বয়স চল্লিশ পেরিয়ে একচল্লিশে পা দিলেও যেন থামার নাম নেই ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর, না আছে তার পারফরম্যান্সে ভাটার টান। এমনই আরও একটি উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের রাতে অনন্য মাইলফলক ছুঁয়ে দেশকে আরও একবার নেশন্স লিগের ফাইনালে তুলেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।
মিউনিখের আলিয়ান্স আরেনায় বুধবার (৪ জুন) রাতে উয়েফা নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে জার্মানিকে তাদের মাঠেই ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে প্রতিযোগিতাটির প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়নরা।
এই জয়ে পর্তুগালের জার্সি গায়ে প্রথমবার জার্মানিকে হারাতে পারলেন রোনালদো। আর আরাধ্য এই জয় পেতে তার লাগল ৪০ বছর ১১৯ দিন। জাতীয় দলের জার্সিতে ২২০তম ম্যাচ খেলতে নেমে এই কীর্তি গড়েন তিনি।
ক্রিকেটপাড়ায় ১৮ বছর ধরে শিরোপার প্রতীক্ষায় থাকা বিরাট কোহলির হাতে আইপিএল ট্রফি ওঠা নিয়ে যখন চারদিক থেকে প্রশংসার ধারা বইছে, তার মধ্যেই ক্রিকেট কিংবদন্তির ফুটবল জগতের আদর্শ ২৫ বছর পর দলকে এনে দিলেন বিরল এই জয়।
হ্যাঁ, সবশেষ ২০০০ সালের ২০ জুন ইউরোর গ্রুপ পর্বে ৩-০ গোলে জার্মানিকে হারিয়েছিল পর্তুগাল। এর মাঝে ২৫টি বছর কেটে গেছে। দুই দলের দেখা যে এর মধ্যে হয়নি তা নয়। তবে ওই সময়ের পর থেকে পাঁচবারের দেখায় সবকটি ম্যাচে হারের তেতো স্বাদ নিতে হয়েছে পর্তুগিজদের, আর জার্মানি জয়ের আকাঙ্ক্ষা কেবল দীর্ঘই হয়েছে রোনালদোর।
এবার সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দলকে ফাইনালে তুলেছেন শ্রমকে সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এই অনন্য ফুটবলার।
তুলনামূলক শক্তিশালী একাদশ ও স্কোয়াড নিয়েও এদিন প্রথমার্ধে স্বাগতিকদের সামনে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি পর্তুগাল। গোলের জন্য এই সময়ে চারটি শট নিয়ে কেবল একটি লক্ষ্যে রাখতে পারেন দিয়েগো মার্তিনেসের শিষ্যরা, বিপরীতে সাতটি শটের চারটি লক্ষ্যে ছিল জার্মানির। বল দখলের লড়াইয়েও প্রথমার্ধে জার্মানরা কিছুটা এগিয়ে ছিল (৫৬/৪৪%)।
এরপর বিরতির পর মাঠে নেমেই ফ্লোরিয়ান ভিয়ার্টসের অসাধারণ হেডার থেকে স্বাগতিকরা এগিয়ে গেলে মনে হচ্ছিল, মুসিয়ালা-মুলারবিহীন দলটির কাছেও হারবে পর্তুগালের এমন প্রতিভাবান স্কোয়াড। তবে কিছুক্ষণ পর থেকেই যেন এই কথার প্রতিদান দিতে শুরু করেন ব্রুনো ফের্নান্দেসরা। বল দখলে সমানে সমান লড়াই চালিয়ে গেলেও আক্রমণে জার্মানদের একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেন তারা।
৬৩তম মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে দলকে সমতায় ফেরান দলটির তরুণ ফরোয়ার্ড ফ্রান্সিসকো কনসেইসিয়াও। প্রায় মাঝমাঠে ডান দিকের বাইলাইনের কাছাকাছি থেকে রুবেন দিয়াসের পাস ধরে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের বাধা এড়িয়ে এগিয়ে যান তিনি। এরপর ২০ গজ দূর থেকে নিখুঁত জোরালো শটে ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন বল।
২০০০ সালে সবশেষ জেতা ম্যাচে জার্মানদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ফ্রান্সিসকোরই বাবা সের্জিও কনসেইসিয়াও। ২৫ বছর পর দলের জয়ে ফের একবার তার সন্তানই বেঁধে দেন জয়ের সুর।
সমতায় ফেরার পাঁচ মিনিট পরই জয়সূচক গোলটি করেন রোনালদো। বাঁ দিক থেকে নুনো মেন্দেসের পাস পেয়ে ছয় গজ বক্সের বাইরে থেকে আলতো শটে ফাঁকা জালে বল পাঠান তিনি।
এর ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি আরও একটু উঁচুতে তুললেন রোনালদো। পর্তুগালের জার্সিতে তার গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩৭টি, আর এবারের নেশন্স লিগে আট ম্যাচে গোল হলো সাতটি। তবে জার্মানির বিপক্ষে এটি তার কেবল দ্বিতীয় গোল।
এগিয়ে যাওয়ার পর আরও বেশ কয়েকটি ভালো আক্রমণ শানিয়েছিল পর্তুগাল, তবে মার্ক আন্দ্রে টের-স্টেগের অসাধারণ নৈপুণ্যে ব্যবধান আর বড় হয়নি। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট বাকি থাকতে অসাধারণ ডবল সেভ করেন বার্সেলোনায় সম্প্রতি তীব্র সমালোচনা সহ্য করা এই গোলরক্ষক। কিন্তু এই পারফরম্যান্সের প্রতিদান দিতে পারেননি তার আক্রমণভাগের সতীর্থরা।
ফলে ঘরের মাঠে হেরে এবারের নেশন্স লিগের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে ইউলিয়ান নাগেলসমানের শিষ্যদের। আর চতুর্থ আসরের প্রথম ফাইনালিস্ট হিসেবে জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে পর্তুগাল।
বৃহস্পতিবার রাতে অপর সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে দ্বিতীয় আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। বিজয়ী দল আগামী রবিবার (৮ জুন) পর্তুগালের মুখোমুখি হবে।