ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উদ্বেগের ফলে জলবায়ু বিতর্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। সম্মেলনের আয়োজকদের বরাত দিয়ে ‘জলবায়ু সচেতন এআই’ ব্যবহারের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
তবে প্রযুক্তিটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এবং এটি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআইয়ের সম্ভাব্য ভূমিকা অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত করা, শিল্পকারখানার নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) এআই বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ সিং বলেন, “ডেটা সেন্টার এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এআইয়ের জ্বালানি ব্যবস্থা, জ্বালানি খাত ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “একইসঙ্গে এআই একটি সুযোগও তৈরি করছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।”
নবায়নযোগ্য জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে এআই
জ্বালানি ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ গ্রিডের কার্যকারিতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ওঠানামা আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়া যাচ্ছে।
এআইয়ের সাহায্যে নির্দিষ্ট এলাকার মেঘের আচ্ছাদন, সূর্যালোক ও বাতাসের পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা আরও নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
আইইএর হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও ভবনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এআই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩.৫ এক্সাজুল জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। জ্বালানির এ পরিমাণ ইন্দোনেশিয়ার এক বছরের মোট চাহিদার সমান।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়াটটাইম বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এমন সময়ে চালানোর ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে, যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহৃত হয়।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বিপ্লব
ইউরোপীয় মাঝারি-মেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ইসিএমডব্লিউএফ) মহাপরিচালক ফ্লোরিয়ান পাপেনবার্গার বলেন, “এআই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সত্যিকার অর্থেই বিপ্লব ঘটিয়েছে। এখন অনেক দ্রুত, উচ্চ দক্ষতা ও নির্ভুলতার সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইসিএমডব্লিউএফ এমন কাজ মাত্র দুই বছরে করতে পারছে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে করতে ১০ বছর সময় লাগত।”
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, তাদের একটি পূর্বাভাস ব্যবস্থা ১৫০টিরও বেশি দেশে বন্যার পূর্বাভাস সাত দিন আগে দিতে পারে।
নিঃসরণ শনাক্ত করতে স্যাটেলাইট ও এআই
তেল-গ্যাস স্থাপনা, খনি ও বর্জ্য ফেলার স্থানসহ নির্দিষ্ট স্থাপনা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ শনাক্ত করতেও স্যাটেলাইট ও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ম্যাককরমিকের ‘ক্লাইমেট ট্রেস’ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং দূষণকারী পদার্থের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হচ্ছে। এআইয়ের কারণে ক্লাইমেট ট্রেস ২০ বছর এগিয়ে গেছে।
ম্যাককরমিক বলেন, “আমরা প্রতিটি শহরের জন্য নিঃসরণের তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পেরেছি। অনেক শহর ইতোমধ্যে এসব তথ্য ব্যবহার করে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে পারছে। এআই ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।’
জ্বালানি শিল্পে এআইয়ের ব্যবহার
তবে এআই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দক্ষতা ও ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করলেও তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ, ভূগর্ভস্থ তেলের ও গ্যাসের মজুত শনাক্ত এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন আরও কার্যকর করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ এআই’-এর নির্বাহী পরিচালক মারিয়া জোয়াও সুজা বলেন, “এই দিক থেকেও এআই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”