যেকারণে কিবোর্ডের অক্ষর এলোমেলো, এক শতকের ইতিহাস

কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে টাইপ করার সময় অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, কিবোর্ডের অক্ষরগুলো বর্ণমালার ক্রমানুসারে (এ, বি, সি, ডি) না হয়ে কেন ‘কিউ, ডব্লিউ, ই, আর, টি, ওয়াই’ (QWERTY) বিন্যাসে সাজানো? আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলো মনে হলেও এই নকশার পেছনে রয়েছে ১৯ শতকের টাইপরাইটার আবিষ্কারের ইতিহাস, যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের অভ্যাসের দীর্ঘ বিবর্তন।

কিবোর্ডের এই বিশেষ বিন্যাসের মূল শিকড় লুকিয়ে আছে ১৮৬০-এর দশকে। ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলসসহ কয়েকজন উদ্ভাবক যখন বাণিজ্যিক টাইপরাইটার তৈরি করেন, তখন প্রতিটি অক্ষরের জন্য আলাদা ধাতব টাইপবার বা ছোট হাতুড়ি ব্যবহার করা হতো। ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে অক্ষরের বোতাম সাজানো থাকলে পাশাপাশি থাকা বেশি ব্যবহৃত বোতামগুলো দ্রুত চাপলে টাইপবারগুলো একে অপরের সঙ্গে পেঁচিয়ে বা আটকে যেত। এই যান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে শোলস এবং তার সহযোগীরা অক্ষরগুলোর অবস্থান নিয়ে নানা পরীক্ষা চালান এবং শেষ পর্যন্ত কিউডব্লিউইআরটিওয়াই লেআউট উদ্ভাবন করেন, যাতে টাইপবারগুলো মসৃণভাবে কাজ করতে পারে।

অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, টাইপরাইটারের যান্ত্রিক সমস্যা এড়াতে টাইপিংয়ের গতি কমানোর উদ্দেশ্যে এই বিন্যাস করা হয়েছিল। তবে আধুনিক গবেষকরা জানান, কেবল টাইপিংয়ের গতি কমানো এর মূল উদ্দেশ্য ছিল না। ইংরেজি ভাষায় যেসব অক্ষর বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে দুই হাতের বিভিন্ন আঙুলে সুষমভাবে ভাগ করে দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এই বিন্যাস তৈরি করা হয়।

কিউডব্লিউইআরটিওয়াই একমাত্র কিবোর্ড বিন্যাস নয়। ১৯৩০-এর দশকে অগাস্ট ডভোরাক ও উইলিয়াম ডিলি তৈরি করেন ‘ডভোরাক সিমপ্লিফাইড কিবোর্ড’, যার লক্ষ্য ছিল দ্রুত ও সহজ টাইপিং নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে ‘কোলেমাক’ (Colemak) নামের আরও একটি আধুনিক লেআউট তৈরি হয়। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের বহুদিনের অভ্যাস এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কিবোর্ড ব্যবস্থার কারণে এই বিকল্প লেআউটগুলো বাণিজ্যিকভাবে টিকে উঠতে পারেনি। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘নেটওয়ার্ক ইফেক্ট’ একটি ব্যবস্থা যত বেশি মানুষ ব্যবহার করে, সেটিই স্থায়ী রূপ নেয়।

আধুনিক স্মার্টফোন বা টাচস্ক্রিন ডিভাইসে ধাতব টাইপবার আটকে যাওয়ার মতো কোনো যান্ত্রিক সমস্যা নেই। তাও ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এই কিউডব্লিউইআরটিওয়াই বিন্যাস ধরে রেখেছে মানুষের অভ্যাসের কথা চিন্তা করে। ফিজিক্যাল কিবোর্ডে টাইপ করতে অভ্যস্ত ব্যবহারকারীরা যেন অনায়াসে টাচস্ক্রিনেও টাইপ করতে পারেন, তাই ভার্চুয়াল কিবোর্ডেও একই বিন্যাস রেখে দেওয়া হয়েছে।

মূলত এক শতাব্দী আগের একটি যান্ত্রিক সমস্যার সমাধানে জন্ম নেওয়া কিউডব্লিউইআরটিওয়াই নকশাটি আধুনিক ডিজিটাল যুগেও মানুষের অভ্যাসের শক্তিতে একইভাবে টিকে রয়েছে।