ডিজিটাল জীবনযাত্রায় প্রতিদিন বাড়ছে ইন্টারনেটনির্ভর ডিভাইসের সংখ্যা। একসময় একটি মাত্র অ্যান্টেনার রাউটার দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও, বর্তমানে বাজারে দেখা মিলছে চার বা আট অ্যান্টেনাবিশিষ্ট নানা মডেলের রাউটার। দৃষ্টিনন্দন এসব রাউটার কেবল বিপণনের কৌশল, নাকি নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো কারণ - এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট এনগ্যাজেটের এক প্রতিবেদনে একাধিক অ্যান্টেনার প্রয়োজনীয়তা ও এর প্রকৃত কার্যকারিতা উঠে এসেছে।
যানজট নিরসন ও প্রযুক্তির সমন্বয়
একটি সরু রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ি চলাচল করলে যেমন যানজট তৈরি হয়, একইভাবে একটি অ্যান্টেনা দিয়ে একাধিক ডিভাইসে ইন্টারনেট সরবরাহ করতে গেলে নেটওয়ার্ক ধীরগতির হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানে আধুনিক রাউটারে যুক্ত করা হয়েছে ‘মিমো’ (MIMO) ও ‘এমইউ-মিমো’ (MU-MIMO) প্রযুক্তি। এতে একাধিক অ্যান্টেনা ব্যবহার করে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ডেটা প্রবাহ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। এছাড়া ‘বিমফর্মিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে চারদিকে সিগন্যাল না ছড়িয়ে নির্দিষ্ট ডিভাইসের অবস্থান বুঝে সিগন্যাল শক্তিশালী করা হয়।
শুধু অ্যান্টেনা বাড়ালেই মিলবে না সুবিধা
রাউটারে চার বা আটটি অ্যান্টেনা থাকলেই যে তার ডেটা পরিবহনের ক্ষমতা একই অনুপাতে বেড়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। একাধিক ডেটা পথ ব্যবহারের জন্য রাউটারের ভেতরে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার থাকতে হয়। মিমো প্রযুক্তি সেই অ্যান্টেনাগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
এখানে ‘স্পেশাল মাল্টিপ্লেক্সিং’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পদ্ধতিতে ডেটাকে একাধিক প্রবাহে ভাগ করে একই সময়ে পাঠানো যায়। ফলে একটি মাত্র পথের ওপর নির্ভর না করে একাধিক পথ ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
অ্যান্টেনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘বিমফর্মিং’। এর মাধ্যমে রাউটার কোনো ডিভাইসের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে তার দিকে ওয়াই-ফাই সিগনালকে আরও নির্দিষ্টভাবে পাঠাতে পারে। একাধিক অ্যান্টেনা থাকায় সিগনাল সমন্বয় করে নির্দিষ্ট দিকে শক্তিশালী করার সুযোগ বাড়ে।
বিষয়টি পানিতে একই জায়গায় একাধিক ঢেউ মিলিত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সঠিকভাবে সমন্বয় করা হলে ঢেউগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে। রাউটারের অ্যান্টেনাগুলোও একই ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ডিভাইসের দিকে সিগনালকে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
ঘরের ভেতর সিগনাল ধরে রাখতেও কাজে লাগে
একটি ঘরে ওয়াই-ফাই সিগনাল সরাসরি ডিভাইসে পৌঁছায় না। দেয়াল, আসবাব, ধাতব বস্তু এমনকি মানুষের শরীরেও সিগনাল বাধা পেয়ে প্রতিফলিত হতে পারে। এ কারণে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় সিগনালের শক্তি একরকম থাকে না।
এই পরিস্থিতিতে একাধিক অ্যান্টেনা সুবিধা দিতে পারে। কোনো অ্যান্টেনায় সিগনাল দুর্বল হয়ে গেলেও অন্য অ্যান্টেনা তুলনামূলক পরিষ্কার সিগনাল পেতে পারে। ফলে সংযোগের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ থাকে।
একাধিক ডিভাইসকে একই সময়ে সংযুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও অ্যান্টেনার ভূমিকা রয়েছে। পুরোনো রাউটারগুলোতে একবারে একটি ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত অন্য ডিভাইসে যাওয়ার পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। ‘এমইউ-মিমো’ প্রযুক্তিতে অ্যান্টেনা অ্যারে ভাগ করে একই সময়ে একাধিক ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।
বেশি অ্যান্টেনা মানেই কি বেশি স্পিড?
অনেকের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে, রাউটারে অ্যান্টেনা বেশি থাকলেই ইন্টারনেটের মূল গতি বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP) আপনাকে যে ব্যান্ডউইথ বা গতি দিচ্ছে, রাউটার তার চেয়ে বেশি স্পিড কখনোই দিতে পারবে না। রাউটারে চার বা আটটি অ্যান্টেনা থাকলেই তার কার্যক্ষমতা জাদুর মতো বাড়ে না, যদি না তার ভেতরে শক্তিশালী প্রসেসর, উন্নত হার্ডওয়্যার ও সঠিক ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ড থাকে।
আপনার জন্য কোনটি প্রয়োজন?
সাধারণ বাড়ি বা পরিবার: সাধারণ ব্যবহারের জন্য ২ থেকে ৪টি অ্যান্টেনা বিশিষ্ট ভালো মানের রাউটারই যথেষ্ট।
অফিস বা ক্যাফে: যেখানে একই সময়ে বহু মানুষ একসঙ্গে যুক্ত থাকেন, সেখানে বেশি অ্যান্টেনা ও উচ্চ ডেটা স্ট্রিম ধারণক্ষমতার রাউটার প্রয়োজন হয়।
বড় পরিসর বা বিস্তৃত কভারেজ: পুরো বাড়ি জুড়ে কভারেজ সমস্যা থাকলে শুধু অ্যান্টেনার সংখ্যা না বাড়িয়ে ‘মেশ নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা বেশি ফলপ্রসূ হয়।