ক্যামেরা যেভাবে এক ঝলকেই চিনে ফেলে আপনার মুখ

ক্যামেরার দিকে এক মুহূর্ত তাকানো, আর তাতেই খুলে যায় স্মার্টফোনের স্ক্রিন কোনো পাসওয়ার্ড বা বোতাম চাপার প্রয়োজন হয় না। প্রযুক্তিবিদদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করে কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং ও বিশেষায়িত প্রসেসিং প্রযুক্তির সমন্বয়।

শুধু ফোন আনলক নয়, ক্যামেরা চালু করার সময়ও একই প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। মানুষের মুখের চারপাশে ভেসে ওঠা ছোট বক্স মাথা নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে নড়তে থাকে, যা এআই চালিত ফেসট্র্যাকিং প্রযুক্তির ফল।

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি মুখ চিনতে পারলেও ক্যামেরার প্রক্রিয়া ভিন্ন। ক্যামেরা প্রথমে আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, যা পরে অসংখ্য পিক্সেলে পরিণত হয়। প্রতিটি পিক্সেলে থাকে রং ও উজ্জ্বলতার তথ্য। এই সংখ্যাভিত্তিক তথ্যের মধ্য থেকেই নির্দিষ্ট প্যাটার্ন শনাক্ত করে এআই মডেল।

এআই মডেলকে প্রশিক্ষণের সময় দেখানো হয় মানুষের মুখের বিপুল পরিমাণ ছবি, যা থেকে মডেলটি চোখের অবস্থান, নাকের গঠন ও চোয়ালের রেখার মতো বৈশিষ্ট্য শিখে নেয়। নিউরাল নেটওয়ার্ক ও ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয় মুহূর্তের মধ্যে।

স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া কাজ করে ফেস ডিটেকশন ও ফেস রিকগনিশন। ফেস ডিটেকশন বলতে বোঝায় ছবিতে মুখের অবস্থান শনাক্ত করা, আর ফেস রিকগনিশন বা ফেস ভেরিফিকেশন বলতে বোঝায় শনাক্ত হওয়া মুখটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মেলে কি না তা যাচাই করা।

ফেস আনলক সেটআপের সময় ফোন ব্যবহারকারীর মুখের একটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করে রাখে। পরবর্তীতে ক্যামেরার সামনে মুখ এলে নতুন তথ্য সংগ্রহ করে তা আগের তথ্যের সঙ্গে গাণিতিকভাবে মিলিয়ে দেখা হয়। মিল যথেষ্ট হলেই আনলক হয় ফোন।

প্রযুক্তিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ দ্বিমাত্রিক ক্যামেরা-নির্ভর ফেস আনলক ব্যবস্থায় যমজ ভাইবোনদের আলাদা করা তুলনামূলক কঠিন। তবে থ্রি-ডি ফেস ম্যাপিং, ডেপথ সেন্সিং বা ইনফ্রারেড প্রযুক্তিসংবলিত উন্নত ব্যবস্থায় নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, যদিও কোনো ব্যবস্থাকেই শতভাগ নির্ভুল বলা যায় না।

শুধু সফটওয়্যার নয়, আধুনিক স্মার্টফোনের প্রসেসরে থাকা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট (এনপিইউ) নামের বিশেষ হার্ডওয়্যার অ্যাকসিলারেটরও এই দ্রুততার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি এআই-নির্ভর জটিল হিসাব-নিকাশ সাধারণ প্রসেসরের তুলনায় অনেক দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।

সব স্মার্টফোনের ফেস আনলক ব্যবস্থা একই মানের নিরাপত্তা দেয় না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কিছু ডিভাইস সাধারণ ক্যামেরা-সফটওয়্যারনির্ভর, আবার কিছু ডিভাইসে যুক্ত থাকে গভীরতা ও ইনফ্রারেডভিত্তিক প্রযুক্তি। যেহেতু মুখ একজন ব্যক্তির স্পর্শকাতর পরিচয়গত তথ্য, তাই কোনো ডিভাইস এই তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করছে তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।