মানুষের শরীর সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে অক্সিজেন ছাড়া টিকে থাকার জন্য তৈরি নয়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার বাজাউ উপজাতির মানুষেরা এই সাধারণ নিয়মকে ব্যতিক্রম প্রমাণ করেছেন। জিনগত এক বিশেষ পরিবর্তনের কারণে তারা প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা সমুদ্রের নিচে কাটাতে সক্ষম হন, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাজাউ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা কোনো আধুনিক ডাইভিং যন্ত্রপাতি ছাড়াই টানা ১০ থেকে ১৩ মিনিট পানির নিচে সাঁতার কাটতে পারেন। শুধু তাই নয়, তারা সমুদ্রের প্রায় ৭০ মিটার গভীরেও অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে সক্ষম। এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতা কাজে লাগিয়েই তারা দিনের একটি বড় অংশ ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সমুদ্রতলে মাছ শিকার করে কাটান।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এই ক্ষমতার নেপথ্য কারণ। বাজাউ সম্প্রদায়ের মানুষের প্লীহা সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বড়। বড় আকারের এই প্লীহা শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণ অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সংরক্ষণ করতে পারে, যা দীর্ঘ সময় ডুবে থাকার সময় শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
গবেষকদের মতে, এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের পেছনে দায়ী একটি নির্দিষ্ট জিন PDE10A। বংশপরম্পরায় সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপনের ফলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন এলাকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে বাজাউ জনগোষ্ঠী। বজরা বা হাউজবোটে বসবাসকারী এই মানুষদের অনেকেই "সমুদ্রের যাযাবর" বা "সি জিপসি" নামে পরিচিত।
এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ সারা জীবনে একবারও মাটিতে পা রাখেননি। এর পেছনের কারণও করুণ নিজেদের কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র বা ভূখণ্ড না থাকায় ডাঙায় উঠলেই স্থানীয় প্রশাসনের তাড়া খেতে হয় তাদের। ফলে বাধ্য হয়েই সমুদ্রকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন তারা।
মানবদেহের অভিযোজন ক্ষমতার এমন বিরল দৃষ্টান্ত বিজ্ঞানীদের কাছে যেমন নতুন গবেষণার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি বাজাউ জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামও তুলে ধরেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা।