঝে বল পেলেই পালটা আক্রমণে গিয়ে ভীতি ছড়াচ্ছিল সুইসরা।
৮১তম মিনিটে ডি বক্সের বাঁ পাশে ফ্রি কিক পেয়ে বক্সের একেবারে ভেতরে ক্রস দেন ক্রুস। জমার মুষ্টি দিয়ে বল ফিরিয়ে দিলে ডানপাশে বক্সের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা লেরয় জানে পেয়ে যান। তবে তিনি শট নেওয়ার আগেই তার সামনে চলে আসেন একজন ডিফেন্ডার।
দুই মিনিট পর গুনডোগানের দূরের শট ঠেকিয়ে দেন জমার। এর কয়েক সেকেন্ড পর কাউন্টারে গিয়ে চকিতে বল জালে জড়িয়ে দেন বদলি নামা সুইস ফরওয়ার্ড রুবেন ভারগাস। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হওয়ায় জার্মানদের ম্যাচে ফেরার আশা বেঁচে থাকে।
পরের মিনিটে কর্নার থেকে আসা জার্মানির ক্রসে দারুণ হেডার দিলে তা ওপরের পোস্টের ওপরের পাশে লেগে বেরিয়ে যায়।
৮৮তম মিনিটে সুইজারল্যান্ডের আরেকটি পাল্টা আক্রমণ থেকে পোস্ট ঘেঁষে দারুণ একটি বাঁকানো শট নেন সুইস অধিনায়ক গ্রানিট জাকা। বলটি পোস্টের বাইরে থেকে শেষ মুহূর্তে ভেতরে ঢুকছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দিয়ে দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকিয়ে রাখেন নয়ার।
নির্ধারিত সময় শেষ হলে অতিরিক্ত চার মিনিট খেলার সুযোগ দেন রেফারি। অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ গড়াতেই গোল পেয়ে যায় জার্মানি।
বক্সের বাইরে বাঁ পাশ থেকে ফাঁকায় থাকা ডেভিড রাউম ছয় গজ বক্সের মধ্যে ক্রস দেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ছাড়িয়ে ওপরে উঠে হেডারে বল লক্ষ্যে পাঠিয়ে দেন নিকলাস ফুলক্রুগ। ফলে প্রথমবার ম্যাচে সমতায় ফেরে জার্মানি। আর উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।
এরপর দুইপক্ষে আর কোনো গোল না হলে ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয় ম্যাচটি। জমাট রক্ষণে ৬৪ মিনিট ধরে জার্মানদের আক্রমণাত্মক ফুটবল আটকে রেখেছিল সুইজারল্যান্ড। তবে শেষ মুহূর্তের একটি ভুলে তাদের সব প্রচেষ্টা জলে যায়।
মূলত ফুলক্রুগের গতিবিধি প্রথমে ট্র্যাক করতে পারেনি সুইস ডিফেন্ডাররা। ফলে তিনি বিপজ্জনক অবস্থানে চলে আসেন, আর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারা কিছু করে ওঠার আগেই কাজ সেরে ফেলেন। পুরো ম্যাচজুড়ে এই একটি দৃশ্যমান ভুল করে সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা। তার খেসারত দিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান ছেড়ে দিতে হলো তাদের।
জিততে না পারায় সুইসদের ৮৬ বছরের আক্ষেপ আক্ষেপই থেকে গেল। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানদের সর্বশেষ হারায় প্রতিবেশী এই দেশটি। সেবার গ্রুপ পর্বের প্রথম লেগ ১-১ গোলে সমতার পর ফিরতি লেগে জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোল নিশ্চিত করে সুইজারল্যান্ড। তার পর থেকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জার্মানির বিপক্ষে আর জিততে পারেনি সুইজারল্যান্ড।
এদিন ১৮ বার সুইজারল্যান্ডের গোলে শট নিয়েছে জার্মানি, যার মাত্র তিনটি লক্ষ্যে রাখতে পারে তারা। অন্যদিকে, চারটি শট নিয়ে তিনটিই লক্ষ্যে ছিল সুইসদের। এর মধ্যে একটি গোল, একটি অফসাইডে বাতিল গোল ও একটি শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন মানুয়েল নয়ার।