গাছের শরীরে জোনাকির ডিএনএ, বিজ্ঞানীদের চাঞ্চল্যকর সফলতা

ভবিষ্যতের শহরগুলো হয়তো আর কৃত্রিম সোডিয়াম বা এলইডি বাতির আলোয় নয়, বরং আলোকিত হবে সারিবদ্ধ গাছপালার প্রাকৃতিক আলোয়! সায়েন্স ফিকশন বা ‘অ্যাভাটার’ চলচ্চিত্রের কাল্পনিক ‘প্যান্ডোরা’ গ্রহের মতো অন্ধকারে আলো ছড়াতে সক্ষম, এমন ২০টি প্রজাতির উদ্ভিদ জিন প্রকৌশলের (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং) মাধ্যমে সফলভাবে তৈরি করেছেন একদল চীনা গবেষক।

‘ম্যাজিকপেন বায়ো’ নামের একটি শীর্ষস্থানীয় জৈবপ্রযুক্তি (বায়োটেকনোলজি) প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এই অসাধ্য সাধন করেছেন। তারা কোনো নতুন উদ্ভিদ আবিষ্কার করেননি, বরং আমাদের চেনা অর্কিড, সূর্যমুখী ও চন্দ্রমল্লিকার মতো ২০টি পরিচিত উদ্ভিদের কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলোকে আলোকোজ্জ্বল সংস্করণে রূপান্তর করেছেন।

ইউরোপীয় গণমাধ্যম ‘ইউরোনিউজ’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে এই উদ্ভিদগুলোর কোষে জোনাকি পোকার জিন এবং প্রাকৃতিকভাবে আলো উৎপাদনকারী বিশেষ এক ধরণের ছত্রাকের ডিএনএ সফলভাবে সংযোজন করেছেন। জোনাকির এই জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে উদ্ভিদগুলো কোনো প্রকার বিদ্যুৎ বা বাহ্যিক জ্বালানি ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তিতে নরম ও দৃশ্যমান আলো নির্গত করতে পারছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই আলো তীব্র বা চোখধাঁধানো নয়; বরং এটি একটি স্থির, মৃদু ও পরিবেশবান্ধব আভা সৃষ্টি করে, যা সড়কবাতির চেয়ে মৃদু রাতের বাতির (নাইট লাইট) মতো অনুভূতি দেয়।

জৈব-আলোক উৎপাদনকারী উদ্ভিদের ধারণা নিয়ে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে ‘ফায়ারফ্লাই পেটুনিয়া’ নামের একটি আলোকোজ্জ্বল ইনডোর প্ল্যান্ট বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার পর সাধারণ মানুষের মাঝে এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। তবে আগের উদ্যোগগুলো ঘরের কোণে সাজিয়ে রাখার মতো ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ‘ম্যাজিকপেন বায়ো’-এর লক্ষ্য অনেক বড়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা লি রেনহান এমন একটি ভবিষ্যতের রূপরেখা দিয়েছেন, যেখানে শহরের বড় বড় পার্ক, উদ্যান এবং রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের বিকল্প হিসেবে এই জীবন্ত উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করা হবে। এর ফলে রাতের বেলায় শহরগুলো যেমন সবুজ ও নান্দনিক হয়ে উঠবে, ঠিক তেমনি বৈশ্বিক জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কৃষি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বা কীটপতঙ্গ-প্রতিরোধী ফসল ফলাতে যে ‘জিন এডিটিং’ বা জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই আলো ছড়ানো উদ্ভিদ তৈরি করা হয়েছে।

বর্তমানে এই প্রযুক্তিটি প্রাথমিক বিকাশের স্তরে থাকায় উদ্ভিদের আলোর উজ্জ্বলতা কিছুটা কম এবং উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। তবে বিজ্ঞানীদের আশা, ধারাবাহিক উন্নয়ন ও নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্ভিদগুলোর আলোর তীব্রতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে, যা মানব সভ্যতাকে পরিবেশবান্ধব এক টেকসই আলোক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে।